kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

রাফির কবরের পাশে কিছুক্ষণ

মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী   

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ১৪:৫২ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



রাফির কবরের পাশে কিছুক্ষণ

১০ এপ্রিল অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জাহান রাফির হৃদয় বিদারক মৃত্যুর পর হতেই ভাবছিলাম মনের শান্তনার জন্য মানবিক, সামাজিক ও মুসলিম ভ্রাতৃক কারণে নুসরাতের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করে কথা বলবো। বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের ৪০তম কেন্দ্রীয় পরীক্ষার মিরপুর আরাজাবাদ মাদরাসা কেন্দ্রে নেগরানী থাকায় যাওয়ার সুযোগ হয়নি।

পরীক্ষার পরে ১৭ এপ্রিল বুধবার লালমাটিয়া মাদরাসা ছুটি হলে বাদ ফজর ইফতার শুয়াইব আহমা, শরহে বেকায়ার মুহসিন মাহমুদ ও ওমর হাসানসহ ফেনীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। ফেনী জেলার দাগনভূঞা পৌর এলাকায় বাসা হওয়ায় ওমর হাসান আমাদের এসফরের রাহবার ও মেজবানের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ওমর হাসানদের বাসায় পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর ঘটিকা।

দাগনভূঞা পৌরসভায় দুইতলা ভবনের ২য় তলায় বাসায় ঢুকেই দেখি দস্তরখান পূর্ব থেকে বিছানো। ওই অবস্থাতেই সংক্ষিপ্ত গোসল করে দস্তরখানে বসে বুঝলাম অনেক সময় ব্যয় করে যথেষ্ট আগ্রহ আর আন্তরিকতার সাথে হৃদয়ের মাধুরী মিশিয়ে খাবারের আয়োজন করা হয়েছে-আল্লাহ তা'আলা ওমর হাসানের বাবা মাসহ বাসার সবাইকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।

দুই
দাগনভূঞা থেকে সোনাগাজির উদ্দেশ্যে বের হলে ওমর হাসানের আব্বা জনাব জহির সাহেব গাড়ি পর্যন্ত আমাদের সাথে আসলেন। রাস্তায় অনেক কথা হলো। তিনি বললেন, আমি শুনলাম। আমি বললাম, তিনি শুনলেন। অল্প সময়ের মাঝে বেশ আন্তরিক পরিবেশ তৈরি হলো, যেন বহুদিনের সম্পর্ক।

তিন
আসরের নামাজ পড়ি অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জাহান রাফির এলাকা সোনাগাজি পৌরসভা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। নামাজ পড়ে বের হলে দেখলাম নুসরাতের পরলোকগমনের এক সপ্তাহ পরেও সোনাগাজির ব্যস্ততম বাজার কেমন যেন থমথমেভাব বিরাজ করছে।

শতবর্ষ প্রাচীন সোনাগাজি ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা- যেখানে অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জাহান তার জীবনের শেষ পরীক্ষার জন্য এগজাম বোর্ড আর খাতা কলম নিয়ে বসেছিলো-এর মেইন গেট দিয়ে প্রবেশ করার সময় চোখে পড়লো ধর্ষক ও খুনি সিরাজ উদ্দৌলার ফাঁসি চেয়ে তারই ছাত্র-শিক্ষককদের লেখা বড় অক্ষরের ডিজিটাল ব্যানার।

ঢোকা মাত্রই সাক্ষাৎ হয় কর্তব্যরত গার্ডের সঙ্গে। তিনি এখানে ২৫ বছর থেকে আছেন। সিরাজ উদ্দৌলার ব্যাপারে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন যে, অসংখ্য-অগণিত মেয়ে এই লম্পট সিরাজের যৌন লালসার শিকার। যখনই কোনো মেয়েকে শিক্ষা সংক্রান্ত বাহানায় ডাকতো সর্বদা ২য় তলাস্থ নির্জনকক্ষ সদৃশ তার অফিসে একা ডাকতো। প্রকাশ্য ফাঁসি হওয়া উচিৎ এই অধ্যক্ষ নামের কলঙ্কের।

চার
যে বিল্ডিং এ এই ঘটনা ঘটে ওটি মূলত একাডেমিক ভবন। নিচতলাটা খোলা। সেখানেই মাগরিবের নামায আদায় করি আমরা সকলে সকলে। নামাজের পরে নুসরাতের বাবা হালিমিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা আবুল খায়ের মুসা মানিকের সাথে দেখা হলে তিনি আপন ভাইয়ের মতই জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর কান্নায় আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করলো। তাকে কিছু বলার মত ছিলো না আমার কাছে-শুধু অশ্রুসিক্ত নয়নযুগলের তপ্তাশ্রুই ঝরলো অঝোর ধারায়।

আরো কথা হলো নুসরাতের চাচা জনাব আলাউদ্দীন সাহেবের সাথে। তিনি বর্তমানে একটি মহলের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদশর্নের ঘৃন্যতৎপরতার কথা উল্লেখ করে ক্ষোভ জাহের করেন। আমাদের সাথে কথা বলেন-মাদরাসার প্রবীন শিক্ষক মাওলানা শহীদুল্লাহ, মাওলানা আতিক প্রমুখ।

মাদরাসার অফিস রুমে ঢাকা থেকে আসা পি বি আই হেড ও অন্যান্য উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলে সহযোগিতা করতে পারলেও রুম থেকে বের হতে না হতেই তার যে কলিজাফাটা আর্তনাদ, তা সহ্য করা যায় না। ওই দৃশ্য মনে পড়লেই নিজের অজান্তে চোখ ভিজে যায়।

আহ! অগ্নিদগ্ধ মেয়ের মায়ের কি কষ্ট! শুধু কান্না আর কান্না, পরিচিত কি অপরিচিত এর সামনে।

পাঁচ
মাদরাসার শিক্ষক মণ্ডলী, কর্মকর্তা, কর্মচারী, নুসরাতের চাচা জনাব আলাউদ্দীন সাহেব, বাবা আবুল খায়ের মুসা মানিক, ঘনিষ্ঠ বান্ধবি নিশাত, এলাকাবাসী, বেশকজন ছাত্রের সাথে কথা বললে তারা ঘটনার বিভিন্ন অংশের যে বিবরণ দেন তা বড় ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক। কোন মানুষ এমন করতে করতে পারে বলে ধারনা করাটাও মুশকিল।

নুসরাত তোর বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে, এমনটা বলার পর ছাদে ছুটে গিয়েছিলেন নুসরাত জাহান রাফি। সেখানে পাঁচজন মিলে তাকে ছাদে চিত করে শুইয়ে ফেলেন। তার পরনের ওড়নাটি দুভাগ করে বেঁধে ফেলেন হাত-পা। এরপর এক লিটার কেরোসিন নুসরাতের গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢালা হয়।

ম্যাচের কাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় পায়ে। আগুন যখন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন এই পাঁচজন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে।

অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে দেখা করতে ৩ এপ্রিল তার কিছু ভাড়াটে সন্ত্রাস ছাত্র কারাগারে গিয়েছিলো, অধ্যক্ষ তাদের সবার কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে। এরপর সে আলাদাভাবে মাদ্রাসাছাত্র ও ‘সিরাজ উদ্দৌলা সাহেবের মুক্তি পরিষদ’ নামে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক নুর উদ্দিন, যুগ্ম আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম এবং আরেক ছাত্রের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলে।

সিরাজ উদ্দৌলা তাদের মামলা তুলে নেয়ার জন্য নুসরাতকে চাপ দিতে বলে। পরবর্তী সময়ে তিনি শাহাদাতের সঙ্গে একা কথা বলেন। তখন তিনি চাপে কাজ না হলে প্রয়োজনে নুসরাতকে হত্যার নির্দেশ দেয়।

কারাগার থেকে ফেরার পর ওই দিন রাত সাড়ে ৯টায় মাদ্রাসার পশ্চিম হোস্টেলে শামিম, নুর উদ্দিন, মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের প্রধান আবদুল কাদেরসহ পাঁচজন সভা করেন। সেখানে কে বোরকা আনবে, কে কেরোসিন আনবে, কে কোথায় থাকবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা করা হয়। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় অধ্যক্ষের জেঠাসের (স্ত্রীর বড় বোন) মেয়ে উম্মে সুলতানা পপিকে দিয়ে নুসরাতের বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে এমনটা বলে তাকে ডেকে পাঠানো হবে।

পরদিন সকাল পৌনে নয়টার দিকে নুসরাতকে ডাকতে যান উম্মে সুলতানা। তখন তারা নিচের শ্রেণিকক্ষ থেকে তৃতীয় তলার একটি কক্ষে এসে অবস্থান নেন। কিছুক্ষণ পর উম্মে সুলতানা ও নুসরাত ছাদে ওঠেন। তাদের পিছে পিছে ওঠেন তার (শাহাদাতের) চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে। এরপর তৃতীয় তলা থেকে তারা তিনজন ছাদে যান।

ছাদে ওঠার পর উম্মে সুলতানা পপি প্রথমে নুসরাতকে মামলা তুলে নিতে বলেন। নুসরাত তখন নিশাতকে ছাদে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এরপর শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়েও নুসরাতকে একই কথা বলেন। নুসরাত তখন জবাবে বলেছিলেন, মামলা উঠাব না। আমার গায়ে কেন হাত দিল। ওস্তাদ তো ওস্তাদ। আমি এর শেষ দেখেই ছাড়ব।

নুসরাতের এই জবাব শুনে শাহাদাত নিজে পেছন থেকে এক হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরে ও অন্য হাত দিয়ে হাত ধরে। উম্মে সুলাতানা পপি তখন নুসরাতের পা ধরে। আর শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে নুসরাতের শরীর চেপে ধরে। তিনজন মিলে নুসরাতকে তারা ছাদের মেঝেতে ফেলে দেয়।

নুসরাতকে মেঝেতে শুইয়ে ফেলার পর জোবায়ের নুসরাতের ওড়না দুই টুকরো করে তার হাত ও পা বেঁধে ফেলে। জাবেদ তখন নুসরাতের সারা শরীরে কেরোসিন ঢেলে দেয়। এরপর শাহাদাতের চোখের ইশারায় জোবায়ের তার পকেট থেকে দেশলাই বের করে কাঠি জ্বালিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর পাঁচজনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে। নামতে নামতেই তিনজন ছাত্র তাদের বোরকা খুলে শরীর কাপড়ের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলে। ছাত্রী দুজন মাদ্রাসায়ই তাদের পরীক্ষার কক্ষে চলে যায়। আর বাকি তিনজন নিজেদের মতো করে পালিয়ে যায়।

সিঁড়ি দিয়ে ওই পাঁচজন যখন নামছিলো তখন নুসরাতের আগুন, আগুন, বাঁচাও, বাঁচাও বলে চিৎকার তারা শুনতে পায়। পা থেকে আগুন ধরানোয় প্রথমে নুসরাতের পায়ের বাঁধন খোলে। এরপর আগুন যখন ওপরে উঠে তার হাতের বাঁধন খুলে তখনই নুসরাত এই অবস্থায় হিম্মতের সাথে উঠে দৌঁড়ে নিচে নেমে আসে।

নুসরাতের মুখ শাহাদাত চেপে ধরায় সেখানে আর কেরোসিন ঢালা হয়নি। তাই পুরো শরীর পুড়লেও মুখে আগুন লাগেনি।

ছয়
হাবিব আহমাদ নামে এক পুলিশ অফিসারের সাথে কথা বলার সময় তিনি বললেন-অধ্যক্ষের এই চারিত্রিক পদস্খলনের কথাকি তার সহকর্মীরা জানতো না? অবশ্যই জানতো, এতদিন পর্যন্ত তারা একে রোধ করার চেষ্টা করেনি কেনো? অতএব তারাও এর সহযোগী! এর প্রমান-সিরাজ উদ্দৌলার মুক্তির জন্য মিছিল মিটিং।

তিনি আরো বলেন-অধ্যক্ষের এ অবস্থা হলে অন্যান্য শিক্ষক মন্ডলীর অবস্থা কি হতে পারে সহজেই অনুমান করা যায়।
একজন শিক্ষকের দায়িত্ব,আদর্শ শিক্ষা দেয়া।সে নিজেই আদর্শচ্যুত চরিত্রহীন হলে এদের হাতে ছাত্রের ভবিষ্যতের কি নিরাপত্তা আছে?

দেশ, জাতি আর জনগন কি পাবে এদের থেকে? আমি বললাম- আপনার কথার সাথে শতভাগ একমত। সাথে সাথে আরো একটি তিক্ত সত্যকথা হলো- এগুলো সব সহশিক্ষার অভিশাপ। সহশিক্ষার বেড়াজাল থেকে বের হতে না পারলে কদিন পরে পরেই নুসরাত জাহান রাফিদেরকে দেখতে হবে আমাদেরকে। সহশিক্ষা মানে আল্লাহর আযাব গজবকে ডেকে আনা। মাদরাসার নামে সহশিক্ষা মানে মুসলিম জাতির সাথে গাদ্দারী, প্রতারণা আর ধোকাবাজি।

সাত
মাগরিবের নামাযের পরে নুসরাতের আব্বার সাথে সাক্ষাতকালে তিনি আমাদের পরিচয় জানতে পারলে খুব আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন।নুসরাতের কবর যিয়ারতের অনুরোধ করলে আমি বলি-আমাদের আগে থেকেই ইচ্ছা আছে কবর করার।

তার দেয়া রাস্তার বিবরণ অনুযায়ী নির্জন এলাকা সৈয়দ আহমাদ হোসাইন পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত বোন নুসরাত জাহান রাফির কবরের পাশে দাড়ালে অনেক্ষণ পর্যন্ত কিছুই পড়তে পারিনি,কিছুই মনে আসেনি।শুধু অনুভব করেছি বুকে জড়ানো পোষাকের উপর ফোটা ফোটা গরম পানি।

আহ! কি কষ্ট দিয়েছে এই পাষান পশুগুলো।


(প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নন।)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা