kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

আসুন, ইমিউনিটি বাড়াই

অধ্যাপক ডা. এম আমজাদ হোসেন, চিফ কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগ, ল্যাবএইড হাসপাতাল লিমিটেড, সভাপতি, অর্থোপেডিক অ্যাসোসিয়েশন অব সার্ক কান্ট্রিজ

১২ জুন, ২০২১ ১২:১২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আসুন, ইমিউনিটি বাড়াই

করোনাভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণ রুখতে মাস্ক ব্যবহার, স্যানিটাইজেশন ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো বা ইমিউনিটি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

বলা হচ্ছে, ভ্যাকসিন নিলেও ওই ব্যক্তিটির শরীরে ইমিউনিটি না থাকলে বা না বাড়ালে অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক জটিলতায় পড়তে হতে পারে। অথচ অনেকে জানেনই না কিভাবে দেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।

কেন ইমিউনিটি?
শরীরে ফরেন বডি, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, প্যারাসাইটস ও অন্যান্য ইনফেকশনের সঙ্গে লড়াই করার জন্য ইমিউনিটিরই প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন ধরনের ইমিউনিটি মানুষের দেহের মধ্যে বিদ্যমান। যেমন শৈশব থেকেই কারোর শরীরে ইমিউনিটি তৈরি হতে পারে। আবার ভ্যাকসিনের মাধ্যমেও ইমিউনিটি আসতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেও ইমিউনিটি তৈরি হয়। কিন্তু যাদের ইমিউনিটি কম তাদের ক্ষেত্রেই ইমিউনিটি বাড়ানোর প্রসঙ্গটি আসে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো বা ইমিউনিটি বজায় রাখা যায় বিভিন্ন উপায়ে।

সুষম খাবারদাবার
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে পুষ্টিকর খাবারদাবার। এ রকম কিছু খাবার—

♦ মাছ-মাংস-ডিম, দুধ, দই, ছানা ইত্যাদি প্রাণিজ প্রোটিনের পাশাপাশি খাওয়া যেতে পারে ডাল, মটর, ছোলা, কাবলিচানা, সয়াবিনের মতো উদ্ভিজ্জ প্রোটিন।

♦ সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষমতা বাড়ায় শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এ জন্য প্রতিদিন খেতে পারেন ওয়ালনাট, আমন্ড, কাজুবাদামসহ বিভিন্ন রকমের বাদাম। এসবে যথেষ্ট পরিমাণ আয়রন, প্রোটিন ইত্যাদি থাকে, যা ইমিউনিটি বাড়াতে সাহায্য করে।

♦ নিয়মিত পান করুন নানা রকমের চা, যেমন আদা চা, তেজপাতা চা, এলাচি ও গোলমরিচ দেওয়া চা, হলুদ চা, সবুজ চা; যা শরীর সতেজ রাখে। হারবাল চায়ের মধ্যে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে; যা গোটা ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে।

♦ ডায়েটে নিয়মিত রাখতে পারেন কাঁচা হলুদ, মধু ও দুধ। ইমিউনিটি বাড়ানোর সঙ্গে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল হিসেবেও এগুলো কাজ করে। এ ছাড়া স্ট্রেস মুক্তিতেও এর জুড়ি মেলা ভার।

♦ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন ‘সি’র জুড়ি নেই। তাই আমলকী, লেবু, পেয়ারা, পেঁপে, কমলালেবু, মুসম্বি, লিচু, আনারস ইত্যাদি ফল নিয়মিত খান। এসব ফল সংক্রমণ ঠেকাতেও দারুণ কাজে দেয় অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে।

♦ শরীরের মধ্যে থাকা বিভিন্ন ক্ষতিকারক ভাইরাসকে আটকাতে এবং নষ্ট করতে সাহায্য করে রসুন। নিয়মিত কাঁচা রসুন খাওয়ার মাধ্যমে খুব সহজেই বাড়াতে পারেন ইমিউনিটি। রোজ খাওয়ার সময় এক থেকে দুই কোয়া রসুন খেতে পারেন।

♦ বেশি চিনি বা লবণ মেশানো খাবার খাবেন না। প্রসেসড খাবার, জাংক ফুড ও তেলে ভাজা খাবার এড়িয়ে চলুন।

♦ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করা উচিত। বিভিন্ন ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া মূত্রের মাধ্যমে শরীর থেকে নির্গত হয়। ডিটক্স ওয়াটার পান করার মাধ্যমেও শরীরের বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ দূর করা যায়।

খাবারদাবার ছাড়াও আরো কিছু নিয়ম মানলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো যায় বা ইমিউনিটি বজায় রাখা যায়। যেমন—

ভাল ঘুম চাই
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন। এক্সপেরিমেন্টাল জার্নালে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, রাতের ঘুম শরীরের অত্যাবশ্যকীয় টি সেল বা কোষের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে ও সংক্রমণের সেলগুলোকেও মেরে ফেলে এই টি সেল। যখন আমরা ঘুমাই তখন অ্যাড্রিনালিন ও প্রস্টাগল্যান্ডিন হরমোন শরীরে কম ক্ষরণ হয়, যা টি সেলকে নিজের কাজ করতে সাহায্য করে। গবেষণায় এটাও পাওয়া গেছে, যাদের ঘুম ভালো হয় তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি।

একজন সুস্থ মানুষের কমপক্ষে ছয় থেকে আট ঘণ্টা ঘুম জরুরি। যাঁরা ছয় ঘণ্টার কম ঘুমান তাঁদের শরীর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে লেটনাইট ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

নিয়মিত ব্যায়াম করুন
গবেষণা বলছে, যাঁরা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন তাঁদের দেহে টি সেল বেশি উৎপাদিত হয়। আর এই সেল উৎপাদনের ফলে বাড়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। তাই সম্ভব হলে প্রয়োজনীয় ব্যায়ামগুলো সবার করা উচিত। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিটের ব্যায়াম ইমিউন সিস্টেম বুস্ট করে। তবে যাঁদের রোগ রয়েছে তাঁরা ব্যায়াম করুন হিসাব করে।

কায়িক পরিশ্রম করুন
শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে শারীরিক পরিশ্রমের সম্পর্ক আছে। একজন মানুষ যখন শারীরিক পরিশ্রম করে, তখন শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাজ করে। শরীরের মাংসপেশি ও হৃদযন্ত্র অনেক কার্যকরি হয়। একই সঙ্গে শরীরের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। ফলে শরীরের দূরতম প্রান্ত পর্যন্ত অক্সিজেন পৌঁছবে। তখন শরীরের কোষগুলোতে শক্তি উৎপাদন শুরু হবে।

দুশ্চিন্তা একদম নয়
অতিরিক্ত স্ট্রেস বা দুশ্চিন্তা শরীরের ইমিউনিটি কমায়। কারোর ঘুম যদি ঠিক হয়, তিনি যদি স্বাস্থ্যকর খাবার খান, তার পরও স্ট্রেস খলনায়কের ভূমিকা পালন করতে পারে। স্ট্রেসের ফলে দেহ কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ করে। দেহে এই হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তাই এই করোনা মহামারির সময় দুশ্চিন্তা বা টেনশন পরিহার করে সব সময় হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করুন।

নয় মদ্যপান, নয় ধূমপান
মদ্যপান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়। তাই মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন। পাশাপাশি ছেড়ে দিন ধূমপান। কেননা করোনাভাইরাস ফুসফুসে আক্রমণ করে। ধূমপানও আমাদের হার্ট ও ফুসফুসের ব্যাপক ক্ষতি করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

ভিটামিন ‘ডি’
ভিটামিন ‘ডি’ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, এটা হয়তো অনেকে জানেন না। যেকোনো রোগের সংক্রমণের হাত থেকে মানবদেহ রক্ষা করে এই ভিটামিন। শরীরে ভিটামিন ‘ডি’ কম থাকলে বিভিন্ন ক্রনিক রোগ যেমন টাইপ ১ ডায়াবেটিস, হার্ট, কিডনি, হাড়ের অসুখ, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, বিভিন্ন নিউরো সমস্যা, আলঝেইমারস ইত্যাদি হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে কভিড-১৯ মোকাবেলায়ও শরীরে ঠিকমতো ভিটামিন ‘ডি’ থাকা জরুরি।

ভিটামিন ‘ডি’র প্রাকৃতিক উৎস সূর্যের আলো। প্রতিদিন সম্ভব হলে ১৫-২০ মিনিট সূর্যের আলোয় থাকার চেষ্টা করুন বা দেহে রোদ লাগান। এর মাত্রা ঠিক আছে কি না তা পরীক্ষা করে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করুন।

অনুলিখন : আতাউর রহমান কাবুল



সাতদিনের সেরা