kalerkantho

বই-খাতা, স্কুল-কলেজ ফালতু! শেখো দেখে দেখে...

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২০:২৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বই-খাতা, স্কুল-কলেজ ফালতু! শেখো দেখে দেখে...

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া শহরে স্বপ্নের জীবন যাপন করছিলেন সারা ও জার্মাইন গ্রিগস। বাড়ি, গাড়ি, সফল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সুখী ও স্বচ্ছল দাম্পত্য জীবন; সবই ছিলো। আর ছিলো ফুটফুটে তিন সন্তান। তবু যেন ভর করেছিল শূন্যতা। প্রায়ই মনে হতো কী যেন একটা নেই। সব সময় এই বিষয়টিই তাড়া দিত তাদের। এই তাড়নাকে সাড়া দিতেই ঘর ও সাজানো জীবন ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন ক্যালিফোর্নিয়া এই দম্পতি।

তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য পৃথিবীকে ঘুরে দেখতে হবে। সন্তানদের পৌঁছে দিতে হবে বিশ্ব জোড়া পাঠশালায়। পরিচিত করতে হবে নানা রকমের সংস্কৃতি, অ্যাডভেঞ্চার, জীবনযাত্রার সঙ্গে। তাই সুখের ঘরে তালা দিয়ে, বিশ্বের দরবারে আরো বড় আনন্দের চাবিকাঠি খুঁজতে তিন সন্তানকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন এই দম্পতি। ঠিক করেছেন, সারা জীবনই ঘুরবেন পৃথিবীর নানা দেশে। পুঁথিগত পড়াশোনাটুকু নিজেরাই করাবেন বাচ্চাদের। বাকি শিক্ষা দেবে প্রকৃতি, পর্যটন আর পৃথিবী।

বেরিয়ে পড়ার পরে কেটে গিয়েছে বছর দুই। মিশর, ভারত, থাইল্যান্ড, ইউনাইটেড আরব এমিরেটস, হাওয়াই, নিউজিল্যান্ড, পর্তুগালসহ মোট ১৬টি দেশ এরই মধ্যে ঘুরে ফেলেছেন তারা। আহরণ করেছেন জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোকে। সঞ্চয় করেছেন সুন্দরতম স্মৃতি। এ সবের মধ্যেই বড় হয়ে উঠেছে তিন তিনটি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে।

এই বিষয়ে জার্মাইন বলেন, এটা একটা বোধ। একটা ধাক্কা। আমাদের মনে হয়েছিল, এটাই আমাদের জীবনের সব চেয়ে সেরা সময়, যা আমরা পাঁচ জন একসঙ্গে কাটানোর সুযোগ পাচ্ছি। তাই এই সময়টা যদি আমরা সমাজের ঠিক করে দেওয়া খাঁচায় বন্দি থেকে বাঁচি, তা হলে আমরা নিজেদের মতো বাঁচব কবে! তিনি আরো বলেন, সারা পৃথিবী ঘুরে দেখার ইচ্ছে আমাদের দু’জনেরই ছিলো। কিন্তু তিন-তিনটে ছোট-ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে এভাবে ঘোরা অসম্ভব মনে হতো। আমরা সব সময় ভাবতাম, সময় এলেই বেরোব। কিন্তু ঠিক সময় কখন আসে? কখনোই না। সময় আসে না, নিজেকে সময়ের কাছে নিয়ে যেতে হয়। তাই আমরা ঠিক করলাম, বেরিয়ে পড়ব। আমাদের বাড়ি বিক্রি করে দিলাম। বাচ্চাদের স্কুলে জানিয়ে দিলাম, ওরা আর আসবে না। পরে গুছিয়ে নিতে শুরু করলাম সব কিছু।

গণমাধ্যমকে সারা বলেন, আমাদের বাচ্চারা বাড়িতেই পড়াশোনা করে। বা বলা ভালো, পৃথিবী জুড়ে পড়াশোনা করে তারা। এটাই ওদের ‘ওয়ার্ল্ড স্কুল’। আমি আর জার্মাইন দু’জনেই বিশ্বাস করি, শেখার জন্য পৃথিবীর চেয়ে ভালো স্কুল আর হয় না। এর মানে অবশ্য এই নয়, যে ওরা আর কখনো প্রথাগত স্কুলে ফিরতে পারবে না। কিন্তু এখন ওরা বিশ্বমানের পড়াশোনাই করছে, কিন্তু সেটা নির্দিষ্ট কোনো স্কুলে নয়। খানিক আমাদের কাছে, খানিক অনলাইনে। ওরা অনেক কিছু শিখছে। অভিজ্ঞতার কথা ছেড়ে দিলাম।

এভাবে পৃথিবী জুড়ে ঘুরে বেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে গিয়ে জার্মাইন এবং সারা দু’জনেই খুশি। তারা জানান, প্রতিটি দেশ কীভাবে আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতা উপহার দিচ্ছে। কোথাও দু’সপ্তাহ, কোথাও বা দু’দিন। দিব্যি সংসার পাতছেন তারা। হলই বা অস্থায়ী, হলই বা সংক্ষিপ্ত। গভীরতা বা বিস্তারের দিক থেকে এ সংসার ছুঁয়ে ফেলে বিশ্ব-সংসারের ধারণাকে।

অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে জার্মাইন বলেন, এই ভাবেই প্রতিটা দেশে, প্রতিটা নতুন খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, সংস্কৃতি,আবহাওয়ার সঙ্গে আমরা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে ওঠছি। আমরা ঘরের মতোই আরাম খুঁজে পাচ্ছি ঘরের বাইরেও। যেমন একটা উদাহরণ দিই, অনেকেই আমাদের বলেছিল, ভারতে গিয়ে হয়তো আমাদের বাচ্চাদের অসুবিধা হবে। ওখানে খুব গরম, খাবারদাবারও অনেক বেশি মশলাদার। কিন্তু আমরা চেয়েছিলাম তাজমহল দেখতে। তাই শুধু তাজমহলকে কেন্দ্র করে ছোট একটা ট্রিপ করেছি ভারতে। কিন্তু নিজেরা ওইটুকু ঘুরে দেখার পরে বুঝতে পারলাম, আমাদের আরো এক বার ভারতে আসতে হবে অনেক বেশি দিনের জন্য।

ভ্রমণপ্রেমী অভিভাবকদের উদ্দেশে জার্মাইন বলেন, ঘরের বাইরে বেরিয়ে যে শিক্ষা হয়, বাচ্চারা তা কখনোই নিজের ঘরে নিজের স্কুলে পেতে পারবে না। ট্র্যাভেল করলে তাদের চেতনা ও বোধের বিকাশ অনেক বেশি গভীর হয়। তাদের দুনিয়াটা অনেক বড় হয়, দৃষ্টিভঙ্গি উদার হয়। পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা একমাত্র বাইরের জগতই দিতে পারে। ঘরের দেওয়াল নয়। সারা দুনিয়া জুড়ে নতুন বন্ধু করছে আমাদের ছেলেমেয়েরা। ভাঙছে ভাষার দেওয়াল। হাসি, কান্না, মজার কোনো আলাদা ভাষা হয় না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা