kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ আগস্ট ২০২২ । ১ ভাদ্র ১৪২৯ । ১৭ মহররম ১৪৪৪

ফ্যাটি লিভারকে হেলাফেলা করবেন না

ডা. মুহাম্মদ সায়েদুল আরেফিন   

১১ জুন, ২০২২ ১২:৪০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফ্যাটি লিভারকে হেলাফেলা করবেন না

নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটোহেপাটাইটিস বা ‘ন্যাশ’ বর্তমান বিশ্বে এক নীরব মহামারি। এটি ফ্যাটি লিভার ডিজিজের এক জটিল পর্যায়। বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় ১১ কোটির ওপর মানুষ এ রোগে আক্রান্ত এবং ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৫ কোটির ওপর। এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

এই পটভূমিতে ন্যাশ সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং এই রোগ প্রতিরোধের লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ১২ জুন গ্লোবাল লিভার ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক ন্যাশ দিবস পালিত হয়। পরে প্রতিবছর জুন মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক ন্যাশ দিবস পালিত হয়ে আসছে।
 

এনএএফএলডি আর ন্যাশের মধ্যে পার্থক্য কী?

লিভার আমাদের শরীরের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। লিভারে মাত্রাতিরিক্ত চর্বি জমার ফলে ‘ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ হয়। মাত্রাতিরিক্ত মদপান ছাড়াও লিভারে চর্বি জমা হলে সেটিকে ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ বা ‘এনএএফএলডি’ বলে। নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের লিভারের একটি অংশ অতিরিক্ত চর্বি জমার ফলে লিভারে প্রদাহ হয় এবং ধীরে ধীরে লিভার নিজের স্বাভাবিক কার্যক্রম হারিয়ে ফেলে। চর্বি জমার ফলে প্রদাহজনিত লিভারের এই অবস্থাকে ‘নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটোহেপাটাইটিস’ বা ‘ন্যাশ’ বলা হয়। ন্যাশ থেকে পরে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের মতো জটিল ও মারাত্মক অসুখ হতে পারে। নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ২০ শতাংশের ন্যাশ হতে পারে।

 

এনএএফএলডি সঙ্গে অন্যান্য রোগের কোনো সম্পর্ক আছে কি?

♦ ডায়াবেটিস, স্লিপ এপনিয়া বা ঘুমের ভেতর নাক ডাকা এবং হৃদরোগের সঙ্গে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক আছে। যেমন—যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের ফ্যাটি লিভার ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যেমন বেশি থাকে, ঠিক তেমনি ফ্যাটি লিভার ডিজিজে আক্রান্ত রোগীদেরও ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

♦ মনে রাখতে হবে, নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজে আক্রান্ত রোগীদের কিন্তু কার্ডিওভাস্কুলার বা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার বেশি।

অন্যদিকে ন্যাশে আক্রান্ত রোগীরা লিভারের অসুখে মৃত্যুর হার বেশি। তাই ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত রোগীদের লিভারের অসুখবিসুখের পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং প্রতিরোধ করতে হবে।

 

ঝুঁকিসমূহ

♦ অতিরিক্ত শারীরিক ওজন ও স্থূলতা

♦ উচ্চ রক্তচাপ

♦ ডায়াবেটিস

♦ হাইপোথাইরয়েডিজম

♦ হেপাটাইটিস বি ও সি ইনফেকশন

♦ নারীদের ক্ষেত্রে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম।

 

লক্ষণসমূহ ও জটিলতা 

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ন্যাশে আক্রান্ত রোগীদের নির্দিষ্ট কোনো উপসর্গ থাকে না। অন্য রোগের কারণে পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা করতে গিয়ে সাধারণত এ রোগ ধরা পড়ে। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে—

♦ পেটের ডান দিকের উপরিভাগে অস্বস্তি বোধ বা হালকা ব্যথা

♦ অস্বাভাবিক ক্লান্তিবোধ

♦ ক্ষুধামান্দ্য

♦ বমি বমি ভাব

♦ ক্রমশ ওজন হ্রাস।

 

রোগের জটিলতা পর্যায়ে

♦ চোখ হলুদ হওয়া

♦ শরীরে চুলকানি

♦ পেটে ও পায়ে পানি আসা

♦ লিভার ফেইলিওর

♦ লিভার ক্যান্সার হতে পারে।

 

চিকিৎসা

ফ্যাটি লিভার বা ন্যাশে শতভাগ কার্যকরী ওষুধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। যেহেতু ফ্যাটি লিভারের জটিলতা থেকে ন্যাশ হয়, তাই ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধের মাধ্যমে ন্যাশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই মূলত সুষম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনই ন্যাশ প্রতিরোধ করতে পারে। যেহেতু ন্যাশে আক্রান্ত রোগীদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল মাত্রা থাকে, তাই ফ্যাটি লিভার চিকিৎসার পাশাপাশি এসবের চিকিৎসাও গুরুত্বপূর্ণ।

 

করণীয়

♦ অতিরিক্ত ওজন কমাতে হবে ও স্থূলতা পরিহার করতে হবে

♦ ব্যায়াম করতে হবে নিয়মিত

♦ হাঁটার অভ্যাস করতে হবে

♦ অতিরিক্ত চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে

♦ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ

♦ রক্তে কোলেস্টেরেলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ

♦ ফাস্ট ফুড পরিহার করতে হবে

♦ মদপান ও ধূমপান বর্জন করতে হবে।

 

ন্যাশে আক্রান্ত হলে আপনার চিকিৎসককে নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলো করুন

♦ লিভারের সমস্যার অন্য কারণগুলো কি পরীক্ষা করা হয়েছে?

♦ কিভাবে বুঝব লিভারের অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে?

♦ খাবার ও জীবনযাপনের কোন কোন দিক পরিবর্তন করতে হবে?

♦ ফ্যাটি লিভার কি সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যাবে, নাকি এটা সারা জীবনের অসুখ?

♦ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি আছে কি না?

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা



সাতদিনের সেরা