kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন

একটিও সংবাদ সম্মেলন না করা প্রথম প্রধানমন্ত্রী মোদি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ মার্চ, ২০১৯ ২১:২৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



একটিও সংবাদ সম্মেলন না করা প্রথম প্রধানমন্ত্রী মোদি

স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি, যিনি সরকারের মেয়াদকালে একটিও সংবাদ সম্মেলন করেননি।

মোদির সরকারের অবশিষ্ট মেয়াদকাল আর মাত্র আড়াই মাস। এরমধ্যে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে সামনে আসবেন বলে মনে করছেন না রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির নেতাদের সঙ্গে সাংবাদিকদের সখ্যতা সেই শুরু থেকেই। কিন্তু, ওসবের ধার ধারেন না মোদি। সরকারের শীর্ষে থেকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ধাতে নেই। বরং তা এড়িয়েই চলেন তিনি। গত ৫ বছরে একটিও সাংবাদিক সম্মেলন করেননি তিনি। তবে, মাঝেমধ্যে পছন্দের সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেলে ‘‌সাজানো'‌ প্রশ্নের জবাব দিতে দেখা গেছে তাঁকে।

মৌন মোদি
গত পাঁচ বছরে কর্মসংস্থান, কৃষক দুর্দশা, গো-‌রক্ষা, দলিত নিপীড়ন, গণপিটুনির মতো বিষয়গুলিতে মুখে কুলুপ এঁটে থেকেছেন মোদি। নোটবন্দি, পণ্য ও পরিসেবা কর, হালের সীমান্তে উত্তেজনার ইস্যুতেও সংসাদমাধ্যমকে এড়িয়ে চলেছেন মোদি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে কার্যত দেউলিয়া করে পগার পার হওয়া মেহুল চোকসি, বিজয় মালিয়া ও নীরব মোদিদের নিয়েও ‘নীরব’ থেকেছেন তিনি। এজন্য তাঁকে ‘‌‌মৌন মোদি’ আখ্যা দিয়েছে বিরোধী শিবির। অথচ, সরকারি হোক বা দলীয়, জনসভায় বরাবরই গলা চড়াতে পছন্দ করেন নরেন্দ্র মোদি।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর আজ অবধি একটিও সাংবাদিক সম্মেলন করেননি মোদি। কয়েক বছর আগেও যাঁকে ‘‌মৌন ‌মোহন সিং'‌‌ বলে কটাক্ষ করা হত, সেই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বছরে অন্তত দু-‌বার সাংবাদিক সম্মেলন করতেন। এমনকি তাঁর বিদেশ সফরে সঙ্গী হতেন সাংবাদিকরা। বিমানে সংবাদমাধ্যমকে নিয়মিত সাক্ষাৎকার দিতেন তিনি।

এ পর্যন্ত ৪০ বার বিদেশ সফর করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু সঙ্গে নেননি বেসরকারি সংবাদমাধ্যমকে। প্রথা ছিল, প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের বিমান মাশুল দিত সরকার। কিন্তু, বিদেশে সাংবাদিকদের থাকা-‌খাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হত নিজেদের খরচে। মোদি ক্ষমতায় এসে সে সব বন্ধ করেছেন। যদিও এই বিষয়ে সরকারের বক্তব্য, ‘‌‘‌জনগণের করের অর্থ অপচয় রুখতেই এমনটা করা হয়েছে।’’

কিন্তু, নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী গুটিকতক সাংবাদিক সরকারের কর্মকাণ্ড নিজের চোখে দেখে সংবাদ পরিবেশন করতেন। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের সমালোচনাও করতেন। সরকারের মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ আমলাদের সঙ্গে কথোপকথনের সুযোগ মেলার ফলে বহু অজানা তথ্য প্রকাশ পেত। ‘‌ব্যয় কমানো’র অজুহাতে সেসব বন্ধ করা ঠিক কতটা যুক্তিগ্রাহ্য?‌ একি সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলা নয়?‌ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে ভয় পাওয়া নয়?‌‌

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এই অনভিপ্রেত নীরবতা নিয়ে মুখ খুলেছেন মনমোহনও। ‌বলেছেন, ‘‌‘‌আমি কখনও ‌সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পেতাম না। মুখ খোলার জন্য উনি (‌মোদি)‌ আমাকে যে উপদেশ দিতেন, এখন সেটা ওঁর নিজের ওপর প্রয়োগ করে দেখানো উচিত।'‌'‌‌ সম্প্রতি নিজের লেখা ‘‌চেঞ্জিং ইন্ডিয়া’ বইয়ে লিখেওছেন সেকথা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুগত হাজরা ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‌‘‌মিডিয়ার এই দশার জন্য দায়ী ভারতীয় মিডিয়াই। কারণ, রাহুল গান্ধী বা বিরোধী নেতাদের পেছনে ফেলে দিয়ে একতরফাভাবে মোদির সমালোচনা শোনা যায়। অথচ বিরোধী নেতা-‌নেত্রীদের দুর্নীতি, কেলেঙ্কারি নিয়ে চুপ থাকে মিডিয়া। সরকারি খরচে সাংবাদিকরা বিদেশে গিয়ে কোনো চাঞ্চল্যকর সংবাদ পরিবেশন করেছেন, এমনটা শোনা যায় না। তাই প্রথা অনুযায়ী জনগণের করের টাকায় সাংবাদিকদের বেড়াতে নিয়ে গেলেও কোনো রাজকার্য সিদ্ধ হত ‌না।’’

কয়েক দশক ধরে সাংবাদিকতা করছেন, এমন প্রবীণ সাংবাদিকদের মতে, ‌নরেন্দ্র মোদি আসলে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করেছেন অত্যন্ত সুকৌশলে। জাতীয় সংবাদমাধ্যম তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ পায় না। অন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরাও সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পছন্দ করেন।‌

অভিযোগ, দেশে ‘‌প্রেস ইনফর্মেশন ব্যুরো’ স্বীকৃত সাংবাদিকরা যে-কোনো মন্ত্রণালয়ে অবাধ যাতায়াত করতে পারতেন। এখন তা-‌ও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। আগাম জানাতে হয়, কোন আধিকারিকের সঙ্গে দেখা করতে চান। ফলে, স্বভাবতই সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলছেন আমলারাও। সমূলে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে সাংবাদিককূলের চিরপরিচিত ‘‌সোর্স’।

একাধিক প্রবীণ সাংবাদিক জানিয়েছেন, ‌ মোদির আগে সব প্রধানমন্ত্রী (‌অটলবিহারী বাজপেয়ীও)‌ একজন ‘‌মিডিয়া উপদেষ্টা’ নিয়োগ করতেন। ‌এখন তা-‌ও নেই। সংসদের সেন্ট্রাল হলে, যেখানে সাংবাদিকরা মন্ত্রী ও সাংসদদের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলতেন, সেখানেও একজন নিরাপত্তা আধিকারিক নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁর কাজ হলো, সাংবাদিকদের সঙ্গে কে কে কথা বলছেন, তার তালিকা তৈরি করা। এমতাবস্থায় সরকার যা জানাবে তাই জানতে হবে, সরকার যা চাইবে, তাই সংবাদ হিসেবে পরিবেশন করতে হবে - এমন একটি পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলেছে। আসলে মোদি স্বতন্ত্র সাংবাদিকতকায় বিশ্বাস করেন না।

এই প্রসঙ্গে দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় দিল্লিতে কর্মরত জাতীয় সংবাদপত্রের প্রবীণ সাংবাদিক শরদ গুপ্তা ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‌‘‌প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্ন পছন্দ করেন না, যা সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য মোটেই ভালো নয়। তবে, যে-কোনো বিষয়ে মোটেই মৌন থাকেননি মোদি। তিনি কোথায়, কখন বলবেন সেটা নিজেই বেছে নিয়েছেন।’’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা