kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

'রাইড শেয়ারিং' সেবায় সন্তুষ্ট নন ব্যবহারকারীরা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১১ জুন, ২০১৯ ১৬:২০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



'রাইড শেয়ারিং' সেবায় সন্তুষ্ট নন ব্যবহারকারীরা

ছবি: ডয়চে ভ্যালে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বিশ্বজুড়ে জ্বালানী সংকট বেশ প্রকট হয়ে দেখা দেয়। আর তখনই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে রাইড শেয়ারিংয়ের ধারণা। কোনো কোনো দেশে এটি কারপুলিং, কস্ট শেয়ারিং নামেও পরিচিত। জ্বালানী, সময়, অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতি কমানোও হয়ে ওঠে এর জনপ্রিয়তার কারণ।

কোনো কোনো দেশে রাইড শেয়ারিংকে সরকারিভাবে সহায়তা করার চেষ্টা চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি রাজ্যে কারপুলিংয়ের জন্য আলাদা সড়ক করে দেয়া হয়েছিল। এমন অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে আরো নানা দেশ।

পরিবেশের কথা বাদই দিলাম। অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও গণপরিবহনব্যবস্থা একেবারেই নাজুক। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এখন গুগল ম্যাপই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার রুট, বাস, ট্রাম বা অন্য সব ধরনের বিকল্প আপনাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানিয়ে দেয়। বাংলাদেশে কখন, কোথায়, কোন বাস যায়, তা হয়তো চালকেরাও ঠিকমতো বলতে পারেন না।

নৈরাজ্য তো আছেই। বিদেশি বাদ দিলাম, অন্য শহর থেকে ঢাকায় নতুন আসা কারো পক্ষেও গণপরিবহনের রুট, সময়সূচি, ভাড়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া অসম্ভব।

বিকল্প ব্যবস্থায় যাদের সামর্থ্য রয়েছে, তারা গাড়ি কিনছেন। এমন অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার আছে, যাদের সামর্থ্য না থাকলেও প্রতিদিনের যাতায়াতের ভোগান্তি থেকে বাঁচতে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে হলেও কিনছেন ব্যক্তিগত গাড়ি।

দরকারের সময়ে সিএনজি অটোরিকশা, ট্যাক্সি, রিকশা, কোনোকিছুই হাতের নাগালে পাওয়া ঢাকা শহরে সম্ভব না৷ আর বৃষ্টি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সমাবেশ, বা বড় কোনো পরীক্ষা থাকলে ঢাকা শহরের যাত্রীদের অবস্থা হয় পাগলের মতো।

২০১৬ সালের শেষে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের বৃহত্তম রাইড শেয়ারিং কম্পানি পাঠাও। এরা জানিয়েছে, এই পর্যন্ত তাদের মোবাইল অ্যাপ প্রায় ৫০ লাখ বার ডাউনলোড হয়েছে। ৪ কোটির বেশি ট্রিপ দিয়েছেন পাঠাওয়ের চালকরা। রাইড শেয়ারিংয়ের পাশাপাশি খাবার ও পার্সেল সার্ভিস রয়েছে পাঠাওয়ের৷ নেপালেও চলছে তাদের কার্যক্রম।

এই অবস্থায় যাত্রীদের আশীর্বাদ হয়ে আসে উবার। এরপরই পাঠাও এবং পরে আরো বেশ কিছু দেশীয় প্রতিষ্ঠান গণপরিবহনের নৈরাজ্যের সুযোগ নিয়ে সে জায়গা দখল করে৷ হাতের নাগালে অ্যাপ৷ বাসায় বসে অনুরোধ পাঠালে গাড়ি এসে হাজির হয়৷ কোনো দামদর করতে হয় না৷ নিশ্চিন্তে পৌঁছে যাওয়া যায় গন্তব্যে।

কিন্তু রাইড শেয়ারিং নাম দিলেও, রাইড কি শেয়ার করছেন এই সেবা দানকারী চালকেরা? না, অন্তত ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই না। কোনো যাত্রী নিজে কোথাও যাচ্ছেন, এমন ক্ষেত্রে সে পথের কাউকে নেয়া হলো শেয়ারিং। কিন্তু এখন পাঠাও-উবার যা করছে, তা কোনোভাবেই শেয়ারিং না। বরং কথ্য বাংলায় যাকে ‘খ্যাপ' বলা হয়। যাকে, মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের জন্য সেই বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে এরা।

নানা সুবিধার কারণে পাঠাওয়ের মোটরসাইকেল আমার কাছেও বেশ প্রিয় ছিল। সে সূত্রেই চালকদের কাছ থেকে জানা, পাঠাও জনপ্রিয় হওয়ার পর হঠাৎ করেই ঢাকা শহরে বিভিন্ন শোরুমগুলোতে বেড়ে গেছে মোটরসাইকেল বিক্রি, সড়কে প্রতিদিনই নামছে নতুন নতুন যান।

একবার একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, যিনি মাত্র আগের দিন ঢাকায় এসেছেন। নিজের মোটরসাইকেল তো নেই-ই, ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই। যা আছে, তা হলো পরিচিত এক বড় ভাই যিনি কাজ করেন পুলিশে। ফলে দিব্যি মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে একদিনেই তিনি কয়েক শ টাকা কামিয়েছেন, যাত্রাপথের দিকও চিনে নিয়েছেন যাত্রীর কাছ থেকেই।

গাড়িতেও একই যন্ত্রণা। গাড়ি কিনলে পাওয়া যাচ্ছে বাড়তি আয়ের সুযোগ৷ ফলে অনেকে গাড়ি কিনে সেটা নিবন্ধন করছেন উবার-পাঠাওয়ে।  ফলে যানজট কমার বদলে, তাতে আরো নতুন যন্ত্রণা যোগ হচ্ছে।

এসব গাড়ি বা মোটর সাইকেলে নেই কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ। একটা নীতিমালা হলেও অন্য সব খাতের মতো এটিও অকার্যকর। নিরাপত্তা, জবাবদিহিতাসহ নানা বিষয়ে যাত্রীদেরও রয়েছে অভিযোগ।

ফেসবুকে বন্ধুদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম রাইড শেয়ারিং নিয়ে তাঁদের মন্তব্য। অনেকে খুঁত থাকা সত্ত্বেও এসব সেবাকে স্বাগত জানিয়েছেন। কেউ কেউ তুলে ধরেছেন নিজেদের অভিজ্ঞতা৷

বেলাল হাসান নিসার গতি ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন৷ বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মোটরবাইক চালকেরা নামেমাত্র হেলমেট দেন যাত্রীদের।

নূসরাত হক প্রশ্ন তুলেছেন চালকের ব্যবহার নিয়ে। একটি অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিক ওবায়দুর মাসুম এক কথায় জানিয়ে দিয়েছেন, সবগুলো অবৈধভাবে চলছে। সৈকত সাদিক রাস্তায় চালকদের কোনো আইন না মানার বিষয়টিকে বড় সমস্যা বলে মনে করছেন।

রিফাত লোপা ভাড়া নির্ধারণে সেবাগুলোর স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের কথা তুলে ধরেছেন। রাইড শেয়ারিংয়ের কারণে কিছুটা ভোগান্তি মধ্যবিত্তের কমেছে বলেই মানছেন জান্নাতুল ফেরদৌস। কিন্তু পাশাপাশি বলছেন, যেসব কারণে সিএনজিতে চড়া বন্ধ করছিলাম, এখন উবার-পাঠাও তা শুরু করছে। ঈদে ভাড়া ৪ গুণ! আবার মোড়ে দাঁড়িয়ে বাইকগুলো চুক্তিতে যেতে চায়!

কারপুলিং বা রাইড শেয়ারিংয়ে কোনোভাবেই একজন চালকের মুনাফা করার কথা না৷ শুধু যাত্রাপথে জ্বালানির খরচের এক অংশ দেয়ার কথা সহযাত্রীর। কিন্তু বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিংয়ের নামে রীতিমতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন চালকেরা। শুধু চালক নন, একটা অ্যাপ বানিয়ে আর কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই কামাচ্ছেন নগদ টাকা।

আমার মন্তব্যে মনে হতে পারে আমাকে ‘সুখে থাকলে ভূতে' কিলাচ্ছে। কিন্তু একটি দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় এমন নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা চলতে থাকলে সে দেশ কখনও উন্নত হতে পারে না।

যদি রাইড শেয়ার করতে হয়, সেটা অবশ্যই দারুণ উদ্যোগ। আর যদি এখন যা চলছে তাই চলতে দিতে হয়, তাহলে শেয়ারিংয়ের মুখোশ ছেড়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই তাদের নিবন্ধন করতে হবে। একদিকে শেয়ারিংয়ের নামে দু'পয়সা বাড়তি কামিয়ে ট্যাক্স ফাঁকি, অন্যদিকে জনগণের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে যাচ্ছেতাই করার সুযোগ ব্যবসায়ীরা চিরদিনই নিয়ে এসেছেন, সে চেষ্টা তারা চালিয়েও যাবেন।

সরকারের দায়িত্ব হলো জনগণের পক্ষ নিয়ে সবকিছুকে একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা। এক্ষেত্রে অবশ্য তথাকথিত রাইড শেয়ারিং সেবায় হাত দেয়ার আগে গণপরিবহনে হাত দেয়ার পক্ষেই থাকবো আমি।
সূত্র: ডয়চে ভ্যালে 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা