kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

বিশেষজ্ঞ মত

এডিস মশার লার্ভা ধুয়ে গেলেও ঝুঁকি ডিম থেকে

ড. মো. মাহবুবর রহমান

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৫ আগস্ট, ২০১৯ ০৮:৩১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এডিস মশার লার্ভা ধুয়ে গেলেও ঝুঁকি ডিম থেকে

ডেঙ্গুসহ আরো কয়েকটি রোগের ভাইরাস বাহক এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পানিতে বাস করে আর ডিম ও পূর্ণাঙ্গ মশা শুকনো জায়গায় বিচরণ বা বাস করে।

কনটেইনারে প্রজননকারী (কনটেইনার ব্রিডিং) এবং কনটেইনার পরিবহনের মাধ্যমে বিস্তারকারী একটি মশা এডিস। এই মশা বসতবাড়ি অথবা বিভিন্ন স্থাপনার কাছাকাছি কৃত্রিম কনটেইনার যেমন টায়ার, ক্যান, ড্রাম, ফুলের টব বা অনুরূপ পাত্র এবং প্রাকৃতিক পাত্র যেমন কাটা ডাবের খোলস, ছোট লেক, নার্সারির টব ইত্যাদিতে প্রজনন ঘটায়। পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী এডিস ফার্টিলাইজড (নিষিক্ত) হলে প্রজননের জন্য ওই সব পাত্রের নিচের অংশে পানি থাকলে এবং পাত্রের ওপরের খালি অংশ শুকনো থাকলে পাত্রের সেই খালি অংশের ভেতরের গায়ে এক মিলিমিটার লম্বা সিগার আকৃতির একটি করে ১০০ থেকে ২০০ ডিম পাড়ে। প্রাথমিক অবস্থায় ডিমের রং সাদা এবং ক্রমান্বয়ে তা কালো হতে থাকে। দু-এক দিনের মধ্যে উজ্জ্বল কালো হয়। আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়ায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এবং ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় পাঁচ দিনের মধ্যে ভ্রূণের পূর্ণতা ঘটে এবং ডিম পানির সংস্পর্শে এলেই এক থেকে দুই দিনের মধ্যে লার্ভায় (রিগলার) পরিণত হয় এবং পানিতে সাঁতরাতে থাকে। যদি কোনো কারণে ভ্রূণ-পূর্ণতাপ্রাপ্ত ডিম পানির সংস্পর্শে না আসতে পারে এবং শুকিয়ে যায় সে অবস্থায়ও এক বছর পর্যন্ত জীবন্ত থাকে। পানি পেলেই ফুটে লার্ভায় পরিণত হয় এবং লার্ভা পানিতে সাঁতরায়। লার্ভার চারটি পর্যায় আছে—প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায় দ্রুত খোলস বদলিয়ে বড় হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় দুর্বল প্রকৃতির, এরা কিছু শুকনো আবহাওয়ায়ই মারা যায় কিন্তু অতি বৃষ্টিপাত বা বৃষ্টির পানিতে বন্যা হলে এরা সম্পূর্ণ মারা যায়। কিন্তু চতুর্থ পর্যায় ধীরে খোলস বদলায়, বাড়তে কিছু বেশি সময় নেয় এবং ভারি বৃষ্টিপাত সহিষ্ণু, কম মরে। লার্ভা উপযুক্ত আবহাওয়ায় (আর্দ্র এবং উষ্ণ) সাধারণত পাঁচ দিনে এবং শুকনো ও ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় সর্বোচ্চ সাত থেকে ১৪ দিনে পিউপা বা পুত্তলিতে পরিণত হয়। পুত্তলি দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ পোকায় পরিণত হয়। স্ত্রী ও পুরুষ পূর্ণাঙ্গ পোকা পুত্তলি থেকে বের হওয়ার এক দিন পরই মিলন ঘটায় এবং ডিম পাড়তে পারে। তবে পূর্ণাঙ্গ মশা বেশি দূরে ওড়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে না। গ্রাভিড (ফার্টিলাইজড) স্ত্রী মশা এক থেকে সর্বোচ্চ তিন কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত ওড়ে, পুরুষ মশা বেশি দূর উড়তে পারে না। এরা কনটেইনারের ডিম ও লার্ভা পরিবহনের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পূর্ণাঙ্গ পুরুষ ও স্ত্রী মশা উড়ন্ত অবস্থায় মিলন ঘটায় এবং ফার্টিলাইজেশন সম্পন্ন করে এবং নিষিক্ত স্ত্রী এ সময় মানুষের শরীরে কামড় দিয়ে রক্তখাদ্য নেয়। তখন যদি মানুষটি ডেঙ্গু রুগী হয় তাহলে তার শরীর থেকে ডেঙ্গুর জীবাণু নেয় এবং সুস্থ মানুষকে কামড়ে রোগ ছড়ায়। পরে উপযুক্ত পাত্র খুঁজে পেলে সেখানে ডিম পাড়ে। ডিমগুলো প্রথমে সাদা এবং ক্রমান্বয়ে উজ্জ্বল কালো রং ধারণ করে। পানির সংস্পর্শে এলেই লার্ভায় পরিণত হয় এবং পানিতে ভাসতে থাকে। চারটি পর্যায় শেষে পুত্তলি হয়। অন্য পোকার পুত্তলি নিষ্ক্রিয় থাকে কিন্তু এই পুত্তলিরা সক্রিয় এবং পানিতে সাঁতরাতে থাকে। দুই-তিন দিনের মধ্যে পূর্ণ পোকায় পরিণত হয়। দশ থেকে সর্বোচ্চ ২১ দিনের মধ্যে এদের জীবনচক্র সম্পন্ন হয়।

দীর্ঘ সময় ধরে ভারি বৃষ্টিপাত হলে বাসাবাড়ির কাছাকাছি জায়গার প্রাকৃতিক কনটেইনারের পানির লার্ভা ও পুত্তলিগুলো ভেসে যাওয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। পূর্ণাঙ্গ পুরুষ ও স্ত্রী পোকা উড়ন্ত অবস্থায় মিলন ঘটাতে এবং ফার্টিলাইজেশন সম্পন্ন করতে অথবা নিষিক্ত স্ত্রী পোকা ডিম পাড়তে চরম অসুবিধায় পড়ে। ফলে প্রাকৃতিক কনটেইনারের প্রজনন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এ অবস্থায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে বাসাবাড়ির মশা সম্পূর্ণ কমাতে পারলে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটা কমবে। বৃষ্টিপাত দীর্ঘমেয়াদি না হলে প্রয়োজনীয় পরিশুদ্ধ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। বাসাবাড়িতে মশারি ছাড়া ঘুমানো সর্বদাই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সকালে ও সন্ধ্যার আগে এরা বেশি সক্রিয় থাকে এবং কামড়ায়, তাই মশারি ছাড়া ঘুমানো ঠিক নয়।

অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান : কীটতত্ত্ববিদ ও সাবেক ভিসি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা