kalerkantho

আরো জীবন

বন্য প্রাণীর রক্ষক রোকনুজ্জামান

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ১০:৩৮ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বন্য প্রাণীর রক্ষক রোকনুজ্জামান

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে মো. রোকনুজ্জামানের সঙ্গে রায়হান রাশেদের দেখা হয়েছিল। তিনি একজন বন্য প্রাণীর রক্ষক

গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে বাঘ, হরিণ, জিরাফ দেখে পাখি পার্কে গেলাম। অনেক রকমের পাখি আছে এখানে। মাঝবয়সী একজনকে দেখলাম পাখির পরিচর্যা করছেন। নাম রোকনুজ্জামান। বাড়ি পিরুজ আলী। নুহাশপল্লীর একটু দক্ষিণে পিরুজ আলী। ২০১৪ সালে সাফারি পার্কে যোগ দেন। পদের নাম বন্য প্রাণী রক্ষক। হরিণের খাবার দেওয়ার কাজ পেয়েছিলেন প্রথম। ডিউটি ছিল সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা। একনাগাড়ে দুই বছর ছিলেন হরিণের সঙ্গে।

হরিণের দিন
হরিণ সারা দিন মাঠে ঘুরে বেড়ায়। সাফারি পার্কের দেয়ালঘেরা মাঠটিতে গাছ আছে, ঘাসও আছে। আছে জলাশয়। হরিণেরা নিজেরাই গোসল সারে সুবিধামতো। রোকনুজ্জামান দুই বেলা তাদের জন্য খাবার নিয়ে যেতেন। একবার সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে, অন্যবার বিকেল ৫টার দিকে। পিকআপ বা ভ্যানে চড়িয়ে খাবার পৌঁছাতেন। বেগুন, গোল আলু, মিষ্টি আলু, ঢেঁড়স, বাঁধাকপি, গাজর, কলা ইত্যাদি ছিল খাবারের তালিকায়। সাধারণত মাটিতে ছড়িয়ে রেখে আসতেন। হরিণরা সবজি খুশি হয়েই খায়। খাবার পানিও দিয়ে আসতেন গাড়ি করেই। হরিণের জন্য ডাক্তারও আছে। ডাক্তার নিয়মিত টিকা দেন, ক্ষত থাকলে ড্রেসিং করেন। হরিণ মারা গেলে সুরতহাল প্রতিবেদন দেন। অসুস্থ হরিণের জন্য ঘের দেওয়া আলাদা জায়গা আছে (মিনি এনক্লোজার)। সেখানে অসুস্থ হরিণ বন্দি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। রোকনুজ্জামান বলছিলেন, ‘শুরুতে আমার ভালো লাগত না। সারা দিনে কথা বলার মানুষ তেমন পেতাম না, বিশেষ করে এনক্লোজারে যখন ডিউটি থাকত। তবে একসময় কাজটা আমার ভালো লেগে যায়। হরিণের চলাচল দেখতাম। বাচ্চা হরিণগুলোকে আদর করে খাওয়াতাম। বাড়িতে গেলেও মনটা পার্কেই পড়ে থাকত। রাতে শুয়েও ওদের কথা চিন্তা করতাম। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ল কি না? মারা গেল কি না? ইত্যাদি।’

একবার আহত হয়েছিলেন
সেদিন ছিল ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। রোকনুজ্জামান হরিণগুলোকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। খুঁজতে খুঁজতে ঝোপের ধারে চলে গিয়েছিলেন। তখনই পেছন থেকে একটি সম্বর হরিণ অতর্কিত আক্রমণ করে। এদের শিং বড় হয়। শিং দিয়ে পিঠে গুঁতা দিলে রোকন মাটিতে পড়ে যান। রোকন বাধা দিতে গেলে সম্বর বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পিঠে, পেঠে, হাতে প্রচণ্ড আঘাত পান রোকন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় দেরি না করে। রোকন বলছিলেন, ‘ছয় মাসের মতো হাসপাতালে ছিলাম। অনেক কষ্ট করেছি। গোয়ালের গরু বিক্রি করে দিয়েছি চারটি। শখের বাইকও বেচেছি। তবে কারোর কাছে হাত পাতিনি। অবশ্য তখনো বেতন পেয়েছি।’

পাখির কাছে
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর পাখি দেখাশোনার কাজ পান। খাবার দিতে হাতে শক্তি পেতেন না তখনো। এখন অল্প অল্প পারছেন। পাখিদের খাবার দেন সকাল ৮টা, সকাল ১০টা, দুপুর ১টা ও বিকেলে। আগে পাখি আরো বেশি ছিল। অনেক পাখি আবহাওয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। অনেক পাখি ফাইট করেও মারা যায়। পাখিরা ফলফলাদি যেমন—আপেল, কলা, পেঁপে, তরমুজ ইত্যাদি পছন্দ করে। সবজির মধ্যে শিম, কাঁচা মরিচ, শসা ইত্যাদি তাদের পছন্দ।

কিছুটা কষ্টে আছেন
হরিণের হামলার পর চিকিৎসা করাতে গিয়ে ঋণের জালে বন্দি হয়ে পড়েছেন রোকনুজ্জামান। এখনো নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়। বললেন, ‘ভালো স্ত্রী পেয়েছি। সে মনে কোনো কষ্ট রাখে না। অসুস্থ একজন মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। আমি তার মঙ্গল চাই। ঋণ থেকে মুক্তি পেতে সরকারি সাহায্য চাইছি।’

ছবি : লেখক

মন্তব্য