kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহিতার অস্পষ্টতা : প্রেক্ষিত ডেঙ্গু

সুমনা গুপ্তা   

৪ আগস্ট, ২০১৯ ১৬:২৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহিতার অস্পষ্টতা : প্রেক্ষিত ডেঙ্গু

মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের পরেই আসে স্বাস্থ্যসেবা। একটি সভ্য দেশের নাগরিকরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই সুবিধাগুলো পেয়ে থাকেন। স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া তাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান কাজ। কিন্তু বর্তমানে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে যে মহাটেনশন কাজ করছে সেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে প্রতিটি সচেতন মানুষের মনে।

এক
প্রথমেই আসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের করুণ মৃত্যু ও এ দেশের স্বাস্থ্যসেবার জবাবদিহিতা নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফিরোজ কবির ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছিল স্কয়ার হাসপাতাল নামক স্বনামধন্য একটি হাসপাতালে। ভর্তির ২২ ঘণ্টার মধ্যে ছেলেটির মৃত্যু হয় এবং তার বিল আসে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৭৪ টাকা! মাত্র ২২ ঘণ্টায় ব্যবধানে ডেঙ্গুর চিকিৎসা বাবদ এত টাকার বিল কিভাবে আসে তা প্রতিটি মানুষকে একবার হলেও ভাবতে বাধ্য করবে। কিভাবে এত টাকার বিল হলো আর যেখানে ওষুধ বাবদই খরচ হয়েছে ৩২ হাজার ৩২১ টাকা। এত কম সময়ে ঠিক এত টাকার ওষুধ কিভাবে ব্যবহৃত হলো সেটা একটা বড় প্রশ্ন। 

এই যে এত বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে উঠছে এর ওপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কতটা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে? যদি থেকেই থাকে তবে কোন খাতে ঠিক কত টাকা বিল চার্জ হবে সেটার জবাবদিহিতা অথবা কত টাকা হতে পারে তার একটি মূল্যতালিকা অবশ্যই সংযোজন করা বা সরকার কর্তৃক পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ করা জরুরি। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও মনিটরিং এর জন্য মন্ত্রণালয়ের আলাদা কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। তারা ঠিক বিষয়গুলো কতটা গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখছেন সেটা আমার মতো অজস্র সাধারণ মানুষের প্রশ্ন। 

২৫ জুলাই প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে ধানমন্ডি সাতমসজিদ রোডের ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডেঙ্গু শনাক্তকরণে রক্তের ডেঙ্গু এনএসআই এজি ও সিবিসি পরীক্ষা করাতে আসেন রমজান আলি। পরদিন ২৬ জুলাই রিপোর্ট সংগ্রহ করে দেখতে পান রক্তের প্লাটিলেট লেভেল ৭ লাখ ৮৪ হাজার সিএমএম। প্লাটিলেট লেভেল স্বাভাবিক থেকে অনেক বেশি হওয়ায় তিনি আরো একটি হাসপাতালে ব্লাড টেস্ট করান এবং সেখানকার রিপোর্টে রক্তের প্লাটিলেট লেভেল ২ লাখ আসে- যা ছিল স্বাভাবিক লেভেল। পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তি ইবনে সিনা হাসপাতালের বিরুদ্ধে মামলা করেন। যদি উনি সচেতনভাবে ক্রস চেক না করতেন তবে ইবনে সিনার প্রতারণামূলক ভুল রিপোর্টের ভিত্তিতে ওষুধ সেবন করলে শারীরিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন ভুক্তভোগী ব্যক্তিটি। প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে মোট এক হাজার ৬৪৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। 

আবার ডেঙ্গু টেস্টে সরকার নির্ধারিত ফি থেকে বেশি ফি নিচ্ছে কতিপয় হাসপাতাল। এ জন্য বেশ কিছু  হাসপাতালকে জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি শুধু ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কাজ? সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরেরও এসংক্রান্ত কাজগুলো মনিটরিং করা উচিত বলে মনে করি। কিন্তু সেটা কতখানি বাস্তবায়ন হচ্ছে তা ধোঁয়াশাতেই রয়ে গিয়েছে।

দুই
এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন যে অবহেলা করেছে তা তো বিভিন্ন মিডিয়ার কল্যাণে এখন সকলেই জানেন। এমনকি উচ্চ আদালতের আগাম সতর্কতা থাকার পরেও সেটাকে আমলে নেওয়া হয়নি বা আমলে নিলে যে ডেঙ্গু এতটা মারাত্মক আকার ধারণ করত না তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না। আবার মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে তা যে কার্যকর নয়, সে ব্যাপারে প্রায় এক বছর আগেই গবেষণা প্রতিবেদন দিয়েছিল আইসিডিডিআর.বি।

উল্লেখ্য যে দুটি সিটি করপোরেশনের একটিও এই ব্যাপারে জনসমক্ষে তাদের এই কার্যকলাপের জন্য ন্যূনতম দুঃখ প্রকাশও করেনি। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীও জাতির এই বিপদের দিনে সস্ত্রীক বিদেশ ভ্রমণ করেছেন এবং পরে অবস্থার চাপে তিনি দেশে আসতে বাধ্য হন। এমনকি ডেঙ্গু প্রতিরোধে খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই নির্দেশ দিতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনের রয়েছে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী; যারা জনগণের ট্যাক্স এর টাকায় বেতন-ভাতাদি পেলেও জনগণকে সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

তিন
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্য খাতের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অন্তত ১১টি উৎস চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশ দিয়েছিল বেশ কিছু বছর আগে। এর আগে ২০১৭ সালে আইন কমিশনও দেশের স্বাস্থ্য খাতে সমস্যাবলী চিহ্নিত করে এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে ১২৫টির বেশি সুপারিশ দিয়েছিল আইন কমিশন। কিন্তু সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে গতি নিতান্তই কম বলে পরবর্তী এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়।

চার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ ইকোনমিকস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এ হামিদ গণমাধ্যমের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, জনগণের জন্যই ন্যাশনাল হেলথ ইন্স্যুরেন্স করাটা জরুরি। বর্তমানে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ রয়েছে তা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয় তা-ও অনেক সমস্যা দূর হবে। এদিকে আগে নজরদারি বাড়াতে হবে যাতে বাজেট অখাতে ব্যয় না হয়। তবে, স্বাস্থ্য খাতের বাজেট প্রণয়নে ব্যাপক দুর্বলতা আছে। 

এমন অনেক সময়ই শোনা যায় হাসপাতালগুলোতে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত পর্যাপ্ত ওষুধ থাকার পরেও রোগীদের তা সব সময় সরবরাহ করা হয় না। সে ক্ষেত্রে এ খাতে জবাবদিহিতা আনতে দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে জনসাধারণের দৃষ্টিগোচর হয় এমন উন্মুক্ত স্থানে সিটিজেন চার্টার প্রদর্শনের বিধান চালু করারও সুপারিশ করছি। এ ক্ষেত্রে এমন চার্ট টানানো থাকলে কোনো হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার টেস্টগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত ফি দাবি করা সম্ভব হবে না (যেমনটা ডেঙ্গু টেস্ট নিয়ে করেছে বেশ কিছু হাসপাতাল)।

পাঁচ
আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একই জায়গায় দীর্ঘদিন পোস্টিং এর সুবাদে বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় দালালদের সমন্বয়ে সংঘবদ্ধ একটি চক্রে পরিণত হয়। তারা রোগী বা তাদের স্বজনদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের কাছ থেকে বেআইনিভাবে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করে বলেও শোনা যায়। নির্ধারিত ফি ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে ঝামেলা এড়িয়ে দ্রুত সেবা পাওয়ার আশায় রোগীরা অর্থের বিনিময়ে হাসপাতালের কর্মচারী বা দালালদের শরণাপন্ন হন। সে ক্ষেত্রে, একই ব্যক্তি যাতে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে না থাকতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।

ডেঙ্গু এখন এক মহামারীর নাম। একের পর এক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে এবং এরই মধ্যে ডেঙ্গু বলা যায় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। মারাও গিয়েছেন অনেকে। বিদ্যমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এর বিষয়। যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ওষুধ ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পরিশেষে, জনস্বাস্থ্যের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ একটি খাতকে ব্যাপক জবাবদিহিতার আওতায় আনবার জন্য নজরদারি বৃদ্ধি ও সংশ্লিষ্ট সকল প্রশাসনের এ ব্যাপারে সচেষ্ট থাকা এখন সর্বপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এ দেশের সাধারণ মানুষ বন্যায়, সড়ক দুর্ঘটনায়, ভেজাল খাদ্যে, নৃশংস ধর্ষণের শিকার হয়ে নানাভাবে মৃত্যুফাঁদে নিপতিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর এর সাথে নব-সংযোজন হচ্ছে ডেঙ্গু। জবাবদিহিতার সংস্কৃতি নিশ্চিত করতে না পারলে সোনার বাংলাকে প্রকৃত সোনার বাংলায় রূপান্তর করার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা