kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

'আমার স্মৃতি বিজড়িত শ্রীলঙ্কা আজ রক্তাক্ত'

নাহিদ রীটা   

২২ এপ্রিল, ২০১৯ ১৯:২৩ | পড়া যাবে ১৬ মিনিটে



'আমার স্মৃতি বিজড়িত শ্রীলঙ্কা আজ রক্তাক্ত'

শ্রীলঙ্কার এক পরিবারে লেখক

শ্রীলঙ্কা দেশটা আমার ব্যক্তিগতভাবে অনেক প্রিয়। অল্প কিছুদিন ছিলাম, কিন্তু অনেক স্মৃতি দিয়েছে এই দেশ। কয়েকজন আপন মানুষ দিয়েছে। অনেক জায়গায় ঘুরেছি, কখনো মনে হয়নি ভিন দেশে এসেছি। কারো আক্কি হয়ে গেছি, কারো প্রিয় বান্ধবী।

এক টুকটুক ড্রাইভারকে তো কখনো ভোলা যাবে না। প্রতিদিন আমার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত ঠিক আমার অফিসে যাওয়ার সময়। একটা কথাও হতো না। অফিসের সামনে নেমে ভাড়া দিয়ে দিতাম।

মাঝখানে তিন দিনের টানা ছুটি পড়ল। শনি-রবি, তার আগে পয়া ডে হিসেবে শুক্রবার যোগ হলো। পয়া ডে হলেঅ প্রতিমাসের পুর্ণিমার দিন। প্রতি পুর্ণিমাতে শ্রীলঙ্কায় ছুটি থাকে। রোমান্টিক দিন হিসেবে না। বৌদ্ধপুর্ণিমা হিসেবে।

যাই হোক, তিন দিন ঘরে বসে কী করব। তখন কাছের কেউ তৈরি হয়নি। সিদ্ধান্ত নিলাম, ঘর থেকে বেরিয়ে পড়বো যে কোনো এক দিকে।

শ্রীলঙ্কা ভৌগোলিকভাবে পিরামিডের মতো। চতুর্দিকে ঢালু হয়ে সমুদ্রে মিশেছে, মাঝখানটা উঁচু হয়ে পিরামিডের চূড়ার মতো অতি উচ্চ। যেখানে ক্যান্ডি অবস্থিত। অনেকেই কান্ডি জায়গাটার নাম শুনেছেন ক্রিকেটের সুবাদে।

সিদ্ধান্ত নিলাম সমুদ্র দর্শনে যাব আর ট্রাভেলারের স্বাদ গ্রহণ করব। ট্রাভেলার টুরিস্ট কিন্তু এক বিষয় না।

দক্ষিণের শেষ মাথা ভারত মহাসাগরের দিকে মিশেছে। চারিদিকে নীল সমুদ্র বেস্টনি। গুগলিং করে কিছু ছবি দেখে নিলাম। ঢাকা থেকে যাওয়ার আগে স্থানীয় দুঃসম্পর্কের বন্ধু ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, লোনলি প্ল্যানেট তার কাছে আছে, আমি নিতে চাই কিনা। ভ্রমণের খুঁটিনাটিসহ নানা বিষয়ে কাজে দেবে। গুগল আসার আগে এই লোনলি প্ল্যানেট ভ্রমণকারীদের কাছে খুব পরিচিত ছিল। পরে তিনি ইমেইলে পাঠিয়েও দিলেন। আমার সেটা আর খোলা হয়নি। উদ্দেশ্য যে জায়গাতে যাব, সেখানটাকে আমি আমার মতো করে আবিষ্কার করতে চাই।

বৃহস্পতিবার অফিস থেকে ফিরে বাসায় সামনে টুকটুক থেকে নেমে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, খুব ভোরে স্টেশনে যাব, সে পৌঁছে দেবে কিনা। শুনেই একখান সরল হাসি। এই সহজ সরল হাসি শ্রীলঙ্কানদের একটা ইউনিক বৈশিষ্ট্য। যেখানে যে প্রান্তে গেছি যখনই যে পথচারীর চোখাচোখি হয়েছে, স্বাগত উপহার হিসেবে একখান ফ্রি হাসি। আহ! মন ভরে যায়। ক্ষণকালের জন্যে মনে হয় এ আমার আপন দেশ।

পরদিন খুব ভোর মানে ৫ টায় একটা ব্যাকপ্যাকে যতটুকু আঁটে সেই পরিমাণ কাপড়চোপড় আর প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস ঢুকিয়ে পিঠে ফেলে বেরিয়ে পড়লাম।

স্টেশনে পৌঁছলাম তখন প্রায় পৌনে ৬টা কি ৬টা। স্টেশনে অনেক ভিড়। সবাই স্টেশনে গ্রামে অথবা হোমটাউনে কিংবা আমার মতো ঘুরতে বের হয়েছে।

ড্রাইভারও আমার সাথে সাথে স্টেশনের কাউন্টারের দিকে এগোচ্ছে। বাঙালি সাবধানী মনে হঠাৎ করে ভয় জমে উঠল। হ্যান্ডব্যাগটা সবার আগে ভালমতো ঝাপটে ধরলাম। আমি কাউন্টারের দিকে যতই এগোচ্ছি, সেও ততই আমার সাথে দূরত্ব কমিয়ে একদম কাছে চলে এল। কাউন্টারের সামনে পৌঁছতেই একটা মনে মনে হোঁচট খেলাম। ভিষণ ভিড় আর কোনটা যে দক্ষিণের জন্যে লাইন বোঝার উপায় নেই।

এবার মুখ ফিরিয়ে টুকটুক ড্রাইভারের দিকে তাকালাম। সেই পরিচিত হাসি। সেও সম্ভবত বুঝতে পেরেছে আমি ঝামেলায় পড়ে গেছি। এতক্ষণে আমি বুঝতে পারলাম আমাকে পিছু করার কারণটা কী ছিল। স্যারেনডার করল আমার সাবধানী মন।

ড্রাইভার এসে শর্টকার্ট ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল কোথায় যেতে চাই?

বললাম গ্যল, শেষ স্টেশন।

শেষ স্টেশন পর্যন্ত টিকিট কেটে নেয়ার কারণ হলো ট্রেন চলতে চলতে যদি কোথাও নেমে পড়তে ইচ্ছে করে নেমে যাব, অথবা শেষ স্টেশন থেকে উল্টোদিকে ঘোরা শুরু করব।

আবারো শর্টকার্ট ইংরেজিতে বললাম কত রুপি লাগবে?

পরিমাণটা শুনে আমি স্তম্ভিত।

রাতেই আমার কুক এনথোনিকে জিজ্ঞাসা করে রেখেছিলাম গ্যল পর্যন্ত ভাড়া কেমন হতে পারে। ফার্স্ট ক্লাসে গেলে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা।

অগত্যা ১৫০০ রুপি ড্রাইভারের হাতে দিয়ে আমি অপেক্ষা করছি, সে যেন এদিক সেদিক দৌড় দিতে না পারে। কড়া দৃষ্টি আমার তার ওপর। কিন্তু সে আসলেই ব্যস্ত তখন টিকিট কাটতে। আমার মনের দ্বন্দ্ব তখনো যাচ্ছে না। তারপর দেখলাম একটা টিকিট আর বাকি ৪০০ রুপি আমার হাতে দিল। আমার শংকাপুর্ন মন তখন কিছুটা স্বস্তি পেলেও তখন মনে নতুন করে যোগ হলো কৌতূহল! ৩০০ রুপির জায়গায় ১১০০ রুপির টিকিট দিয়ে সে আমাকে কোথায় পাঠাতে চায়!?

শ্রীলঙ্কার দক্ষিণে গ্যলই শেষ স্টেশন। আমি তখন কৌতুহলের জালে ঘোরপাক খাচ্ছি। আশেপাশে দেখা কিংবা শ্রীলঙ্কান স্টেশনের জীবন কেমন হয়, দেখার আগ্রহ উবে গেছে। আমার সকল কৌতুহল তখন টুকটুক ড্রাইভারের দিকে। টিকিট কাউন্টার ছেড়ে দু'জনেই প্ল্যাটফর্মের দিকে এগোচ্ছি। এর ফাঁকে সে আমার কাছ থেকে ব্যাকপ্যাকটা নিয়ে নিয়েছে। আমি হ্যান্ডব্যাগটা সামলে ধরে তার পিছন পিছন এগোচ্ছি। একসময় ওভার ব্রিজে উঠে পড়লাম দু'জনেই। ভিষণ ভীড়। মাঝে মধ্যে ধাক্কা খেতে খেতে আমার আর টুকটুক ড্রাইভারের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। আমি টটস্থ হয়ে পড়ছি তাকে হারানোর। কারণ তার ফোন নাম্বারটা আমার নেয়া ছিল না। তারপর আমার ব্যাকপ্যাক এবং টিকেট তার হাতে। আমি চেষ্টা করছি যথা সম্ভব দূরত্ব কমিয়ে তার গা ঘেঁষে চলতে। একটা বিষয় ইতোমধ্যে লক্ষ্য করলাম, ধাক্কা খাচ্ছি ঠিকই কিন্তু কোনো ধাক্কাই ইচ্ছাকৃত দেয়া নয়। যেটা আমরা মেয়েরা মাত্রই বুঝতে পারি। এখানে বাংলাদেশে যে গায়ে ধাক্কাটা আমরা হরহামেশাই খাই।

এভাবে চলতে চলতে দ্বিতীয় প্ল্যাটফর্মে এসে পড়লাম। ভিড়ও একদম হালকা হয়ে গেছে। আমাকে একটা জায়গায় বসিয়ে দিয়ে আমার হাতে টিকিট আর ব্যাকপ্যাকটি দিয়ে সে বিদায় নিল। বিদায় বেলায় সেই সরল হাসি। আমি ততক্ষণে মনে মনে লজ্জায় ন্যুয়ে পড়েছি তাকে চোর অথবা ছিনতাইকারী ভাবার কারণে। আমি প্রচণ্ড রকম কৃতজ্ঞতা নিয়ে তাকেও অকৃত্রিম হাসি দিয়ে বিদায় দিলাম। কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলাম তার চলে যাওয়ার পথে। খুব দ্রুত সে হাঁটার চেষ্টা করছে। মনে পড়ল তার টুকটুকটা রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়েই সে আমাকে সাহায্য করার জন্যে পিছু পিছু ছুটেছিল। অদ্ভুত এক অনুভূতি খেলে গেল মনের ভেতর। কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা অনুভব করলাম ড্রাইভারটির প্রতি আর সেই দেশটির প্রতি। অনেক শুনে এসেছি সে দেশের মানুষের কথা, তাদের সহজ সরলতার কথা, তাদের আন্তরিক স্বাগত হাসির কথা, সহযোগিতার কথা।

আজ যেন নিজেই সেরকম একটা অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে গেলাম।

কিন্তু আমার তখনো ফার্স্টক্লাসের ৩০০ আর ১১০০ টাকার পার্থক্য মাথায় কাজ করছে না। ফার্স্টক্লাসের পরে প্রিমিয়াম ক্লাস হতে পারে। কিন্ত সে কি ৮০০ রুপির পার্থক্য? নাহ! কিছুতেই মেলাতে পারছি না।

আমি বসে থাকলাম ট্রেনের অপেক্ষায়।

যথাসময়ে ট্রেন এসে থামল। সবগুলো বগিতে ভীড়ের ঠেলাঠেলি। আমার যে বগিটি সেটার গেটে দেখলাম শুধু সাদাদের উপস্থিতি। আমার কৌতূহলের অবসান তখনো হয়নি। ভিতরে উঠে আমার চোখ ছানাবড়া। রীতিমত প্লেন। তার চেয়েও বেশি। সিটগুলো অনেক চওড়া। আরামদায়ক। নীচে মেঝেতে কার্পেট বিছানো। সামনে বড় পর্দার টেলিভিশন। এক কর্নারে কফিশপ। বেয়ারার সাদা পোষাকে মাথায় টুপি দেয়া কাউন্টারে লোক অনবরত এটা সেটা বানিয়ে চলেছে। নানাপদের খাবার। চারপাশে তাকিয়ে দেখি একমাত্র আমি শ্যামলা রঙের। বাকিরা সাদা। বুঝতে পারলাম; এদের সবাই হয় ইউরোপ অথবা আমেরিকা থেকে আগত। সবাই ফ্যামিলি ট্যুর কিংবা হানিমুন, দুয়েকজন আমার মতো একা। চোখাচোখি হতেই তাদেরও সেই হ্যালো সূচক হাসি।

এক ফাঁকে ওয়াসরুমে গিয়েও হতভম্ব। প্লেনের ওয়াসরুমের মতো, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। আমার ১১০০ টাকার টিকেটের কৌতুহল এতক্ষণে দূর হলো। এই কামরাটি বিশেষভাবে টুরিস্টদের জন্য তৈরি। সাধারণ শ্রীলঙ্কানরা এটাতে ভ্রমণ করে না। তাই এই দামের পার্থক্য। মনে মনে টুকটুক ড্রাইভারকে ধন্যবাদ দিলাম। সাথে আবারো সেই কৃতজ্ঞতাবোধ। বুঝলাম এদেশের মানষ অতিথির খেয়াল রাখে প্রিয় জনের মতই।

ট্রেন চলতে থাকল সমুদ্রের তটরেখা ঘেঁষে।

আমি যে পাশটায় বসেছি সেটা সমুদ্রের দিকে। এক পাশে নীল বিস্তৃত সমুদ্র। বড় বড় ঢেউ। জানালার কাচের ভিতর দিয়ে দেখে মন ভরছে। ভিতরে একটা ছটফটানি শুরু হয়ে গেছে, কখন ট্রেন থেকে নামব। স্টেশনগুলোর ভিতর দূরত্ব খুব বেশি নয়। ৩০/৪০ মিনিট পর পরই ট্রেন থামতে শুরু করল। বেশ কয়েকবার মনে হলো সামনের স্টেশনেই নেমে যাই। হোটেল বুকিং দেয়া নাই। তাই নেমে যেতে অসুবিধা নেই। একবার নেমেও পড়লাম হিক্কাডুয়া স্টেশনে। আবার কি মনে হলো উঠে পড়লাম ট্রেনে, টিকিট যেহেতু শেষ স্টেশন পর্যন্ত। একেই বোধহয় বলে ঘরছাড়া। কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। যেখানে মন চায় সেখানে চলে যাওয়া। আবার সিটে এসে বসে সিদ্ধান্ত নিলাম গ্যলেই যাব। পাশের সিটটিতে বসেছে এক বয়স্ক লোক। সিটে বসেই ঘুমে বিভোর। আলাপের সুযোগ নেই। অগত্যা নিজের ভিতর ডুব দেয়াই একমাত্র পথ। আনমনে জানালার কাচ দিয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ে দৃষ্টি মেলিয়ে দিলাম। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর ট্রেন গ্যলে এসে থামল। লোকজন খুব কম। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, দোকানপাট নেই বললেই চলে, খোলামেলা। ততক্ষণে সূর্য আকাশে দুপুরের দিকে গড়াচ্ছে। কয়েকজন সাদার পিছু নিয়ে আমি স্টেশন থেকে বের হয়ে এলাম। প্রায় সবারই গন্তব্য নির্দিষ্ট। শুধু আমি জানি না কোথায় যাব। কেমন একা একা লাগছে। কি করতে চাই তাও জানি না। হঠাৎ যেন নিজেকে পেয়ে গেলাম। যা করতে ইচ্ছে করে তাই করব ঠিক করলাম।

একটা টুকটুকওয়ালার দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম গ্যল ফোর্টে নিয়ে যেতে। ভাড়া মিটানোর দরকার পড়ল না, মিটার আছে।

টুকটুক ফোর্টের দিকে যাচ্ছে। আমি টুকটুকের ভিতর দিয়ে বাইরে গ্যল দেখছি। কেমন ছিমছাম শহর। মাঝে মাঝে আমাদের ক্রিকেটাররা সম্ভবত এখানে আসে ক্রিকেট খেলতে। গ্যল ফোর্টের পাশেই সেই ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি।

ফোর্টে পৌঁছেই উঁচু দেয়ালটির উপর দাঁড়িয়ে গেলাম। অনেক নীচে সাগরের জল ঠিকরে পড়ছে ফোর্টের দেয়ালে। দেয়াল ঘেঁষে অনেক বড় বড় পাথর স্তুপিকৃত। সেখানে ঢেউগুলো আছড়ে পড়ে সাদা ফেনায় রূপ নিচ্ছে, আবার সাগরে মিশে যাচ্ছে। এই খেলা অনবরত। কয়শ বছর ধরে এই ফোর্ট দাঁড়িয়ে আছে জানি না, গুগল করে নিতে হবে।

আমি ফোর্টের ওয়ালে দাঁড়িয়ে দূরের আকাশে চোখ রাখার চেষ্টা করছি। দিগন্তের শেষ সীমায় আকাশ মিশে গেছে সাগরের জলে। আমার দৃষ্টি সেখানে আটকে গেছে। কানে ভেসে আসছে বড় বড় ঢেউয়ের গর্জন। ঢেউগুলো ঠিক আমাদের কক্সবাজারের মতো নয়। আরো বড় বড়।

আশে পাশে সব টুরিস্টদের ভিড়। বেশিরভাগই ছবি তোলায় ব্যস্ত। তখনো সেলফির যুগ শুরু হয়নি। সবাই পোর্ট্রেট ছবি তোলায় ব্যস্ত পিছনে সমুদ্রকে রেখে, কখনোবা ফোর্টকে পিছনে রেখে। আমি নিজেও কয়েকটা ল্যান্ডস্কেপ নিলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সিদ্ধান্ত নিলাম এই শহরটাই ঘুরে ফিরে দেখব সন্ধ্যা পর্যন্ত। এর পর ভাবা যাবে কোথায় ঘুমাবো। ফোর্টের উপর থেকে নেমে ধীরে ধীরে টুকটুকগুলোর দিকে এগোচ্ছি। হঠাৎ দেখি আমার সেই টুকটুকওয়ালা যাকে স্টেশন থেকে নিয়ে এসেছিলাম। আমাকে দেখেই একখান হাসি। হাসি বলতে 'স্মাইল' ইংরেজিতে যাকে বোঝায়। আমি কোনো কথা না বলেই তার টুকটুকে উঠে পড়লাম। এবার সে জিজ্ঞাসা করল আমার হোটেল কোথায়।

আমি বললাম এখনো ঠিক করিনি। তবে এখন কোনো একটা সৈকতে যেতে চাই যেখানে গিয়ে স্নান করা যাবে। লোকটার সাথে দুয়েকটা কথা বলেই মনে হলো আমার কলম্বোর ড্রাইভারের মতই হবে। দেখাতে বেশ সুঠাম, হাসিমাখা মুখ সব কথাতেই।

আমার ততক্ষণে শ্রীলঙ্কানদের সন্দেহ করার বাতিক উবে গেছে।

টুকটুক কিছুক্ষণ বড় রাস্তায় চলার পর গলির রাস্তায় ঢুকে গেছে। পাশ দিয়ে দেখছি সাদা ছেলে মেয়ে মাঝে মাঝে মোটর সাইকেল নিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে। ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করতেই জানতে পারলাম এগুলো ভাড়াতে পাওয়া যায়। আমি চাইলেও সে জোগাড় করে দিতে পারে। তাতে নিজের মতো শহর ঘুরে দেখতে সুবিধা হয়।

আমি কোনো রকম মন্তব্য না জানিয়ে চুপ করে থাকলাম। মনে মনে ভীষণ ইচ্ছে হলো একটা মোটর সাইকেল ভাড়া করে নেয়ার, পুরনো অভ্যাসটা আবার ঝালাই করে নেয়া যাবে।

যাই হোক, তখনো আমি সমুদ্র স্নানের বিষয়ে বেশি মনযোগী।

কিছুক্ষণ গলির রাস্তায় চলে টুকটুক এসে থামল একটা ছোট্ট বিচ সাইড রেস্টুরেন্টে। রেস্টুরেন্ট বলতে একখানা রান্নার ঘর আর সাথে লাগোয়া খাবার জায়গা, চারপাশ খোলা, উপরে রঙিন টিনের ছাউনি। প্লাস্টিকের রঙিন চেয়ার টেবিল পাতা। এক কর্নারে বিল কাউন্টার, তার পিছনে ঝুলছে যিশু খ্রিস্টের মাঝারি সাইজের একখান ছবি। রেস্টুরেন্টে কেউ নেই।

আমি একটা টেবিলে গিয়ে আমার ব্যাকপেক রেখে বসে পড়লাম কোনো কিছু না ভেবেই। সামনে খোলা আকাশ আর বিশাল বিশাল ঢেইয়ের মেলা।

আমার পিছন পিছন টুকটুক ড্রাইভারও ঢুকল। পাশের কামরা থেকে স্কার্ট পরিহিতা একজন মোটাসোঁটা মহিলা বেরিয়ে এল। অদ্ভুত এক হাসিমাখা মুখ। সেই মিষ্টি হাসি এখনো আমার চোখে ভাসে। নাম তার টিনা, মাঝ বয়সী। শ্রীলঙ্কায় একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম, নাম শুনে যেগুলো বুঝি সেগুলো হয় মুসলিম, খ্রিস্টান অথবা হিন্দু। যাদের নাম বুঝিনা সেগুলো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের খুব সুন্দর এক সহাবস্থানের দেশ।

টিনা এসে আমাকে একদম আপন করে নিল। ডাইভার আর টিনার সিংহলিয়া ভাষায় কথপোকথন চলল কয়েক মিনিট। যা পরে জানলাম তা হলো, আমি বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি, একা, আমি থাকব কিছুক্ষণ এই ওনাউয়াটুনা বিচে। এর পর যদি আমি এখানে রাতে থাকতে চাই তবে পাশেই একটা ভাল হোটেলে থাকার ব্যাবস্থা করে দিবে। আর বিকেলে কোথাও ঘুরতে যেতে চাইলে আমাকে সে এসে আবার নিয়ে যাবে। ততক্ষণে সূর্য এসে মাথার উপর বরাবর আকাশে। শ্রীলঙ্কা নাতিশীতষ্ণ দেশ হওয়ায় সমুদ্রের কাছাকাছি স্থানগুলোতে তাপমাত্রা ২৭-২৯ এর ভিতর ওঠা-নামা করে। গরম সেভাবে বোঝা যায় না। এরকম চলে সারাবছর। এখানে শীতকাল নেই। কারো ঘরে বাক্সতে কম্বল অথবা সোয়েটার খুজে পাওয়া যাবে না।

টিনার সাথে সাথে তার স্বামীও চলে এল আমার টেবিলে। আমি বাংলাদেশী জেনে দু'জনেই ভিষণ খুশি।

অতঃপর টুকটুক ড্রাইভার আমাকে টিনাদের জিম্মায় রেখে বিদায় নিল।

সামনে অনেকগুলো ডিভান সাজানো, সব কয়টাতে সাদা পুরুষ-নারী সমুদ্র স্নানের পোশাকে। কেউ বালিতে চাদর বিছিয়ে রৌদ্র স্নান করছে, কেউ ডিভানে শুয়ে বই পড়ছে, কেউ গায়ে স্নান ব্লক লাগাচ্ছে। কেউ সমুদ্রে নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আমি কিছুক্ষণ বসে চারপাশটা বোঝার চেষ্টা করছি। পরে আমার ব্যাগ ফোন সব কিছু টিনার জিম্মায় রেখে সমুদ্রের কাছে গেলাম। সামনে বিশাল বিশাল ঢেউ। বিশাল বলে ঠিক এর বিশালতা বোঝানো যাচ্ছে না। রীতিমতো ছোট খাট এক একটা টিলার সমান। আমার ভয়ে কম্ম সারা। এক একটা ঢেউ আসছে, পানিতে থাকা লোকজনকে একদম উচুতে তুলে আবার কোন তলানিতে নিয়ে যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর এক একজন ভেসে উঠছে। আমার কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটার সমুদ্রস্নানের অভিজ্ঞতা ওখানে নস্যি। একদম ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। একে তো একা, কোনো হোটেলেও উঠিনি। এ অবস্থায় বাই চান্স সলিল সমাধি হলে অজ্ঞাত শ্রীলঙ্কানের সমুদ্র জলে মৃত্যু নামক স্থানীয় পত্রিকায় আসতে পারি, কারণ আমার সাথে শ্রীলঙ্কার লোকদের চেহারায় মিল।

এ অবস্থায় প্রায় আধা ঘণ্টা কেটে গেল তীরে বসেই অন্যদের সমুদ্র স্নান দেখে। এ বিচে সবাই বিদেশি। এক ফাঁকে পাশের বিচে সব লোকালদের ভিড়। বুঝলাম, কলম্বোর ড্রাইভারের মতো এখানকার ড্রাইভারও আমাকে টুরিস্ট হিসেবেই বিদেশিদের জন্যে ব্যবহৃত বিচে এনেছে।

একটা বিষয় বুঝলাম, শুধু শ্রীলঙ্কান সরকার নয়, সাধারণ মানুষও এখানে টুরিস্টদের বিষয়ে সচেতন। আমাদের কক্সবাজার কিংবা অন্যান্য জায়গায় যা আমরা কখনো দেখি না।

যাই হোক, এভাবে বসে বসে সাহস সঞ্চার করে দেখে নিলাম কীভাবে সাদাগুলো নিজেকে সামলাচ্ছে এরকম দানবাকৃতির ঢেউগুলোর ভিতর।

শেষে সাহস করে নেমে পড়লাম।
আহ! আমার সমুদ্র স্নান!

স্নান শেষে টেবিলে এসে বসতেই যেন রাজ্যের ক্ষুধা এসে ভর করল আমার পেটে। একে বারে চুই চুই অবস্থা। টিনা এক প্লেট ফ্রায়েড রাইস সাথে টুনা ফিস ফ্রাই দিয়ে গেল। আহ, ক্ষুধা পেটে এ যেন অমৃত। আজো যেন লেগে আছে সে স্বাদ।

শরীর তখন বেশ শ্রান্ত। টিনা একটা ডিভান সাদাদের সরিয়ে আমাকে দেখিয়ে দিল বসার জন্য।

ওটাতে গা এলিয়ে দিলাম। বোধহয় কিছুক্ষণের জন্যে ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। যখন উঠলাম দেখি টিনা একটা কমলা রঙের ডাব হাতে নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে।

আহ, এরকম পড়ন্ত বিকেলে ডাবের জল, কি তৃপ্তি!

টিনার সাথে গল্পে গল্পে বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। অনেক কিছু জানছি। কীভাবে সুনামির সময় সবাই দৌড়ে পালিয়ে বেঁচেছিল, কীভাবে, তাদের এই রেস্টুরেন্ট চলে, তার সংসার ছেলেমেয়ে, অনেক কিছু।

রাতের জন্যে তখনো হোটেল বুকিং দেয়া হয়নি।

টিনাকে বললাম হিক্কাডুয়া ট্রেন থেকে নেমে গিয়েছিলাম। এ কথা শুনতেই বলল হিক্কাডুয়া অনেক সুন্দর জায়গা। অনেক হোটেল, অনেক লোক, সার্ফিং, ট্রাটেল খামার, স্নরকেলিং। এগুলো শুনতেই মন চঞ্চল হয়ে উঠল

সন্ধ্যার আগে আগেই টুকটুক ড্রাইভারকে ডেকে টিনার আর তার স্বামীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে ছুটলাম হিক্কাডুয়া।

আহ! কত স্মৃতি!

সব কেমন স্পষ্ট ভাসে চোখের সামনে।

ফেসবুকের পাতায় পাতায় আজ সংখটার আপডেটটা দেখছি, এ পর্যন্ত কতজন মরল!!

কেন এমন হলো?

আমি যে শ্রীলঙ্কাকে দেখে এসেছি, সেখানে জাতিগত বিভেদ ছিল। ৬০%, ৪০%।

কিন্তু এখন আরো একটি বিভেদ সৃষ্টি হলো।

জাতিগত বিভেদ নিয়ে ছিল তারা সহাবস্থানে।

কিন্তু এ বিভেদ কি তাদের আর কাছাকাছি আসতে দেবে?

কিন্তু আমি জানি, ওই গির্জার মানুষগুলো যদি আমাকে রাস্তায় দেখত, সেই সরল হাসি উপহার দিত। যেমন এখনো দেবে ওখানকার হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধরাও।

এই হাসি মাখা মানুষের দেশ থেকে কে আজ তাদের চেহারায় বিষাদ দিয়ে গেল! আহ মানতে পারছি না। জানতে ইচ্ছে করছে কেমন আছে টিনা আর টিনার পরিবার? ইয়াদিরা আর শশীর পরিবার?

সবাইকে কি একই রকমভাবে পাব এখন? কবে উঠে যাবে পৃথিবী থেকে এই বিভেদের জীবাণু। জানতে ইচ্ছে করে।

লেখক : নাহিদ রীটা ।

মন্তব্য