kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

২৫ মে বিশ্ব থাইরয়েড দিবস

থাইরয়েডজনিত সমস্যা ও করণীয়

থাইরয়েডগ্রন্থি থেকে অনেক সময় কম বা বেশি হরমোন বের হয়। এ জন্য শরীরে দেখা দেয় বিভিন্ন সমস্যা। থাইরয়েডজনিত সমস্যা ও করণীয় সম্পর্কে জানাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম

২১ মে, ২০২২ ১১:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



থাইরয়েডজনিত সমস্যা ও করণীয়

বাংলাদেশ হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম দেশ, যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ থাইরয়েডগ্রন্থি ও থাইরয়েড হরমোনজনিত সমস্যা নিয়ে বসবাস করছে। রোগটি প্রধানত নারীদের হয়ে থাকে। থাইরয়েডগ্রন্থি থেকে সাধারণত দুই ধরনের সমস্যা দেখা যায়—গঠনগত ও কার্যগত। গঠনগত সমস্যায় থাইরয়েডগ্রন্থি ফুলে যায়, যেটাকে গয়টার বলা হয়।

বিজ্ঞাপন

কার্যগত সমস্যা দুই রকমের হয়— হাইপারথাইরয়েডিজম ও হাইপোথাইরয়েডিজম। হাইপারথাইরয়েডিজমে থাইরয়েডগ্রন্থি বেশি মাত্রায় সক্রিয় হয়ে পড়ে আর হাইপোথাইরয়েডিজমে থাইরয়েডগ্রন্থি কাজ করে না।

 হাইপোথাইরয়েডিজম

হাইপোথাইরয়েডিজম মূলত তিনটি কারণে দেখা যায়। সদ্যোজাত শিশুদের মধ্যে থাইরয়েডগ্রন্থি তৈরি না হলে কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডিজম দেখা যায়। এ ছাড়া অটোইমিউন হাইপোথাইরয়েডিজম দেখা যায়। থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি সক্রিয় হলে থাইরয়েডগ্রন্থি খারাপ হয়ে যায়। তখন থাইরয়েডগ্রন্থি কাজ করে না। চিকিৎসার কারণেও এই অসুখ হতে পারে। অপারেশনের কারণে থাইরয়েডগ্রন্থি বাদ দিতে হলে বা ‘রে’ দেওয়ার কারণে থাইরয়েড নষ্ট হয়ে গেলে এ সমস্যা হতে পারে।

অ্যান্টিবডি অতিরিক্ত মাত্রায় থাইরয়েডগ্রন্থিকে স্টিমুলেট করলে হাইপারথাইরয়েডিজমের সমস্যা দেখা যায়। চূড়ান্ত পর্যায়ের পর ওষুধের ডোজ বেশি হলে তার থেকে হাইপারথাইরয়েডিজম হতে পারে। থাইরয়েডাইটিসে রক্তে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। ইনফেকশন হলে তাৎক্ষণিকভাবে থাইরয়েডগ্রন্থি ভেঙে হরমোন বেরোতে শুরু করে। ফলে রক্তে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। যেসব অঞ্চলে আয়োডিনের অভাব রয়েছে, সেখানে আয়োডিনের অভাবজনিত কারণে হাইপোথাইরয়েডিজম দেখা যায়।

হাইপারথাইরয়েডিজমে যে লক্ষণগুলো দেখা যায়, সেগুলো হলো— 

খিদে বেড়ে গেলেও ওজন কমতে থাকে, প্রচণ্ড গরম লাগে, বুক ধড়ফড় করে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে পড়ে, পিরিয়ডের সমস্যা হয়, ত্বক কালো হয়ে যায়, হার্টের সমস্যা হতে পারে, রক্তচাপ বেড়ে যায়, হাড়ের ক্ষয় শুরু হয়। বেশি বয়সে অস্টিওপোরোসিস হতে পারে, চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসে, বন্ধ্যাত্ব হতে পারে।

হাইপোথাইরয়েডিজম

হাইপোথাইরয়েডিজমে যে লক্ষণগুলো দেখা যায়, সেগুলো হলো—

ভালো না লাগা, সঙ্গে লেথার্জি ভাব, ত্বক খসখসে হয়ে যায়, পা অল্প ফুলে যায়, খিদে ভাব কমে যায়, চুল পড়তে শুরু করে, ওজন অল্প বেড়ে যায় (৫-৬ কিলো ওজন বাড়তে পারে, স্মৃতিশক্তি কমে যায়, খিটখিটে ভাব কনস্টিপেশনের সমস্যা হয়, রক্তচাপ বাড়তে পারে, বন্ধ্যাত্ব সমস্যা হতে পারে, প্রেগনেন্সির সময় অ্যাবরশন হতে পারে, কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডিজম শিশুর ব্রেনের বিকাশ হয় না, শীত শীত ভাব দেখা যায় এবং ঋতুস্রাবের সমস্যা হতে পারে।

