kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

বাংলাদেশের বৃষ্টির দুঃখ

সাইদুজ্জামান, ব্রিস্টল থেকে   

১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশের বৃষ্টির দুঃখ

সাকিব আল হাসান আর তামিম ইকবাল হোটেল লবিতে মুখোমুখি চেয়ারে বসে। সকালেই মাঠে চলে গেছেন বাংলাদেশ দলের ১০ জন। তাঁদের মধ্যে খেলোয়াড় মোটে দুজন—মুশফিকুর রহিম ও সাব্বির রহমান। অবশ্য এটি নতুন কিছুই নয়, প্র্যাকটিসে কিংবা ম্যাচে বাংলাদেশ দল দুই ভাগে যায়। প্রথম ভাগে ওই দুই ক্রিকেটারই থাকেন, তাঁদের ম্যাচ প্রিপারেশনটি অন্যদের চেয়ে দীর্ঘতর যে!

ব্রিস্টলের আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস জেনে আগের দিনই আইসিসির পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে বাংলাদেশ দল চাইলে হোটেলেই অপেক্ষা করতে পারে। বৃষ্টি থেমে খেলার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হলে পরে ফোনে ডাকা হবে। তখন মাঠে এলেই হবে। তাই আর বাকিরা থেকে গেছেন হোটেলেই চোখে-মুখে উদ্বেগ নিয়ে।

ব্রিস্টলের টিম হোটেল মারকিউরে হল্যান্ড হাউসের লবিতে তাই আবিষ্কার করা গেল সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালকে। মুখে হাসি তবে চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ। একটু পরপরই সকালেই মাঠে চলে যাওয়া টিম অপারেশনস ম্যানেজার সাব্বির খানকে ফোন করছেন তামিম, ‘ভাই মাঠের কী অবস্থা? এখানে তো বৃষ্টি নেই। কী বললেন? ওখানে বৃষ্টি হচ্ছে?’ সাকিব মোবাইল অ্যাপে ব্রিস্টলের আবহাওয়ার আপডেট জানছেন প্রতিনিয়ত। একটু পরে সেখানে উপস্থিত বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। পরিবেশ হালকা করার জন্যই কি না নিজস্ব স্টাইলে বেশ কিছুক্ষণ সেমিতে ওঠার অদ্ভুত সব সম্ভাবনার কথা বললেন। তাতে কতটুকু কাজ হলো, নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে সবাই মন খুলে হেসেছেন ঠিকই।

তবে স্কাই স্পোর্টসের নির্ধারিত ম্যাচ-পরবর্তী টিভি ইন্টারভিউতে সিরিয়াস মাশরাফি, ‘বৃষ্টির ওপর আমাদের কোনো হাত নেই। তবে এভাবে ম্যাচ পণ্ড হওয়া খুবই হতাশার। আমরা খুব করে চেয়েছিলাম ম্যাচটা যেন হয়। ম্যাচ খেলে জিতি বা হারি, মনকে বোঝাতে পারতাম। এ অবস্থায় আমাদের সেমিতে ওঠার পথটা অনেক কঠিন হয়ে গেল।’ ‘থট রিডিং’য়ের কোনো তো যন্ত্র নেই। তাই সেসবকে সরকারি ভাষ্য বলে চালিয়ে দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। তবে স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় হোটেল ছেড়ে মাঠে যাওয়ার পথে বাংলাদেশি সব ক্রিকেটারের অভিব্যক্তিতেই মিশে ছিল হারের গ্লানি। শ্রীলঙ্কা ম্যাচটি না হওয়া একরকম হারই ধরে নিয়েছিলেন যে সবাই! বেচারা রুবেল হোসেন। নিশ্চিত খেলতেন এই ম্যাচে। কিন্তু বৃষ্টি তাঁকে মাঠে নামতেই দিল না। টিম ম্যানেজমেন্টের ভাবনায় সাব্বির রহমানও ঢুকে পড়েছিলেন বৃষ্টির কারণে। ম্যাচের দৈর্ঘ্য যত কমত ততই সম্ভাবনা বাড়ত সাব্বিরের বিশ্বকাপ অভিষেকের। কিন্তু আপাতত সব সম্ভাবনাতেই জল ঢেলে দিয়েছে ব্রিস্টলের বৃষ্টি। যার দায়ভার নানাভাবে পড়ছে আইসিসির কাঁধে! ইংল্যান্ডে এই সময় বিশ্বকাপ আয়োজন করা মানেই তো প্রকৃতির সঙ্গে লুকোচুরি, এটি কেন ধর্তব্যে নেয়নি ক্রিকেট নিয়ন্তা সংস্থা?

শ্রীলঙ্কার দিমুথ করুণারত্নে অবশ্য সযতনে আগলে রাখলেন আইসিসিকে, ‘লজিস্টিকসের বিষয়টি আপনাদের মাথায় রাখতে হবে। অনেক দল খেলছে, ট্রাভেলিংয়ের ব্যাপার আছে। সম্ভবত এসব কারণেই রিজার্ভ ডে রাখেনি আইসিসি।’ কিন্তু সদাশয় বাংলাদেশ কোচ স্টিভ রোডস একই প্রশ্নে খোঁচাই দিলেন আইসিসিকে, ‘আমরা তো আজকাল চাঁদেও লোক পাঠাচ্ছি। আর প্রতিটি ম্যাচের পরই লম্বা বিরতি পাচ্ছে দলগুলো। তাই আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে রিজার্ভ ডে রাখা উচিত ছিল।’

ম্যাচ বাতিলের পর দ্য কাউন্টি গ্রাউন্ডের ইনডোরে মিডিয়া কনফারেন্স রুমের আবহেই অবশ্য ফুটে উঠেছিল করুণারত্নে ও রোডসের অভিব্যক্তির বৈপরীত্য। সদা হাস্যোজ্জ্বল রোডসের মুখে তখন হাসি নেই। আর করুণারত্নের উত্ফুল্লভাব দেখে মনে হচ্ছিল বুঝি সদ্যই একটি ম্যাচ জিতে এসেছেন! মুখে অবশ্য বলেছেন যে বৃষ্টিতে ম্যাচ বাতিল হওয়ায় বেজার তিনি। কিন্তু অভিব্যক্তিতে কুড়িয়ে পাওয়া পয়েন্টের স্বস্তিই। বাংলাদেশ কোচ রোডস তো ভদ্রতা বজায় রেখেও বলে দেন, ‘শ্রীলঙ্কার প্রতি বিনয় বজায় রেখেই বলছি, এই ম্যাচ থেকে আমরা ২ পয়েন্ট আশা করেছিলাম। কিন্তু খেলাই তো হলো না। এটি আমাদের জন্য খুবই হতাশাজনক। আমি জানি যে শ্রীলঙ্কাও সর্বোচ্চ চেষ্টা করত। তবু মনে হচ্ছে আমরা পয়েন্ট হারালাম।’

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের পূর্ণ পয়েন্ট প্রত্যাশার কারণও আছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে এই ব্রিস্টলেই একবার ম্যাচ ভেসে যাওয়ায় পয়েন্টে ভাগ পেয়েছে লঙ্কানরা। তার আগে যে দুটি ম্যাচে ১৩৬ ও ২০১ রানে গুটিয়ে যাওয়া লঙ্কানদের সম্ভবত টার্গেট করে বসে আছে টুর্নামেন্টের বাকি দলগুলোও। প্রতিপক্ষদের এমন মনোভাব করুণারত্নের খুব ভালো লাগার কথা নয়। তবে বৃষ্টিতে নিজ দলের আরেকটি ম্যাচ বাতিল হওয়া নিয়ে খুব উতলা মনে হয়নি তাঁকে। একের পর এক ম্যাচে বৃষ্টি হানা দেওয়ার পর সবাই যখন ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ কেন, কেনই বা রিজার্ভ ডে রাখা হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে—তখন আইসিসির দুতিয়ালিই করছেন লঙ্কান অধিনায়ক!

অবশ্য এসব তো আর এখন বলে লাভ নেই। বিশ্বকাপের ফরম্যাট এবং সূচি চূড়ান্ত হয়েছে অনেক আগেই। আইসিসির যেকোনো ইভেন্টের সূচি নির্ধারিত হয় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশের ক্রিকেটকর্তাদের সম্মতিতেই।

তবে দর্শকদের জন্য নাকি ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রেখেছে আইসিসি। ম্যাচ বাতিল হলে টিকিটের মূল্য ফেরত পাবে তারা। কিন্তু গতকাল দ্য কাউন্টি গ্রাউন্ডে উপচেপড়া বাংলাদেশি সমর্থকদের এতেও আক্ষেপ কমছে না। কাকভেজা হয়ে মাঠ ছাড়ার সময়ও লন্ডন থেকে আগত এক প্রবাসীর দুঃখ, ‘খুব শখ করে খেলা দেখতে এসেছিলাম ভাই। এখন তো আমাদের দলের জন্য কাজটা কঠিন হয়ে গেল।’

তাঁর কষ্টটা আসলে সবার।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা