kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

জেগে উঠল মৃত বনাঞ্চল; ফিরে এল পশু-পাখি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ২১:৩৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জেগে উঠল মৃত বনাঞ্চল; ফিরে এল পশু-পাখি

ছবিতেই পার্থক্য স্পষ্ট। ফটোগ্রাফার সেবাস্তিয়া সালগাডো নিজেই এই ছবিদুটো তুলেছিলেন।

জাতিসংঘের খাদ্য এবং কৃষি সংস্থার হিসেবে, ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবী থেকে ১২৯ মিলিয়ন হেক্টর বন চিরতরে হারিয়ে গেছে। যে কারণে বাড়ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা। গ্রিন হাউস গ্যাসের ১৫ শতাংশের কারণই হলো বন ধ্বংস করা। গোটা বিশ্বের জনসংখ্যার একটা বড় অংশ যখন প্রকৃতি ধ্বংসের উৎসবে মেতেছে, তখন ঠিক বিপরীত পথে হাঁটলেন ব্রাজিলিয়ান ফটোগ্রাফার সেবাস্তিয়া সালগাডো এবং তার সহধর্মিনী লিলিয়া সালগাডো। তারা রীতিমতো একটি মৃত বনকে দেড় যুগের মধ্যে পুনরুজ্জীবিত করে ফেলেছেন! 

সেবাস্তিয়া সালগাডো এবং লিলিয়া সালগাডো; যারা এই অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেলেছেন।

ফটোগ্রাফির প্রায় সবগুলো পুরস্কারই জিতে নিয়েছেন সেবাস্তিয়া। ছয়টি বই প্রকাশ করেছেন তিনি। রুয়ান্ডা গণহত্যার ছবিগুলো তিনিই প্রথম প্রকাশ করেছিলেন। সেই ছবিগুলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে তিনি খ্যাতি পান। যুদ্ধের ভয়বহতা দেখে তিনি আর মানুষের ছবি না তোলার সিদ্ধান্ত নেন। আঁকড়ে ধরেন প্রকৃতিকে। এরপর একসময় ফিরে যান নিজ দেশ ব্রাজিলে। অবাক হয়ে আবিস্কার করেন, লিউস রেইনফরেস্টের একটি অংশ যেন মানচিত্র থেকে পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে! ওই এলাকাটিতে আর কোনো গাছ নেই। যেদিকেই চোখ যায়, কেবল ধু ধু মরুভূমির মতো শূন্যতা। 

একসময় এই বন ছিল ধূ ধূ মরুভূমির মতো।

মাত্র ০.৫ শতাংশ জমিতে অল্প কিছু গাছ ছিল। বন্যপ্রাণী তো দূরের কথা, একটি পাখিও দেখা যাচ্ছিল না ওই অঞ্চলে। এত অল্প সময়ে একটি বন ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, এটা মানতেই পারছিলেন না সেবাস্তিয়া। হতাশ হয়ে পড়েছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী ওই ফটোগ্রাফার। কিন্তু তার স্ত্রী আরও অসম্ভব একটি চিন্তা তার মাথায় ঢুকিয়ে দেন। আচ্ছা, এই মৃত বনটিকে কি আবারও পূর্বের অবস্থায় ফেরানো যায় না? কাজটা অত্যন্ত কঠিন; প্রচুর সময় লাগবে; কিন্তু অসম্ভব নয়। স্ত্রীর এই প্রস্তাবটি মনে ধরে যায় সেবাস্তিয়ার। 

আর এখন সবুজে ভরা, তাকালেই চোখ জুড়িয়ে যায়।

দ্য গার্ডিয়ানকে সেবাস্তিয়া বলেন, 'বিরানভূমিতে আবারও গাছ লাগানোর ব্যাপারে আমার স্ত্রীর আইডিয়াটি দুর্দান্ত ছিল। আমরা যখন এই অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেলি, তখন সকল ধরনের পোকামাকড়-পাখি এমনকী কিছু বন্যপ্রাণীও ফিরে আসে। তাদের প্রতিটি আওয়াজ যেন আমাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। এটি ছিল আমার কাছে দ্বিতীয় জীবন ফিরে পাওয়ার মতো।' 

এভাবেই কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে পুরো মৃত বনাঞ্চলে বৃক্ষরোপন করেছেন সেবাস্তিয়া দম্পতি।

ভাবনামতো কাজ শুর করে দেন সেবাস্তিয়া এবং লিলিয়া। সঙ্গী হিসেবে পেয়ে যান কিছু স্বেচ্ছাসেবককে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, ওই বিরান ভূমিতে ৪ মিলিয়নের বেশি বিভিন্ন ফলজ এবং বনজ গাছের চারা রোপন করেন তারা। গাছ লাগিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি তারা, নিয়মিত সেগুলোতে পানি দেওয়া, রোগ-বালাই হলো কিনা সেদিকে খেয়াল রাখার কাজগুলো নিষ্ঠার সঙ্গে করে যান এই দম্পতি এবং তাদের দল। আশেপাশের লোকজন তাদের ব্যঙ্গ করতে ছাড়ত না। তবে একটা সময় পর সেবাস্তিয়া দম্পতির স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দেখে মাথা ঘুরে যায় সবার। 

গাছ লাগিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি তারা, নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেছেন তারা।

২০ বছর পর ২০১৯ সালে সেবাস্তিয়া-লিলিয়ার স্বপ্নের সেই বন সবুজে সবুজ হয়ে গেছে। এতে এখন ২৯৩ প্রজাতির গাছ রয়েছে। সবুজ বনাঞ্চলে এখন বিচরণ করে ১৭২ প্রজাতির পাখি, ১৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৫ প্রজাতির উভয়চর প্রাণী। রেইন ফরেস্টের ওই এলাকাটির পুরো ইকোসিস্টেম আবারও পুনঃনির্মাণ হয়েছে। দুই দশক পেরিয়ে সেই ফটোগ্রাফার দম্পতি এখন বৃদ্ধ। কিন্তু নিজেদের হাতে পুনরুজ্জীবিত বনাঞ্চলের দিকে তাকিয়ে তারা ফিরে যান নিজেদের তারুণ্যে। 

উপগ্রহ থেকে ধরা পড়ে লিউস রেইনফরেস্টের পরিবর্তন।

সেবাস্তিয়া দম্পতির এই প্রজেক্ট বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। বিশ্বজুড়ে যত পরিবেশবাদী রয়েছে, তাদের জন্য এটি দারুণ এক অনুপ্রেরণা। সেবাস্তিয়া বলেছেন, 'পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে প্রকৃতিকে বাঁচাতেই হবে। আমরা দেখিয়ে দিয়েছি, প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এটা আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। আমি আশা করব, সারা বিশ্বের প্রকৃতিপ্রেমীরা এভাবেই প্রকৃতি রক্ষার লড়াইয়ে নামবেন। তাহলে খুব দ্রুতই আমাদের পৃথিবী আবারও সবুজ হয়ে উঠবে।'

মন্তব্য