kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

পিরিয়ডের কঠিন দিনগুলোর সহজীকরণে সহায়ক ফাংশনাল ফুড

অনলাইন ডেস্ক   

২২ নভেম্বর, ২০২০ ১৬:৫৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পিরিয়ডের কঠিন দিনগুলোর সহজীকরণে সহায়ক ফাংশনাল ফুড

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে সামাজিক গোঁড়ামি এবং দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতার কারণে নারীদের পিরিয়ড বা ঋতুস্রাবের বিষয়টি গোপনীয় করে রাখা হয়। অথচ বয়সপ্রাপ্তিতে প্রতিটি সুস্থ নারীর শরীরেই কিছু পরিবর্তন আসে, যার অন্যতম কারণ হলো তাদের ঋতুবতী হয়ে ওঠা। পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব, যেটিকে অনেকে ‘মাসিক’ বলেও জানেন। মূলত একটি স্বাভাবিক ও সাধারণ প্রক্রিয়া, যার নৈমিত্তিক চক্র নারীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সাধারণত ৯ বছর থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যেই একজন নারীর পিরিয়ড শুরু হয়ে থাকে। এটি ৪৪ থেকে ৫৫ বছর বয়স পর্যন্ত চলতে পারে। তবে বিভিন্ন কারণের ওপর ভিত্তি করে উল্লেখিত বয়স সীমার আগে বা পরেও পিরিয়ড শুরু এবং শেষ হতে পারে।

আমাদের দেশে কিছু প্রথাগত মানসিকতার কারণে পিরিয়ড সংক্রান্ত আলোচনা শুধুমাত্র নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এই অতি সাধারণ প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে নারী ও পুরুষ উভয়েরই সমানভাবে জানার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পিরিয়ড চলাকালে বিভিন্ন নারী বিভিন্ন রকম উপসর্গের মধ্য দিয়ে যান। এ সময়ে শারীরিক ও মানসিক স্থিতিতে ঘনঘন পরিবর্তন আসা একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। পিরিয়ডকালে একজন নারীর সঠিক পরিচর্যার জন্য তাই তার আশেপাশের ঘনিষ্ঠজনের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। অনেক নারীর স্বামী, বাবা বা পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্য পিরিয়ড প্রসঙ্গে অজ্ঞ বা লজ্জিত থাকার কারণে নারীরা এ সময়ে পর্যাপ্ত সহযোগিতা, পুষ্টিকর খাবার বা স্যানিটারি ন্যাপকিনের মতো জরুরি অনুসঙ্গ থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েন। বাংলাদেশের অনুন্নত সমাজে অসংখ্য নারী পুরোনো, ময়লা কাপড় দিয়ে পিরিয়ড ব্যবস্থাপনার কারণে হরহামেশাই কঠিন রোগাক্রান্ত হন। এছাড়াও, স্বাস্থ্যের সঠিক যত্ন না নেওয়া এবং সচেতনতার অভাবে বহু কিশোরী ও তরুণী পিরিয়ডকালে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়। 

পিরিয়ড সংক্রান্ত যে সাধারণ সমস্যাগুলো রয়েছে সে প্রসঙ্গে জানতে হলে প্রাথমিকভাবে জানতে হবে প্রি-মিনস্ট্রুয়াল সিন্ড্রোম বা পিএমএস কী এবং কেনো হয়। প্রায় ৯০ শতাংশ নারীই প্রতিমাসে তাদের পিরিয়ডের আগে পিএমএস-জনিত সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। পিএমএসের কারণে মাথাব্যথা, মন খারাপ বা বিষণ্ণতা, খিটখিটে মেজাজ, ক্লান্তি, কাজে অমনোযোগ, খাবারে অরুচি থেকে আরম্ভ করে পেটে ব্যথা বা বদহজম, হাত-পা জ্বলুনিসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। সময়মতো পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজনে বিশেষ ধরনের ফাংশনাল ফুড গ্রহণের মাধ্যমে পিএমএস থেকে সৃষ্ট সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব।
তবে, দু’টি ক্ষেত্রে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি হয়ে উঠতে পারে। এগুলো হলো – ১. সেকেন্ডারি ডিসমেনোরিয়া এবং ২. অ্যামেনোরিয়া। পিরিয়ড চলাকালীন জরায়ুর সংকোচনের তীব্রতা থেকে অধিকাংশ নারীরই তলপেটে, কোমরে বা পিঠে ব্যথা অনুভূত হয়ে থাকে। এই ব্যথা অতিমাত্রায় বেড়ে গিয়ে যদি স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করতে আরম্ভ করে, তবে তা ডিসমেনোরিয়ার লক্ষণ বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। সাধারণ অবস্থায় এটিকে ‘প্রাইমারি ডিসমেনোরিয়া’ বলা হয়। জরায়ুর গঠনগত ত্রুটি থেকে এই ব্যথা আরো জটিলতর হয়ে উঠলে তা ‘সেকেন্ডারি ডিসমেনোরিয়া’র দিকে যেতে পারে। মেনস্ট্রুয়াল হেলথ সংক্রান্ত আরেকটি সমস্যা অ্যামোনোরিয়া, যা খুব সীমিত নারীর মাঝে দেখা যায়। ১৫ বছর বয়সের মধ্যে পিরিয়ড আরম্ভ না হলে কিংবা একটানা তিন মাস বা এর বেশি সময় ধরে পিরিয়ড বন্ধ থাকলে তা অ্যামেনোরিয়ার লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। পিরিয়ড সংক্রান্ত যেকোনো জটিলতা দেখা দিলে সংকোচ না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

বিশ্বের আধুনিক সমাজগুলোতে পিরিয়ডকে নারীদের কোনো দূর্বলতা নয়, বরং একটি বিশেষত্ব বলেই গণ্য করা হয়। তাই, এই বিশেষত্বকে নির্ভয়ে স্বীকার করার ও এ বিষয়ে মন খুলে কথা বলার ব্যাপারে প্রতিনিয়ত নারীদেরকে উৎসাহিত করা হয়ে থাকে। পিরিয়ডকালে নারীদের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করার প্রশ্নে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন জনপ্রিয়তা লাভ করছে ‘ফাংশনাল ফুড’।

ফাংশনাল ফুড হতে গেলে তাতে বায়ো-অ্যাক্টিভ উপাদান থাকতেই হবে। ফাংশনাল ফুড বিশেষ ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যায় বায়ো-কেমিক্যাল প্রসেসের ওপর ভূমিকা রেখে স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে সহায়ক ভূমিকা রাখে। বায়ো-অ্যাক্টিভ উপাদান নন-টক্সিক হতে হবে। ফাংশনাল ফুড যে নিরাপদ ও কার্যকর তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকতে হবে। ফাংশনাল ফুডের কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে না। উল্লেখ্য যে, খাদ্য হিসেবে পৃথিবীর কোনো না কোনো দেশে  প্রচলন থাকলে সেটা ফাংশনাল ফুড হিসেবে বিবেচিত হবে। 

ফাংশনাল ফুড ১৯৯১ সালে ফুড উইথ স্পেসিফাইড হেলথ ইউজ (এফওএসএইচইউ) হিসেবে জাপানে প্রথম স্বীকৃতি পায়। ২০১৫ সালে এটি ফুড উইথ ফাংশন ক্লেইমস (এফএফসি) হিসেবে নতুন ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০০৬ সালে ভারতের পার্লামেন্টে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড  সংক্রান্ত যে আইন পাস হয় তার অধীনে ফাংশনাল ফুড ও এ জাতীয় খাদ্যপণ্যের জন্য ২০১৬ সালে ভারতে ‘দ্য ফুড সেফটি স্ট্যান্ডার্ড রেগুলেশন্স’ পাস হয়। এটি ২০১৮ সাল থেকে কার্যকর হয়। বাংলাদেশেও ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদ কর্তৃক ‘সেইফ ফুড অ্যাক্ট ২০১৩’ পাশ করা হয়েছে, যার ৩১ নং ধারায় ফাংশনাল ফুড অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ধীরে ধীরে দেশের অভ্যন্তরে এর ব্যাপারে ধারণা ও আগ্রহ বাড়ছে। বাণিজ্যিক প্রসার থেকেও ফাংশনাল ফুডের জনপ্রিয়তার দিকটি লক্ষ্য করা যায়। ২০১৫ সালে ফাংশনাল ফুডের বিশ্ব বাজার ছিল ১২৯.৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ। যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ অনুসারে, ২০১৮ সালে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে ফাংশনাল ফুড মার্কেট রেভিনিউ ছিল ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি, যা ২০২৪ সাল নাগাদ ১০০ বিলিয়নের কাছাকাছি যাবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। যদিও, খুব বেশি দিন হয়নি আমাদের দেশে ফাংশনাল ফুড নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে, তবে আশার ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশের ফাংশনাল ফুড নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতা তৈরিতে অনেকদিন ধরেই সচেষ্ট অর্গানিক নিউট্রিশন লিমিটেড (ওএনএল)। এর বাইরে দেশের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের প্রাসঙ্গিক পাঠ্যক্রমে ফাংশনাল ফুডকে যুক্ত করার কথা ভাবছে।  

পিরিয়ড চলাকালীন স্বাস্থ্যগত দুর্বলতা কিংবা মানসিক অবসাদ থেকে পরিত্রাণ পেতে বিশেষজ্ঞগণ পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এর পাশাপাশি ফাংশনাল ফুড হয়ে উঠতে পারে যেকোনো নারীর বিশেষ সমস্যার জন্য অনন্য এক সমাধান। ফাংশনাল ফুড দেহকে রাখে সতেজ। এটি মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করে। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা