kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

জাবালে নূর ফিরেছে; সুপ্রভাতও ফিরবে

সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল   

২০ মার্চ, ২০১৯ ১৭:৩৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জাবালে নূর ফিরেছে; সুপ্রভাতও ফিরবে

রাজধানীর প্রগতি সরণীতে শিক্ষার্থীদের রাজপথ অবরোধ। ছবি : কালের কণ্ঠ

গত বছর ২৯ জুলাই বেপরোয়া বাসের চাপায় প্রাণ হারিয়েছিলেন দুই কলেজ শিক্ষার্থী দিয়া খানম মীম ও আবদুল করিম রাজিব। আহত হয়েছিলেন ৯ জন। এরপর গড়ে উঠেছিল নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলন। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এই হত্যাকাণ্ডে দায়ী জাবালে নূর পরিবহন। সেই ঘটনার দুই মাস না যেতেই আবারও সড়কে ফিরে আসে জাবালে নূর বাস। আবারও শুরু হয় বেপরোয়া প্রতিযোগিতা। যার ফলশ্রুতিতে ৮ মাসের মাথায় আবারও বাস চাপায় প্রাণ গেল শিক্ষার্থীর!

এবার জাবালে নূর নয়; প্রগতি সরণীতে সুপ্রভাত পরিবহন বাসের চাপায় প্রাণ গেছে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহম্মেদ চৌধুরীর। আবারও রাজপথে নেমে এসেছে শিক্ষার্থীরা। দাবি উঠেছে নিরাপদ সড়কের। যথারীতি 'সাময়িক বন্ধ' করা হয়েছে সুপ্রভাত পরিবহন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেই বাসের চালককে; যিনি আবরারকে চাপা দেওয়ার আগে শাহজাদপুর এলাকায় সিনথিয়া সুলতানা মুক্তা (২০) নামের ওই তরুণীকে ধাক্কা দিয়ে এসেছে। 

রাজধানীর বিশ্বরোড এলাকায় শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ। ছবি : কালের কণ্ঠ

যথারীতি শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, দোষীদের বিচার করা হবে। কিন্ত আজ অবধি সড়ক দুর্ঘটনায় দায়ী কোনো চালকের শাস্তি হয়েছে বলে শোনা যায়নি। প্রগতি সরণীর যে জায়গাটিতে আবরার নিহত হয়েছেন; সেখানে এতদিন কোনো ফুট ওভারব্রিজ ছিল না। যদিও প্রতি সেকেন্ডে ওই জায়গাটিতে দিয়ে অসংখ্য মানুষ রাস্তা পারাপার করেন। আবরারের মৃত্যুর পর তার নামে ফুট ওভারব্রিজ তৈরির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। হয়তো নির্মাণ হয়েও যাবে। কিন্তু সড়ক কি নিরাপদ হবে? এভাবে একজন করে আবরারের মৃত্যু হবে; আর একটি করে ওভারব্রিজ নির্মাণ হবে; তাই কি?

সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচলিত কথা হলো, এদেশে কারও মৃত্যু না হলে কোনো কিছুর পরিবর্তন হয় না। কিন্তু পরিবহন সেক্টর যেন সবকিছু ঊর্ধ্বে! কোনো কিছুতেই এদের মাথাব্যথা নেই। আবরারকে যে চালকটি চাপা দিয়েছেন; তার কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। দিয়া-করিমকে যে ড্রাইভারটি মেরেছিল; তারও কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। ওই মৃত্যুর পর চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। চালকদের মাদক সেবন বন্ধ করা যায়নি। এখনও দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে বাসে বসেই মাদক সেবন করে তারা!

দিয়া-করিমের মৃত্যুর পর চালকদের প্রশিক্ষণ; মোটিভেশন দেওয়াসহ অনেক কথাই শোনা গেছে; যার একটাও বাস্তবায়িত হয়নি। মহাসড়কে বাসের প্রতিযোগিতা বন্ধ করা যায়নি। আমরা যারা বাসে করে অফিসে যাতায়াত করি; তারা প্রতিদিন দুই বাসের প্রতিযোগিতার সন্মুখীন হই। চিৎকার চেঁচামেচি ধমকেও চালকের কোনো ভ্রুক্ষেপ হয় না। রীতিমতো প্রাণ হাতে নিয়ে গন্তব্যে যেতে হয়। রাস্তায় বের হওয়ার পর সুস্থ দেহে বাসায় ফেরা হবে কিনা; তা পুরোপুরি অনিশ্চিত! 

আবরারের খুনী বাসচালক সিরাজুল ইসলাম। ছবি : সংগৃহীত

এদেশের চালকেরা ট্রাফিক আইন আদৌ জানে কিনা তাতে বিস্তর সন্দেহ আছে। জেব্রা ক্রসিংয়ে একজন মানুষও দাঁড়ালে বাস থামাতে হবে; এটা এদেশের চালকরা হয়তো জানেই না! আবরার এই জেব্রা ক্রসিংয়েই লাশ হয়েছেন। দিয়া-করিমের মৃত্যুর পরও ফিটনেসবিহীন বাসে রাজধানী সয়লাব। এর একটিও বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। একটি বা দুটি কম্পানির আওতায় বাস চালানোর যে কথা শোনা যাচ্ছিল সেটা মুখের বুলিতেই আটকে আছে। যাত্রী ওঠা-নামা করার নির্দিষ্ট জায়গা ব্যবহারে বাধ্য করা যায়নি। যে দেশে পুলিশকে ২০ টাকা ধরিয়ে দিলে সাত খুন মাপ হয়ে যায়; সে দেশে এসব সভ্য আইন কীভাবে বাস্তবায়িত হবে?

মাথা ব্যথার জন্য ওষুধ না দিয়ে মাথা কেটে ফেলায় আমাদের জুড়ি মেলা ভার! জাবালে নূর আবারও রাস্তায় ফিরে এসেছে। গতকাল বন্ধ হওয়া সুপ্রভাতও আবার ফিরবে। বাসের নামে কী আসে যায়। সুপ্রভাত যদি কখনও রাস্তায় নাও নামে; সেই গাড়ির চালকেরা অন্য বাস চালাবে। সেই বাসগুলো অন্য কোনো কম্পানির নামে চলবে। জাবালে নূর যেভাবে চলেছে। আবারও চালকেরা মানুষ মারবে। প্রতিদিনই এই চালকরা সারাদেশে মানুষ মেরে চলছে; যা অনেকটা গা সওয়া হয়ে গেছে। সবকিছু স্বাভাবিক হবে; কিন্তু বাস্তবায়িত হবে না সভ্য আইন! আমরা কি কখনও সভ্য জাতি হতে পারব না?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা