kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১                     

ধূলির শহরে হোলি

সনৎ বাবলা, বিরাটনগর থেকে    

২৩ মার্চ, ২০১৯ ১২:৫০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ধূলির শহরে হোলি

শেষ হয়ে গেল মহা-আনন্দের হোলি। হিন্দুপ্রধান নেপালে এটা বড় উৎসব। একে অন্যকে রং মাখিয়ে দেবে আর এই রঙের খেলায় ভালোবাসা দেওয়া-নেওয়ায় পোক্ত হয় সম্প্রীতির বন্ধন। কয়েক দিন আগে থেকে শুরু হয়েছিল এর প্রস্তুতি। ‘হ্যাপি হোলি’ লেখা টি-শার্ট বিক্রির ধুম পড়েছিল এখানে। দোকানে বেড়েছে রং, আবির আর মদের মজুদ। রেস্টুরেন্টের মালিকও বাংলাদেশি সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল একসঙ্গে পানাহারে উৎসব উদ্‌যাপন করতে। আমন্ত্রণ ছিল নেপালি সাংবাদিকদের পক্ষ থেকেও।

বিরাটনগরে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ কভার করতে আসা কাঠমাণ্ডু পোস্টের সাংবাদিক প্রোজ্জ্বল অলি আক্ষেপ করেছিলেন, ‘এই দিনে বাইরে থাকা কষ্টের, পরিবারকে খুব মিস করব। কাঠমাণ্ডুতে থাকলে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে রং খেলা হতো, খাওয়া-দাওয়া হতো। সে যখন আর হচ্ছে না, তখন আমরা সব সাংবাদিক মিলেই হোলি উদ্‌যাপন করতে পারি।’ পুরো শরীরে রং মেখে, ব্যাপক খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে হোলি উদ্‌যাপন করেছে দুই দেশের সাংবাদিকরা। আসলে দিনটা শুধু পরিবার-পরিজনকেন্দ্রিক উদ্‌যাপন নয়, চেনা-অচেনার রং মাখামাখিতে রাঙিয়ে গিয়েছিল পুরো নেপাল। বাঙালি হিন্দুদের কাছে এটা ‘দোলযাত্রা’, পুরাণ অনুসারে গৌরবর্ণের কৃষ্ণের মুখে রং মাখিয়ে রাধার প্রেম নিবেদনের দিনটিই হলো দোলপূর্ণিমা। কালে কালে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই উৎসবে রঙের সঙ্গে যোগ হয়েছে অনেক ঢং, এখন ডিজে পার্টিসহ রাস্তার ধারে ধারে হয়েছে উৎসবের আয়োজন।

কিন্তু বিরাটনগরের সমস্যা অন্য জায়গায়, এই শহর ধূলি মেখে সাদা হয়ে যায় প্রতিদিন। একবার বাইরে বের হলেই সর্বাঙ্গে ধূলি মেখে ফিরতে হয়। ঢাকার লোকজনেরও ধূলি-ধূসরিত হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে, মেট্রো রেল কনস্ট্রাকশন কাজের সময় মিরপুর রোডের যাত্রীরাও নিত্য বাড়ি ফিরেছে ধুলো মেখে। তার চেয়ে চার গুণ বেশি এখানে ধূলির উৎপাত। স্থানীয়দের জীবনের সঙ্গী হয়ে গেছে তাই মাস্ক। এখানে চলছে রাস্তার সংস্কার, ছয় লেনে উন্নীত করতে গিয়ে নাগরিকদের ফুসফুসের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছেন মেয়র। ‘এখানকার মেয়রের কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। গত চার বছর ধরেই চলছে রাস্তার কাজ, এ ছাড়া নানা বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। শহর বড় হচ্ছে, ঠিক আছে। কাজগুলো কখন করলে কিংবা কিভাবে করলে জনজীবন বিঘ্নিত না হয়, সেটা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। মানুষ বেঁচে না থাকলে শহরের মূল্য কী’—খুব ক্ষুব্ধ স্টিল মিলে কাজ করা ইঞ্জিনিয়ার দীনেশ সাঙ্গারি। বাংলাদেশের মতোই অবস্থা, প্রজার কারো রাগ-ক্ষোভে রাজার কিছু যায় আসে না। চার-পাঁচ বছরের বাস্তবতায় বিরাটনগর হয়ে গেছে ধূলিনগর। তাই এখানকার হোলিতে ধুলোর উৎপাত, এটা ‘রং-ধুলো’র উৎসব।

দুই লাখের কিছু বেশি মানুষের বাস এই শহরে। আপাতভাবে শান্তিপ্রিয় মানুষ, তাদের প্রাত্যহিক দিনযাপনে যেন ঢাকার মানুষের মতো অত তাড়াহুড়া নেই। তাদের নিত্য বাহন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, চলে খুব ধীরে। এ জন্য তাদের কোনো অভিযোগও নেই। ধীরগতিই বুঝি তাদের জীবনের প্রতীক। তবে এই সহজ-সরল মানুষের মাঝে সব সময় লুকিয়ে থাকে কিছু লোভী মুখও, যাঁরা বিদেশি দেখলেই ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। তাই প্রথম রাতে ডিম-অমলেটের দাম দিতে হয়েছিল ৯০ টাকা। সমাজতাত্ত্বিক অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বলতেন, ‘নতুন জায়গার মানুষ চিনতে এবং অর্থনীতি বুঝতে বাজারে যেতে হবে প্রথমে।’ বাজার ঘুরে দেখা গেল সেই ডিমের দাম মাত্র ১০ টাকা! এর পরও ডিমের দাম কমে না, পর্যটক দেখলেই জিনিসের দাম বেড়ে যায় তিন-চার গুণ। এখানে পর্যটকও সেরকম আসে না। এর আগে কোনো বাংলাদেশি এসে এখানে ১২ দিন কাটিয়েছে কি না সন্দেহ। অথচ এটা বাংলাদেশের যশোরের মতো এক শহর। কিন্তু বিস্ময়কর হলো এর হোটেল সংখ্যা, যে দিকে চোখ যাবে শুধু হোটেল । আশপাশের গ্রামগঞ্জ থেকে বিপুল লোকজন আসে, দু-একদিন থেকে কাজকর্ম সেরে চলে যায়। ধূলিনগরীতে দেখারও কিছু নেই, ঘোরারও জায়গা নেই। এর পরও বাংলাদেশি সাংবাদিকরা থাকার রেকর্ড গড়ে গেছে বিরাটনগরে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা