kalerkantho

রবিবার। ৫ বৈশাখ ১৪২৮। ১৮ এপ্রিল ২০২১। ৫ রমজান ১৪৪২

করোনার টিকায় কি রক্ত জমাট বাঁধে?

ড. রেজাউল করিম, ইমিউনোলজিস্ট, ড্রাগ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি এফেয়ারস নেদারল্যান্ডস

২০ মার্চ, ২০২১ ১০:৪১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনার টিকায় কি রক্ত জমাট বাঁধে?

এক বছরের বেশি সময় ধরে করোনার কারণে বিশ্ব স্থবির হয়ে আছে। এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১২০ কোটি মানুষ নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত হয়েছে এবং ২৬ লাখের বেশি মানুষ মারা গেছে কভিডের কারণে। এই অস্বাভাবিক ও অজানা অবস্থা মোকাবেলা করার আগের কোনো অভিজ্ঞতা বিশ্বের নেই। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পন্থার মধ্যে ভ্যাকসিনেশনকে অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়। একটি নতুন টিকা বাজারে আসতে ৫ থেকে ১০ বছর সময় প্রয়োজন। কিন্তু বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রচেষ্টার কারণে আশাতীতভাবে এক বছরের মধ্যে চারটি ভ্যাকসিন জরুরি ভিত্তিতে অনুমোদন পেয়েছে। এত অল্প সময়ে বাজারে আসার কারণে যেকোনো সময়ের চেয়ে টিকার কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত উৎকণ্ঠা থাকা স্বাভাবিক এবং তা এথিকসেরই অংশ।

সম্প্রতি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার সন্দেহজনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। নরওয়ে সর্বপ্রথম রক্ত জমাট বাঁধার (thromboembolic event) কয়েকটি সন্দেহজনক কেসের ওপর ভিত্তি করে টিকাদান কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে। এরপর ইতালি, আইসল্যান্ড, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, নেদারল্যান্ডস, থাইলান্ডসহ আরো কয়েকটি দেশ সাময়িকভাবে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে।

রক্ত জমাট বাঁধা কি টিকার কারণে?
রক্ত জমাট বাঁধা বিশ্বব্যাপী একটি স্বাভাবিক ঘটনা। আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) তথ্যানুযায়ী শুধু আমেরিকায় প্রতি এক হাজারে এক বা দুজনে রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনা ধরা পড়ে এবং প্রতিবছর ৬০ হাজার থেকে এক লাখ মানুষ (মূলত বয়স্ক) মারা যায় এই রক্ত জমাটা বাঁধার কারণে।

ইউরোপে এ পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ মানুষ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিয়েছে। এর মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনার পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় বৃদ্ধি পায়নি। ৮ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ইউরোপে মোট ৩৭টি রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনা ঘটেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই ৩৭টি ঘটনা স্বাভাবিকের চেয়েও কম। আরেকটি বিষয় হচ্ছে যে ফাইজার-বায়োনটেক ও মডার্নার টিকার ক্ষেত্রে মোটামুটি একই হারে রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনা ঘটেছে।

ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সিগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এখন পর্যন্ত টিকার সঙ্গে রক্ত জমাট বাঁধার কোনো সম্পর্ক মেলেনি। বহুল ব্যবহৃত যেকোনো ওষুধ (যেমন—প্যারাসিটামল, অ্যান্টাসিড) শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত নয়। সেভাবে ভ্যাকসিনেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিছুটা থাকবে, তা স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য। করোনায় সারা বিশ্বে প্রতিদিন আট হাজার থেকে ১০ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। সেই অনুপাতে টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত কেউ মারা যায়নি। ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুযায়ী সারা বিশ্বে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৮ কোটি কভিডের টিকা দেওয়া হয়েছে।

মোট কথা রক্ত জমাট বাঁধার বিষয়টি এখন পর্যন্ত টিকার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়। একে একটি সাধারণ ঘটনা মনে করছে ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সিগুলো।

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা কতটুকু নিরাপদ?
অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় ওষুধ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু টিকা দেওয়া হয় সুস্থ মানুষকে। তাই টিকার নিরাপত্তার ইস্যুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ড্রাগ রেগুলেটরি বডিগুলো এই বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকে। ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সির ফার্মাকো-ভিজিলেন্স রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট কমিটির (PRAC) তথ্যানুযায়ী রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনা স্বাভাবিক হারের চেয়ে বেশি নয়। সে কারণে এখন পর্যন্ত তারা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাকে নিরাপদ মনে করছে। সবচেয়ে বড় কথা—বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, এই টিকা থেকে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার সত্যতা সম্পর্কে কোনো প্রমাণ নেই। তাই কোনো দেশেই এই টিকা দেওয়া বন্ধ করা উচিত নয়।

টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মনিটরিং বডি নিবিড়ভাবে যে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে তা সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই ধরনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ নিশ্চিত করে, কভিড ভ্যাকসিন এখন পর্যন্ত নিরাপদ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা