kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

'ভাবতেও পারিনি গলায় ফোঁড়ার কারণ যক্ষ্মা হতে পারে'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৪ মার্চ, ২০১৯ ১৫:৫৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



'ভাবতেও পারিনি গলায় ফোঁড়ার কারণ যক্ষ্মা হতে পারে'

ঢাকার বাসিন্দা রুখসানা সিদ্দিকের গত বছর তার গলায় কাছে একটি ফোঁড়ার মতো হয়।

শুরুতে বিষয়টিকে তেমন একটা আমলে না নিলেও পরে এতে ব্যথা শুরু হলে তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। ডাক্তারি পরীক্ষায় জানতে পারেন যে তার গলার যক্ষ্মা হয়েছে।

মিসেস সিদ্দিক শুরুতে ভেবেছিলেন এটি ব্রণের মতোই হয়তো সাধারণ কোন ফোঁড়া যেটা দুই একটা ওষুধেই সেরে যাবে।

কিন্তু গলার এই ফোঁড়ার কারণ যে যক্ষ্মা হতে পারে তিনি ভাবতেও পারেননি।

পরে চিকিৎসকের পরামর্শে নয় মাসের ওষুধ খেয়ে পুরোপুরি সুস্থ আছেন মিসেস সিদ্দিক।

এখন তিনি তার আশেপাশের মানুষকেও সচেতন করছেন যে যক্ষ্মা কেবল ফুসফুসের রোগ নয়।

যক্ষ্মা শুধু ফুসফুসে হয় না
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, যক্ষ্মার জীবাণু যে কেবল ফুসফুসকে আক্রান্ত করে তা নয়, এটি মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে, ত্বক, অন্ত্র, লিভার, কিডনি, হাড়সহ দেহের যেকোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সংক্রমণ হতে পারে।

তবে ফুসফুসে যক্ষ্মা সংক্রমের হার সবচেয়ে বেশি হওয়ায় সরকারি সচেতনতামূলক প্রচারণায় সেটাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় বলে তারা জানান।

ঢাকার এমডিআরটি (মাল্টি ড্রাগ রেজিসটেন্স টিউবারকুলোসিস) বিশেষজ্ঞ ড. মাহমুদুল হাসান খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ফুসফুসে যক্ষ্মা হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি হওয়ায় সবার ধারণা যে যক্ষ্মা মানেই ফুসফুসের রোগ। কিন্তু আসলে তা না।"

"আমাদের এমন কোন অর্গান (অঙ্গ) নাই, যেখানে যক্ষ্মা হয়না। কারণ যক্ষ্মা হচ্ছে একটি বায়ুবাহিত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক ব্যাধি যেটা মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকুলোসিস জীবাণুর সংক্রমণে হয়ে থাকে।"

"আর এই জীবাণু যেকোন অঙ্গেই সংক্রমিত হতে পারে।"

কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন?
দেশের মোট জনসংখ্যার একটি অংশ জন্মগতভাবেই যক্ষ্মা রোগের জীবাণু বহন করে বলে জানান ড. হাসান।

তবে শরীরে জীবাণু থাকা মানেই এই নয় যে ব্যক্তি রোগে আক্রান্ত।

তবে জীবাণুর ধারক নিজে আক্রান্ত না হলেও তার মাধ্যমে অন্যের শরীরে যক্ষ্মা ছড়াতে পারে। আর সেটা যেকোন অঙ্গেই হতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, এই জীবাণু থেকে তাদেরই রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল।

এছাড়া ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের এই জীবাণুতে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।

এছাড়া পরিবেশ দূষণ, দরিদ্রতা, মাদকের আসক্তি, অপুষ্টি, যক্ষ্মার হার বাড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

শরীরের অন্য কোন অঙ্গে যক্ষ্মা রোগের লক্ষণ কী?
ফুসফুসে যক্ষ্মার জীবাণু সংক্রমিত হলে টানা কয়েক সপ্তাহ কাশি, কফের সাথে রক্ত যাওয়ার মতো সাধারণ কিছু লক্ষণের ব্যাপারে কম-বেশি প্রায় সবারই জানা।

কিন্তু শুরুতে যার কথা বলেছিলাম, মিসেস সিদ্দিক তিনি ভাবতেও পারেননি তার গলার এই ফোঁড়ার কারণ যক্ষ্মা হতে পারে।

এমন অবস্থায় শরীরের অন্যান্য অংশে যক্ষ্মার জীবাণু আক্রান্ত হলে সেটা বোঝার উপায় কি?

এ ব্যাপারে ড. হাসান কয়েকটি লক্ষণের কথা জানান-

- শরীরের যে অংশে যক্ষ্মার জীবাণু সংক্রমিত হবে সেই অংশটি ফুলে উঠবে। যেমন গলার গ্লান্ড আক্রান্ত হলে গলা ফুলবে, মেরুদণ্ডে আক্রান্ত হলে পুরো মেরুদণ্ড ফুলে উঠবে।
- ফোলা অংশটি খুব শক্ত বা একদম পানি পানি হবে না। সেমি সলিড হবে। ফোলার আকার বেশি হলে ব্যথাও হতে পারে।
- লিভারে যক্ষ্মা হলে পেটে পানি চলে আসে, তাই পেটও অস্বাভাবিক ফুলে যায়।
- মস্তিষ্কে সংক্রমিত হলে সেখানেও পানির মাত্রা বেড়ে যায়। অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্ক যে ইডিমা বা পানির মধ্যে থাকে, সেটার পরিমাণ বেড়ে যায়।
- এছাড়া চামড়ায় বা অন্য যেখানেই হোক না কেন সেই অংশটা ফুলে ওঠে।
- এছাড়া ক্ষুধামন্দা, হঠাৎ শরীরের ওজন কমে যাওয়া, জ্বর জ্বর অনুভব হওয়া, অনেক ঘাম হওয়া, ইত্যাদি যক্ষ্মার কিছু সাধারণ লক্ষণ।

করণীয় কী?
উপরের লক্ষণগুলোর দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে বলে পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

ড. হাসান বলেন, "যদি শরীরের কোন অংশ ফুলে ওঠে আর কয়েকদিনেও ফোলা না কমে, এছাড়া ফুসফুসে যক্ষ্মার লক্ষণগুলোর মধ্যে হাঁচি-কাশি বাদে বাকি লক্ষণগুলোর কোন একটি দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।"

"ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে যে ব্যক্তি যক্ষ্মায় আক্রান্ত কি-না।"

সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে যক্ষ্মা পুরোপুরি সেরে যায়, তাই দেরি না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার ওপর জোর দেন চিকিৎসকরা।

যক্ষ্মা দীর্ঘমেয়াদি রোগ হওয়ায় এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ খেতে হয়। যেটা ছয় থেকে নয় মাস পর্যন্ত হয়ে থাকে।

এমন অবস্থায় যক্ষ্মারোগীদের ধৈর্যের সাথে নির্দিষ্ট মাত্রা অনুযায়ী পুরো মেয়াদে ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।

তবে অনেক সময় দুই থেকে তিন মাস ওষুধ খাওয়ার পর রোগী খুব ভালো অনুভব করে। তার রোগের সব লক্ষণ চলে যায়।

এমন অবস্থায় অনেকেই সেরে উঠেছেন ভেবে ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দেন।

এক্ষেত্রে পরবর্তীতে আবারও যক্ষ্মা হওয়ার আশঙ্কা থাকে, এবং তার ক্ষেত্রে আগের ওষুধ কোন কাজে আসেনা বলে জানান ড. হাসান।

এছাড়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রচুর পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার ওপরও হোর দেন তিনি।

সঠিক সময় চিকিৎসা না নিলে এই জীবাণু শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে রোগীর মৃত্যু হতে পারে এবং চিকিৎসা না নেয়ার কারণে তার মাধ্যমে আরও অনেকের মধ্যে জীবাণুটি ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ড. হাসান।

এক্ষেত্রে, সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর ওপর জোর দেন তিনি।

শরীরের অন্য অংশের যক্ষ্মা কতোটা ছোঁয়াচে?
ড. হাসানের মতে, যতগুলো যক্ষ্মা রয়েছে, এর মধ্যে ৮০ ভাগই ফুসফুসে হয়ে থাকে এবং এটি সবচেয়ে গুরুতর ও ভীষণ ছোঁয়াচে বলে তিনি সতর্ক করেন।

তিনি বলেন, ফুসফুসের যক্ষ্মা আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে সুস্থ মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে যেতে পারে।

মূলত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এমনকি কথা বলা থেকেও যক্ষ্মার জীবাণু খুব দ্রুত একজনের কাছ থেকে আরেকজনের ভেতর ছড়াতে পারে।

সেক্ষেত্রে শরীরের অন্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের যক্ষ্মা এতোটা ছোঁয়াচে নয়। তাই এটি ফুসফুসে যক্ষ্মার মতো ঝুঁকিপূর্ণ নয়।

শুধুমাত্র আক্রান্ত ব্যক্তি যদি তার আক্রান্ত স্থান সুস্থ ব্যক্তির কাটা অংশ স্পর্শ করেন, তাহলে এই রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে।

তবে যক্ষ্মার চিকিৎসা শুরুর এক মাসের মধ্যে এই জীবাণু ছড়ানোর প্রকোপ কমে যায়।

যক্ষ্মা রোগের পরীক্ষা :
যক্ষ্মা নির্ণয়ের জন্য আমরা সাধারণত এমটি টেস্ট, স্পুটাম টেস্ট, স্মিয়ার টেস্ট, এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, কালচার টেস্ট, এফএনএসি এবং বর্তমান যুগের সবচেয়ে আধুনিক জিন এক্সপার্ট পরীক্ষা করার কথা জানান ড. হাসান।

রোগের ধরণ বুঝে নমুনা হিসেবে রোগীর কফ, লালা, হাড়, বা গ্লান্ডের তরল সংগ্রহ করা হয়।

যক্ষ্মা ছড়ানো প্রতিরোধের উপায়
যক্ষ্মার জীবাণু ছড়ানো প্রতিরোধে কিছু বিষয়ে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ড. হাসান।

- হাঁচি-কাশির সময় মুখে রুমাল দেওয়া , না হলে অন্তত হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বা সবার থেকে দূরে গিয়ে কাশি দেয়া।
- যেখানে সেখানে থুতু-কফ না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে ভালভাবে জায়গাটি পরিষ্কার করা বা মাটি চাপা দেয়া।
- কারও মুখের সামনে গিয়ে কথা না বলা অথবা যক্ষ্মা জীবাণুমুক্ত রোগীর সঙ্গে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলা।
- যক্ষ্মা রোগীর আক্রান্ত স্থান, সুস্থ ব্যক্তির ক্ষত স্থানের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা।
- পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
- রোগী জীবাণুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে।
- থ্রিএইচটি প্রতিরোধক থেরাপির মাধ্যমে এই জীবাণু থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে - রোগীকে রিফাপেন্টিং নামে একটি ওষুধ প্রতিমাসে একবার করে তিন মাস খেতে হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা