kalerkantho

ঘুম নিয়ে গড়পড়তা বিশ্বাসে গলদ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ১৫:৫৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঘুম নিয়ে গড়পড়তা বিশ্বাসে গলদ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

ঘুম কাতুরে মানুষ হিসেবে আপনিও ভাবতে পারেন বেশি ঘুম শরীর-মনের জন্য ভালো। কিংবা কেউ কেউ ভাবছেন কম ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। বোধ হয় সময় এসেছে আপনার এ ধারণা থেকে সরে আসার।

ঘুম নিয়ে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে অবস্থিত এনওয়াইইউ ল্যাংঅন হেলথস স্কুল অব মেডিসিন'র গবেষকদের একটি গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ঘুম নিয়ে অনেকের মধ্যে কিছু বিশ্বাস রয়েছে। এসব বিশ্বাসের অনেকগুলো সঠিক নয়।

প্রধান গবেষক এনওয়াইইউ ল্যাংঅন হেলথ-এর পপুলেশন হেলথ বিভাগের পোস্টডক্টোরাল রিচার্স ফিলো রেবেকা রবিনস বলেন, 'ভালো ঘুম ও সঠিক সময় জেগে উঠতে পারার মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে।' তিনি বলেন, 'আমাদের প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো দূর করতে হবে, অন্যথায় তা পত্রিকা, বন্ধু, পরিবার বা রোগীদের ভেতর ছড়িয়ে পড়বে।

গবেষণার ফল গতকাল মঙ্গলবার (১৬ এপ্রিল) স্লিপ হেলথ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

রবিনস এবং তার সহকর্মী গবেষকরা আট হাজার  ওয়েবসাইটে অনুসন্ধান চালান। তাতে স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস বিষয়ে মানুষের ধারণাগুলো বের করে আনার চেষ্টা করা হয়। এরপর তা ঘুমের ওষুধের ওপর  বিশেষজ্ঞদের কাছে উপস্থাপন করা হয়। বিশেষজ্ঞরা নির্ধারণ করেন কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল।

এখানে প্রচলিত ১০ ভুল ধারণা তুলে ধরা হলো:

১। প্রাপ্তবয়স্কদের দরকার পাঁচ ঘণ্টা বা তার কম ঘুম 
দিনের বেলা ভালোভাবে কাজ করতে হলে রাতে কত ঘণ্টা ঘুম স্বাস্থ্যকর?- এমন প্রশ্নের জবাবে জ্যেষ্ঠ গবেষক জেরার্ডিন জিন-লুই বলেন, 'অনেকে মনে করেন রাতে পাঁচ ঘণ্টারও কম সময় ঘুমানো ভালো। তিনি বলেন, 'এই ধারণা যথেষ্ট সন্দেহজনক। বয়স অনুযায়ী, একজন মানুষের প্রতিরাতে সাত থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। 

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন বলছে, সেদেশের তিন ভাগের একভাগ মানুষ রাতে সাত ঘণ্টারও কম ঘুমান। ওয়ার্ল্ড স্লিপ ডে পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট  জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘুমের ঘাটতির ঝুঁকিতে।

রবিনস বলেন, 'আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে, পাঁচ ঘন্টা বা তার কম ঘুমে হৃদরোগ ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়।'

২। যে কোন জায়গায়, যে কোন সময় ঘুমিয়ে পড়া 
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চলন্ত গাড়ি / ট্রেন / বিমানে ঘুমিয়ে পড়ার অর্থ আপনি সুস্থ এবং ফুরফুরে মেজাজে আছে। আসলে বিষয়টি ঠিক উল্টো।

রবিনস বলেন, যে কোন জায়গায় যে কোনো সময় ঘুমিয়ে পড়ার অর্থ হলো আপনি ক্লান্ত এবং আপনার মধ্যে ঘুমের ঘাটতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আপনার উচিত এভাবে ঘুমিয়ে পড়ে ঘাটতিটুকু পূরণ করা।

৩। শরীর ও মস্তিষ্ক কম ঘুমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে 
বিশেষজ্ঞরা বলেন এটিও একটি মিথ। কারণ প্রত্যেককে তার ঘুমের চারটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। ঘুমে ঘাটতি থাকলে ধাপগুলোর সব অতিক্রম করা সম্ভব নয়।

হালকা ঘুমের মধ্য দিয়ে এর প্রথম পর্যায় শুরু হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে আপনি পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তৃতীয় ও চার পর্যায়ে থাকে গভীরতম ঘুম যখন আপনি র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (আরইএম)-এর সপ্নময় অবস্থায় চলে যান। শরীরের সুস্থতার জন্য ঘুমের এই চারটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ।

৪। নাক ডাকা বিরক্তিকর হলেও তা ঘুমের জন্য ক্ষতিকর নয় 
শ্বাস প্রশ্বাসে বাধা এলে বাতাস শ্বাসযন্ত্রে কম্পন সৃষ্টি করে। এতে নাক ডাকার শব্দ হয়। প্রকৃতপক্ষে, এটি একটি মারাত্মক ঘুমের ব্যাঘাত। 

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হার্ট, লাঞ্জ অ্যান্ড ব্লাড ইন্সটিটিউট-এর মতে, ঘুমের ভেতর কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি হলে তা হার্ট অ্যাটাক, অ্যাট্রিয়েল ফাইব্রিলেশন, অ্যাজমা, উচ্চ রক্তচাপ, গ্লুকোমা, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ এবং বুদ্ধিবৃত্তীয় সমস্যার মারাত্মক ঝুঁকি বাড়ায়।

৫। ঘুমাতে যাওয়ার আগে অ্যালকোহল 
আপনি কী মনে করেন ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটু অ্যালকোহল পান করলে তা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে?  তেমনটি ভাবলে সম্ভবত তা ভুল।

রবিনস বলেন, অ্যালকোহল আপনাকে ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করে। কিন্তু অ্যালকোহলের প্রতিক্রিয়া  যখন শেষ হবে, তখন? তিনি বলেন, এটি ঘুমের প্রথম পর্যায়ে আপনাকে ফাঁদে ফেলবে এবং রাতের বিশ্রামের ধরনকে পাল্টে দেবে।'

রবিনস বলেন, 'এটি প্রতিনিয়ত গভীরতম ঘুম বা  র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (আরইএম)-এর সপ্নময় অবস্থা থেকে আপনাকে বের করে আনবে। ফলে আপনার ঘুম হবে অসম্পূর্ণ।

৬। ঘুম আসছে না, তই চোখ বন্ধ করে বিছানায় থাকা 
স্বীকার করতেই হবে আপনি বিছানায় গিয়ে চেষ্টা না করলে ঘুম আসবে না। আমরা অনেক সময় ঘুম না আসলে উল্টো গণনা পদ্ধতি অনুসরণ করি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পদ্ধতিতে ১৫ মিনিটেও ঘুম না আসলে তা চালিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

রবিনস বলেন, 'ঘুম না আসলে বিছানায় থাকার কোনো অর্থ হয় না। তিনি বলেন, মানসিক চাপমুক্ত সুস্থ শরীরে ঘুমিয়ে পড়ার জন্য শরীর সময় নেয় সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট। যদি এই সময়ের ভেতর ঘুম না আসে তবে বিছানার বাইরে চলে আসুন, পরিবেশ পরিবর্তন করুন। কম আলোয় ঘোরাঘুরি করুন। তারপর আবার চেষ্টা করুন ঘুমানোর।

৭। ঘুমানোর জন্য কোনো নির্ধারিত সময় নেই 
ঘুম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটিও আরেকটি মিথ যা আপনার স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

রবিনস বলেন, 'ঘুমানোর জন্য প্রত্যেকের নির্দিষ্ট সময়সূচি থাকা উচিত। কারণ এটি আমাদের বায়োলজিক্যাল ক্লককে নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি বলেন, এই অভ্যাস শরীরের 'সার্কাডিয়ান রিদম' বা  শরীরের অন্তর্গত ভারসাম্য রক্ষা করে। আর সার্কডিয়ান রিদম শরীরের ভেতর প্রয়োজনীয় হরমোন নিঃসরণে সহায়তা করে। এটি শরীরের তাপমাত্রা, খাবার গ্রহণ, হজম এবং ঘুম ও ঘুম থেকে জেগে ওঠা সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে।' 

৮। বিছানায় টিভি দেখা 
বিছানায় বসে টিভি দেখা, ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন চালানো মানেই রাতটি আপনার জন্য মোটেও ভালো নয়।

রবিনস ব্যাখ্যা করেন, 'এই ডিভাইসগুলো উজ্জ্বল নীল আলো নির্গত করে। এই নীল আলোই আমাদের মস্তিষ্ককে সজাগ থাকার সংকেত দেয়। এমনকি এগুলো বন্ধ করার পরও তা আমাদের ভেতর অনেক সময় ধরে সক্রিয় থাকে। ফলে ঘুমে বিভ্রাট সৃষ্টি হয়। তাই বিছানায় যাওয়ার আগে এগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে। আর টিভি দেখতে হবে বিছানার বাইরে।

ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের মতে, নীল আলো মেলাটোনিন নামের ঘুমের হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়। তাই ঘুমের দুই ঘণ্টার মধ্যে টিভি দেখা বা  ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করা মানেই, ঘুমানোর জন্য আপনার আরো বেশি সময় লাগবে।

৯। ঘুমের আগে ঝিমুনি 
এই প্রবণতা রোধ করতে হবে। রবিনস বলেন, 'ঘুমের আগে ঝিমানোর প্রবণতা রোধ করতে হবে এই কারণে যে, এটি আপনার ঘুমের সময় নয়। তাছাড়া যে ঘুমের জন্য আপনি ঝিমাচ্ছেন তা খুব হালকা আর নিম্নমানের ঘুম।' সুতরাং, এই প্রলোভন প্রতিরোধ করুন।

১০। স্বপ্ন দেখা মানেই ভালো ঘুমের চিহ্ন 
এটিও একটি মিথ। কারণ ধরা যাক, আপনি রাতে ঘুমের ভেতর চার-পাঁচবার স্বপ্ন দেখেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাঁরা মনে করেন চার-পাঁচবার স্বপ্ন দেখা মানেই চার-পাঁচবার জেগে ওঠা। এটি নিশ্চিতভাবে ঘুমের ব্যাঘাত। 

ফ্রান্সের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যারা ঘুমের ভেতর দেখা স্বপ্ন মনে করতে পারেন, বুঝতে হবে  তাদের মস্তিষ্কের তথ্য-প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র সক্রিয় ছিল। এই প্রক্রিয়াটি নিরেট ঘুমের ক্ষেত্রে ইতিবাচক নয়।

সূত্র : সিএনএন 

মন্তব্য