চিকিৎসা

♦  থাইরয়েডের সমস্যা নির্ধারণের জন্য ব্লাড টেস্ট করা হয়।

♦  হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা ওষুধের মাধ্যমে করা হয়। হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসায় ওষুধ দেওয়া হয়। ওষুধে কাজ না করলে তখন সার্জারি বা রেডিওঅ্যাক্টিভ আয়োডিন থেরাপির কথা ভাবা হয়।

♦  গয়টারের সমস্যা হলে ফোলা অংশ ম্যালিগনেন্ট কি না তা নির্ণয় করা হয়। FNAC টেস্ট করা হয়। ম্যালিগনেন্ট নির্ধারিত হলে এবং শুরুর দিকে ধরা পড়লে রেডিওঅ্যাক্টিভ আয়োডিন পদ্ধতির মাধ্যমে থাইরয়েড ক্যান্সার নিরাময় সম্ভব। আয়োডিনের অভাবের কারণে থাইরয়েডের সমস্যা হলে আয়োডাইজড সল্ট খাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

থাইরয়েড ক্যান্সার

থাইরয়েডগ্রন্থির কোনো অংশ টিউমারের মতো ফুলে উঠলে বলা হয় থাইরয়েড নেডিউল। এসব থাইরয়েড নেডিউলের ১ শতাংশ থেকে থাইরয়েড ক্যান্সার হতে পারে। থাইরয়েডগ্রন্থির কোনো অংশের কোষসংখ্যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেলে সেটিকে থাইরয়েড ক্যান্সার বলে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে থাইরয়েডগ্রন্থি বা এর অংশবিশেষ ফুলে ওঠা মানেই কিন্তু ক্যান্সার নয়।

থাইরয়েড ক্যান্সারে যে লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে—

♦ গলার সম্মুখভাগে ফুলে ওঠা। ফোলা অংশটি বেশ শক্ত হয়।

♦  এক বা একাধিক টিউমার হতে পারে। উভয় পাশে টিউমার হতে পারে, আশপাশের লিংক নোডগুলো ফুলে উঠতে পারে।

♦  ওজন কমে যায়। খাওয়ার রুচি কমে যেতে পারে।

♦  গলার স্বর পরিবর্তন হতে পারে। গলার স্বর মোটা বা ফ্যাঁসফেঁসে হতে পারে।

♦  তবে থাইরয়েড নোডিউল বা ক্যান্সার ছাড়াও গলার সামনে ফুলে উঠতে পারে।

♦  শ্বাসনালির ওপর চাপ সৃষ্টির ফলে শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

খেয়াল রাখতে হবে যে বংশগতভাবে থাইরয়েড ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের জন্য অবশ্যই এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট বা হরমোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

থাইরয়েড ক্যান্সার এমন একটি রোগ, যা সময়মতো চিকিৎসা করলে ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ আরোগ্য সম্ভব। তবে অবশ্যই সময়মতো চিকিৎসা করাতে হবে। গলার সামনে ফুলে উঠলে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি একজন এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট বা হরমোন বিশেষজ্ঞ দেখানো উচিত। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবেন এটা কোন ধরনের রোগ।

বিশেষভাবে জানা প্রয়োজন

♦  থাইরয়েড গ্ল্যান্ড মানবশরীরে প্রধান বিপাকীয় হরমোন তৈরিকারী গ্ল্যান্ড।

♦  বাচ্চাদের ক্ষেত্রে হরমোনটি শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

♦  বড়দের ক্ষেত্রে প্রজননে অক্ষমতা, মহিলাদের মাসিকের সমস্যা, পেটের বাচ্চা নষ্ট হওয়াসহ নানা সমস্যা হতে পারে।

♦  গর্ভবতী অবস্থায় মায়ের হাইপোথাইরয়েডিজমের কারণে বাচ্চা বোকা ও বুদ্ধিহীন হতে পারে।

একনজরে

♦  বর্তমানে পৃথিবীর কমপক্ষে ১৫ শতাংশ মানুষ থাইরয়েডের বিভিন্ন রকম রোগে ভুগছেন।

♦  বাংলাদেশের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ (প্রায় ৫ কোটি) মানুষ এসব রোগে আক্রান্ত।

লেখক

সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা