kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

বিশেষজ্ঞ মত

ডেঙ্গুর উপসর্গ না দেখেই পরীক্ষা করতে ছোটাছুটির দরকার নেই

ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ   

২ আগস্ট, ২০১৯ ১০:১১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ডেঙ্গুর উপসর্গ না দেখেই পরীক্ষা করতে ছোটাছুটির দরকার নেই

গত কিছুদিনের পরিস্থিতি দেখে আমার কাছে মনে হচ্ছে, ডেঙ্গু নিয়ে মানুষ একটু বেশিই শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে এখন শুধু ডেঙ্গুর সিজনই নয়, এখন কিন্তু নানা ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জারও সিজন। তাই জ্বর জ্বর ভাব হলেও অনেকে হাসপাতালে ভিড় করছে। এতে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় বিঘ্ন ঘটছে। সুস্থ মানুষদেরও অসুস্থ বা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তাই মানুষকে এদিকে সচেতন হতে হবে। উপসর্গ না দেখেই পরীক্ষা করতে ছোটাছুটির দরকার নেই।

এ ছাড়া সামনে ঈদ ঘিরেও মানুষ ঢাকা ছাড়বে কি ছাড়বে না তা নিয়েও এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে; এটা হওয়ারই কথা। তবে যারা ঢাকা থেকে অন্য জেলা বা মহানগরীতে যাবে তাদের খুব একটা শঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই এ কারণে যে ওসব এলাকায় চিকিৎসার ব্যবস্থাপনা আছে। পরীক্ষার সুযোগও আছে। প্রত্যন্ত গ্রামের ক্ষেত্রে হয়তো তেমন সুযোগটা নেই। ফলে যারা গ্রামে যাবে তাদের একটু বেশি সতর্ক থাকলেই চলবে। যদিও এ ক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো যে এখন পর্যন্ত কোনো গ্রামে এডিস মশার বিস্তার ঘটেনি বা বিস্তারের সুযোগও কম। তবু গ্রামে গেলেও জ্বরের সঙ্গে ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখলে আশপাশের শহরে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে।

গ্রামে এখন যেহেতু পানি-কাদা আছে, কোথাও কোথাও বন্যার পরিবেশও আছে তাই সেদিকেও খেয়াল রাখা কিন্তু জরুরি। ওই রকম পরিবেশ থেকে ডেঙ্গু ছাড়াও কিন্তু অন্য রোগ-ব্যাধির বিস্তার ঘটতে পারে। ডায়রিয়ার ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হবে।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে অবশ্য পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ হলেই যে হাসপাতালে ছুটতে হবে, বিষয়টি তেমন নয়। প্লাটিলেট কী পর্যায়ে আছে, অন্য কোনো জটিলতা বা একাধিক রোগ আছে কি না সেগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। সাধারণ ডেঙ্গু হলে হাসপাতালে ভর্তি জরুরি নয়। তবে এখন যেহেতু ডেঙ্গুর প্রকোপ চলছে তাই জ্বর হলে এবং সঙ্গে ডেঙ্গুর উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি। আর চিকিৎসকদের কাজ হবে পরীক্ষার ব্যবস্থা করে রোগ নির্ণয় হলে রোগীর অবস্থা অনুসারে হাসপাতালে বা বাসায় চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া। হাসপাতালে যাঁরা চিকিৎসা দেন তাঁদের আরো দক্ষতার সঙ্গে রোগীর অবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে। আতঙ্কিত হয়ে কোনো রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকতে চাইলে হবে না। তার আসলেই হাসপাতালে থাকার মতো মারাত্মক অবস্থা আছে কি না সেটা দেখতে হবে। আবার বেশিদিন হাসপাতালে রাখার দরকার আছে কি না নাকি অবস্থার প্রয়োজনীয় মাত্রায় উন্নতি ঘটলে বাসায় চিকিৎসা দেওয়া যায় কি না সেটা বিবেচনা করলে অন্য রোগীর উপকার হবে। আমরা সব সময়ই সতর্কতা ও সচেতনতার কথা বলে থাকি। কিন্তু তা থেকে মানুষকে শঙ্কিত হওয়া চলবে না। মানুষ সচেতন হলে শঙ্কিত না হয়ে বরং নিজেই পরিস্থিতি বুঝতে করণীয় বুঝতে পারবে। এককথায় বলতে গেলে, সব ডেঙ্গু রোগীরই হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন নেই, তবে ডাক্তারের ফলোআপে থাকা জরুরি।

এবার অবশ্য ডেঙ্গুর জটিলতাও বেশি দেখা যাচ্ছে। ধরন পাল্টে যাচ্ছে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া হয় এডিস মশার কামড়ে। এ ব্যাপারে ভয় না পেয়ে চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের আরো সতর্কতা প্রয়োজন। ডেঙ্গুর সঠিকভাবে চিকিৎসা করা হলে সাধারণ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত প্রায় শতভাগ রোগীই ভালো হয়ে যায়। তবে ডেঙ্গুর সঙ্গে অন্য জটিলতা থাকলে সেটা কিন্তু আবার বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ডেঙ্গুতে জ্বর সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় দিন থাকে এবং তারপর জ্বর সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। তবে কখনো কখনো দুই বা তিন দিন পর আবার জ্বর আসতে পারে। তবে এবার দেখা যায় দু-এক দিনের জ্বরেও ডেঙ্গু রোগী শকে চলে যায়।

যদিও জ্বর কমে গেলে বা ভালো হয়ে গেলে অনেক রোগী এমনকি অনেক ডাক্তারও মনে করেন যে রোগ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেছে, কিন্তু ডেঙ্গুতে মারাত্মক সমস্যা হয় এমন সময়েই। এ সময় প্লাটিলেট কাউন্ট কমে যায় এবং রক্তক্ষরণসহ নানা রকম সমস্যা দেখা দিতে পারে। জ্বর কমে যাওয়ার পরবর্তী কিছুদিনকে তাই বলা হয় ক্রিটিক্যাল পিরিয়ড। এ সময়টাতে সবারই সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। অনেকেই দিনে দু-তিনবার করে প্লাটিলেট কাউন্ট করে থাকে। আসলে প্লাটিলেট কাউন্ট ঘন ঘন করার প্রয়োজন নেই, দিনে একবার করাই যথেষ্ট, এমনকি মারাত্মক ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারেও।

জ্বর হলে আগেই ডেঙ্গুর ভয় পাওয়ার দরকার নেই। জ্বরের সঙ্গে শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, মাথাব্যথা, গায়ে র‌্যাশ ওঠা, কিছু খেতে না পারা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, রক্ত আসার মতো উপসর্গ হলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
লেখক : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা