kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

কোনোভাবে যদি ভূইরামগাছটিকে বাঁচানো যেতো!

বেলায়েত হোসেন   

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ১৮:২২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কোনোভাবে যদি ভূইরামগাছটিকে বাঁচানো যেতো!

জনশ্রুতি আছে আমগাছটির বয়স শতাব্দীকাল ছাড়িয়েছে। এলাকার মুরব্বিজনের কথায় 'আমরা মায়ের পেট থেকে নেমেই গাছটিকে এমন দেখছি।' তারা তাদের মুরব্বীদের থেকেও কি এমনটি শুনেছিলো-জানা নেই, তবে নিশ্চিত গাছটির বয়স শত বছরের বেশি।

ভূইরামগাছ (ভূমির আমগাছ) নামে প্রসিদ্ধ এই গাছটি ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলায় দাদপুর গ্রামে অবস্থিত। বিশাল দেহাকৃতির এ গাছটিকে প্রথমে দেখলে মনে হয়, যেন পাকড় বা বটগাছ হবে,চারজনের হাত একত্র করে গাছটিকে জড়িয়ে ধরতে হয়। মূল কাণ্ড লম্বায় আট বা দশ হাত। গাছের প্রাচীন ও আঁকাবাঁকা ডালপালাগুলো এমনভাবে চারপাশে বিস্তৃত, মনে হয় সম্মুখে যেন কোন সবুজ দানব দণ্ডায়মান। উচ্চতাও কম নয়,পাশে থাকা তাল আর খেজুর বৃক্ষের মাথা ভুইরামগাছের উচ্চতা বরাবর। নিচের শিকড় গুলোও মাটিকে শক্তকরে আঁকড়ে রেখেছে, লাগাতার বন্যায় মাটি ধুয়ে গেলে গাছের শিকড় যেভাবে বেরিয়ে যায় ছোটবেলা থেকেই এই গাছটির শিকড় তেমনই দেখছি। মনে হয় যেন, রোগা কোন গ্রাম্য কৃষক লুঙ্গি কাছা দিয়ে জীর্ণ পা বের করে বসে আছে।

গাঢ় সবুজ পাতার এই গাছে প্রতিবছর আম আসে না, অনিয়মিত ফলদায়ক বৃক্ষ সে। তবে যে বছর আম দেয়, পর্যাপ্ত পরিমাণ ফলন হয়। ভূই (কৃষিমাঠ) এর পাশে এটির অবস্থান হওয়ায় ক্ষেতে কাজ করা মানুষেরা ক্লান্ত হয়ে একটু জিরিয়ে নেয় এই গাছের ছায়ায়। মধ্যাহ্নভোজ সারে।দুএকটা কাঁচা আমও পেড়ে খায়। এলাকার আবালবৃদ্ধবনিতা ভূইরামগাছের নিচে গল্পের আসর বসায়, রৌদ্রের তীব্রতা আসরকে আরো মজবুত করে। ছোটরা গাছে উঠে লুকোচুরি খেলে, আম পাড়ে, কলাপাতা কেটে আনে, ঘর থেকে মরিচ ও নুনও নিয়ে আসে, ভূইরামগাছের আম পেড়ে আমভর্তা বানায়। ভূইরামগাছকে দারুণ উপভোগ করে সবাই। গাছটির সাথে এখানের মানুষের আত্মার সম্পর্ক। তাকে ঘিরেই তো আরো নতুন গল্প হয়। আসর জমে।

মৃত্যুর পরে দুই ভাইয়ের মালিকানার এই গাছটি তাদের সন্তানরা উত্তরসূরী হিসেবে পেয়েছে,এর বর্তমান মালিক-ছেলেমেয়ে মিলিয়ে দশবারোজন হবে। এদের ছেলেমেয়েরাও আবার বড় হয়েছে,তাদের সংখ্যাও পঞ্চাশ ষাটের কম হবে না। তাই ভূইরামগাছের মালিকানায় শরীকের সংখ্যা এখন অনেক, এজন্য গাছটিকে নিয়ে মাঝেমধ্যেই তাদের মাঝে ঝগড়ার সৃষ্টি হয়, মৌরুসি সব সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা হলেও আমগাছটি আগের মতোই রয়ে গেছে। নির্দিষ্ট কয়েকজনের জমি দখল করে দাঁড়িয়ে আছে গাছটি, জমির মালিকরা চায় অন্যদের মতো তারাও নিজেদের জায়গাজমিতে যারযার সুবিধামতো রকমারি ফলের গাছ লাগাতে, অন্য মালিকরা বলে পূর্বসূরিদের শেষ নিদর্শন স্বরূপ ভূইরামগাছটি আমরা রেখে দিতে পারি। এমনই আরোকিছু সমস্যা ঐতিহাসিক এই গাছটির জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে-মুরব্বীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমের এই মৌসুম শেষ হলেই শতবর্ষী ভূইরামগাছটি কেটে ফেলবেন।

মূল মালিক মৃত দুইভাইয়ের একজনের উত্তরসূরি আমি, গাছের মালিকানায় আমারও অধিকার রয়েছে, আমিও ভূইরামগাছের একজন ক্ষুদ্র মালিক। আমি বড় হয়েছি এই গাছের ছায়ায়, শৈশব থেকে কৈশোর এবং আজকের তারুণ্যের অনেকটা সময় অতিবাহিত করেছি এই গাছটির মায়ায়। গাছের সাথে আমার এতো গভীর হৃদ্যতা আগে টের পাইনি। কিন্তু ভূইরামগাছটি কেটে ফেলার খবর আমাকে অত্যন্ত মর্মাহত করেছে এবং এ কথা বুঝতে পেরেছি গাছের জন্যও মানুষের মনে ভালোবাসার টান আছে, সহানুভূতি আছে।

কিন্তু বাস্তবতা এমন যা ফিরানোর সক্ষমতা আমার নেই, আবার ভূইরামগাছের বিয়োগ হবে-মন মানতে চাইছে না। তারপরেও আম-মৌসুমের শেষে আশু বিয়োগবেদনার অপেক্ষায় ক্ষণ গণনা করছি আর ভাবছি, কোনোভাবে যদি ভূইরামগাছটিকে বাঁচানো যেতো!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা