kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

জনৈক আকরাম হোসেন বাদশার অনন্য আয়োজন

৩০০ প্রতিবন্ধীর জীবনে এমন দিন আসেনি আর!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২১ মার্চ, ২০১৯ ১৫:৪৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



৩০০ প্রতিবন্ধীর জীবনে এমন দিন আসেনি আর!

ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক থেকে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ধরে সাড়ে ছয় কিলোমিটার ভেতরে ঢুকলেই ছায়া সুনিবিড় রিসোর্ট সাহেব বাড়ি। সবুজ প্রকৃতির বুক চিরে বয়ে চলা সরু সড়কের পাশেই সুবিশাল রিসোর্ট। অন্য সময় দেশের নানা প্রান্ত থেকে আগত অতিথিদের আভিজাত্যের ছাপ থাকে এখানে।

তবে গতকাল বুধবারের দিনটি ছিলো একেবারেই অন্যরকম। এ দিনও রিসোর্টে এক অসাধারণ গল্প রচিত হয়েছে। তবে সেটি কোনো অভিজাত পরিবার কিংবা ধনীর দুলাল-দুলালীকে ঘিরে নয়। সকাল থেকে এখানে মিলিত হয়েছিলেন ৩০০ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার প্রহলাদপুর, গোসিঙ্গা এবং রাজাবাড়ী ইউনিয়নের এই মানুষগুলোর জীবনে প্রথমবারের মতো অনেক কিছু ঘটল কালই!

গোসিঙ্গা থেকে আসা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আজিজুলের খাবারের পাতে এর আগে কোনোদিন একসঙ্গে মুরগির রোস্ট আর গরুর মাংস জোটেনি। শারীরিক প্রতিবন্ধী ছোট্ট শিশু সায়েম কখনো দোলনায় বসার সুযোগ পায়নি। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার মিয়া এত সুন্দর রিসোর্ট কাছ থেকে দেখেনইনি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, কখনো পিকনিকে যাওয়ার সুযোগই আসেনি এই ৩০০ জন প্রতিবন্ধীর জীবনে।  ২০ মার্চ দিনটি তারা হয়তো অনেকদিন মনে রাখতে চাইবেন। কারণ, এদিন ভোর থেকে তারা পিকনিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। প্রথমে রিকশায় চড়ে বাসের কাছে। এরপর কয়েকটি বাসে করে একযোগে আনন্দঘন পরিবেশে যোগ দেন তারা। দৃষ্টি, শারীরিক এবং মানসিক প্রতিবন্ধী ছিলেন বেশি। তাদের অনেকের সঙ্গে এসেছিলেন অভিভাবকরাও। কেউ হুইল চেয়ারে বসে, কিংবা মায়ের কোলে চড়ে, কেউ আবার বাবা-ভাইয়ের কাঁধে ভর দিয়ে।

 

সকালের নাস্তা দিয়ে শুরু। এরপর সাহেব বাড়ি রিসোর্টের চারপাশে ঘুরে দেখা। সুইমিং পুলের নামই তারা কখনো শোনেনি। সেটির খুব কাছে গেলেন, দোলনায় চড়লেরম ফুল পাখির সঙ্গে আনন্দে মাতলেন। দুপুর হতেই তাদের বসিয়ে দেওয়া হলো খাবারের টেবিলে। খাবার দেখে তাদের চোখ ছানাবড়া! চোখেমুখে তৃপ্তি আর অবিশ্বাসের ছায়া। প্লেটে-পেয়ালায় মুরগির রোস্ট, গরুর মাংস, থাই ভেজিটেবল, সবুজ সালাদ আর কোমল পানীয়ের বোতল! চোখের সামনে এত খাবার তারা যেন এ প্রথম দেখলেন। পেটপুরে খেলেন। এরপর আবার শুরু হয় ঘোরাফেরা। বিকেলে নাস্তা শেষে পিকনিকের সমাপ্তি। তাদের জন্যে বুধবারের সবগুলো ঘটনাই যেন একেকটি রোমাঞ্চকর অধ্যায়।

সমাজের সবচাইতে অবহেলিত এই প্রতিবন্ধীদের জীবনে এত সুন্দর একটি দিন উপহার দিলেন এখানকার পরিচিত মুখ আকরাম হোসেন বাদশা। কোনো উদ্দেশ্য হাসিল নয়, নেই কোনো রাজনৈতিক পটভূমি। প্রতিবন্ধীদের একটি আনন্দের দিন উপহার দেওয়ার প্রবল ইচ্ছেশক্তি থেকেই তাঁর এই আয়োজন।

দিন শেষে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে আকরাম বলছিলেন, ‘আমার মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেলো। জীবনে এমন দিন খুব কমই আসে। অসম্ভব এক ভালোলাগা কাজ করছে। আমি এমনটিই চেয়েছিলাম। আমি নিজেকে আজ সার্থক মনে করছি।’

প্রসঙ্গক্রমে আকরাম হোসেন বাদশা বলেন, ‘প্রতিবন্ধী নারী, পুরুষ, শিশুগুলোর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বারবারই আমার চোখ ভিজে গেছে। তাদের কষ্টের কথা শুনেছি। তাদের দুর্বিষহ জীবনের সামান্য চিত্র সামনে থেকে দেখেছি। তারাও আমাদের মতো মানুষ। অথচ সমাজে তারা কত অবহেলিত!’

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বার্ষিক শিক্ষা সফরের আয়োজন করে। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, অপ্রতিষ্ঠিত নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত পর্যন্ত- সকলেই বছরের কোনো না কোনো সময়ে বনভোজনের আয়োজন করে। এই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনে বনভোজন বলে কিছু নেই। সেই চিন্তা থেকে আমি তাদের নিয়ে বনভোজনের আয়োজন করি।’

প্রহলাদপুর গ্রামে থেকে এসেছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘গরু মাংস দিয়ে পোলাউ খাইছি। দামি জায়গায় ঘুরতাছি। খুব ভালো লাগছে।’

ফাওগান গ্রাম থেকে এসেছেন সুমন মিয়া। ছোটবেলা থেকেই তার দুই হাত অবশ। তিনি কোনো কাজ করতে পারেন না। বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। সারাদিন ঘরে বসে থাকতে হয়। সারাদিনের এই আনন্দ ছিল তার জীবনের সেরা সময়।

বিকেলে প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে উন্নয়নমূলক আলোচনা হয়। সেখানে প্রতিবন্ধীরাও তাদের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আজিজুল বলেন, ‘আমি এই দোনিয়াডা দেখপার চাই। আপনারা আমার চোখটা ভালো কইরা দেন'। এ সময় তার উন্নত চিকিৎসার আশ্বাস দেন আয়োজক আকরাম হোসেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা কেউই আসলে প্রতিবন্ধী নন। সবাই মানুষ। আপনাদেরও অন্য সবার মতো অধিকার আছে এই সমাজে। আমাদের দায়িত্ব আছে আপনাদের প্রতি'।

আলোচনা শেষে বিকেলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কেক কাটা হয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাঝে নিজের হাতে কেক তুলে দেন আকরাম হোসেনের স্ত্রী মনিরা সুলতানা মুনমুন এবং তাদের একমাত্র সন্তান মিফতা হোসাইন।

অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যায় সকল প্রতিবন্ধীদের আবারো বাসে করে পৌঁছে দেওয়া হয় প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি।

প্রতিবন্ধীদের নিয়ে এই আয়োজন দেখতে রিসোর্টে উপস্থিত হন প্রহলাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম আকন্দ, ভাওয়ালগড় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সালাউদ্দীন সরকার।

যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি চাকরির পাঠ চুকিয়ে দেশে আসেন আকরাম হোসেন। পৈতৃক জমিতে মাছ ও গরুর খামার গড়ে তোলেন তিনি। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়া আকরাম এলাকায় একাধিক মাটি ও ইটের রাস্তা নির্মাণ করেছেন। খামার থেকে পাওয়া লাভের অংশ দিয়ে তিনি এলাকার দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা