kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

যন্ত্রেই কমতে পারে কৃষকের দুঃখ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



যন্ত্রেই কমতে পারে কৃষকের দুঃখ

আমনের পর বোরোতেও ধানের বাম্পার ফলন নীতিনির্ধারকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। তবে কৃষকদের মাথায় হাত। একদিকে হাওর, চর ও নিম্নাঞ্চলে ব্রি-২৮ জাতের ধানে চিটায় বিপর্যস্ত কৃষক, অন্যদিকে সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের অর্ধেকও তারা পাচ্ছে না। দুই মণ ধানের দামের সমপরিমাণ জনপ্রতি মজুরি দিয়ে পাকা ধান কেটে বাড়িতে তুলতে হিমশিম খাচ্ছে প্রান্তিক কৃষক। সরকারি উদ্যোগে স্থানীয় পর্যায়ে শস্যগুদাম তৈরি করে গুদামজাত ধানের বিপরীতে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে ধান নিয়ে এই দুর্ভোগ পোহাতে হতো না কৃষককে। জমি চাষ ও সেচের মতো ধান রোপণ ও কাটার ক্ষেত্রেও যন্ত্রের ব্যবহার না বাড়ালে কৃষি লাভজনক হবে না। 

এসব অভিমত ব্যক্ত করে অর্থনীতিবিদ, কৃষি খাতের বিশ্লেষক ও কর্মকর্তারা বলেছেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষকদের বাঁচাতে হবে এবং সে জন্য কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মিলে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তাঁদের মতে, আমনের ভালো ফলনের পরও আমদানি উন্মুক্ত থাকায় বাজারে চালের চাহিদা কম। অন্যদিকে ফসল কাটার মৌসুমে বাজারে ধানের সরবরাহ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।

চাহিদার চেয়ে জোগান অনেক বেশি থাকায় ব্যাপারী ও ফড়িয়ারা কম দামে ধান কেনার সুযোগ পাচ্ছে। এরাই পরে সরকার নির্ধারিত দামে চালকলে ধান বিক্রি করবে, কলমালিকরা নির্ধারিত দামে সরকারের কাছে চাল বিক্রি করবে। ফলে সরকার ধান-চালের দাম যতই নির্ধারণ করুক, তার সুফল কৃষক পায় না।

সরকার এ মৌসুমে মোট ১৩ লাখ টন চাল ও ধান সংগ্রহ করবে, যা গত বছরের চেয়ে এক লাখ টন কম। ধানের দাম একই থাকলেও এবার সরকার নির্ধারিত চালের দাম গত বছরের চেয়ে কেজিপ্রতি দুই টাকা কম। এবার যেখানে বোরোর উত্পাদন প্রায় দুই কোটি টন, সেখানে সরকারি ক্রয় ৬ শতাংশের মতো।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারের সব চাল কিনে কৃষকদের মূল্য সহায়তা দেওয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়, সরকার বড়জোর আপতকালীন মজুদ ক্ষমতা ৩০ লাখ টনে উন্নীত করতে পারে। সরকারের কাজ হবে ফলন ভালো হলে আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে ও রপ্তানি উত্সাহিত করে দেশের ভেতরে ও বাইরে চালের বাজার তৈরি করা। এতে ভরা মৌসুমে ধানের চাহিদা কমবে না। তাঁদের ধারণা, কৃষকের ধান ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ানো, ধার-দেনা শোধ করে তাত্ক্ষণিক ব্যয় মেটানোর জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা আর যান্ত্রিকীকরণে সহায়তা বাড়িয়ে উত্পাদন খরচ কমাতে সহায়তা করলে কৃষকদের হাহাকার কমবে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পভার্টি স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুল হক কাজল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাল আমদানির শুল্ক কম হওয়ায় বাজারে চালের ঘাটতি নেই, ফলে ধানের চাহিদাও নেই। আমাদের এখনই আমদানির উত্স বন্ধ করতে হবে। আর উদ্বৃত্ত হলে চাল রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে। বিদেশের বাজারের জন্য চালের মান বাড়াতে হবে। চাল থেকে কেবল ভাতই হয় না, আরো অনেক কিছু হয়। রপ্তানির কথা মাথায় রেখে চাল প্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্যোগ নিতে হবে।’

কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এখন জরুরি বলে উল্লেখ করেন ড. মিজানুল হক কাজল। তিনি বলেন, কৃষি যন্ত্রগুলোর অনেক দাম। তাই সরকারিভাবে উপজেলা পর্যায়ে এসব যন্ত্র রাখলে কৃষকরা ভাড়ায় নিতে পারে। এ কৃষি অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, ‘আমরা উদ্বিগ্ন, কারণ কৃষকরা ধানের দাম পাচ্ছে না। কৃষির উত্পাদন বেড়েছে, এটা অনেক বড় সাফল্য। এটাকে ধরে রাখতে হবে। কৃষকদের বাঁচাতে হবে। কারণ কৃষক হতাশ হলে চাষ কমবে, ফলন কমবে। এ জন্য কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে বসে ঠিক করতে হবে কিভাবে চাল রপ্তানি করা যায়, কিভাবে যান্ত্রিকীকরণে কৃষককে আরো বেশি সহায়তা দেওয়া যায়।’

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. পরিমল কান্তি বিশ্বাস বলেন, ‘কম শ্রমিক নিয়ে কম খরচে চাষাবাদ করার জন্য অবশ্যই যান্ত্রিকীকরণে যেতে হবে। বোরো চাষে জমি প্রস্তুত করা, ধান লাগানো, আগাছা পরিষ্কার করা, ধান কাটায় শ্রমিক লাগে, খরচও অনেক।’ তিনি জানান, এক হিসাবে দেখা গেছে, রিপার ব্যবহার করে প্রতি হেক্টরে দেড় হাজার টাকা মজুরি খরচ কমে। আর রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ব্যবহার করে এক দিনে এক হেক্টর জমিতে ধান রোপণ করা যায়, এতে অন্তত ২০ জন মজুরের খরচ বাঁচানো যায়। কৃষি যন্ত্রপাতিতে সরকার এখন ৩০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে। এসব যন্ত্র এখন দেশেও তৈরি হচ্ছে।

বোরো ধান চাষে খরচ বেশি বলে উল্লেখ করেন কৃষিতত্ত্ববিদ। তিনি বলেন, বোরো চাষে মোট খরচের এক-তৃতীয়াংশই যায় পানির পেছনে। এক কেজি বোরো চাষে তিন থেকে চার হাজার লিটার পানি লাগে, যা মূলত ভূগর্ভস্থ পানি। খুব সহজ পদ্ধতি ব্যবহার করে এ খরচ এক-তৃতীয়াংশ কমানো সম্ভব। এ ছাড়া বোরোর চাষ কমিয়ে আউশ উত্সাহিত করা দরকার।

ড. পরিমল জানান, বোরোতে এক টাকা খরচ করলে ৯০ পয়সাও ফেরত আসে না, যেখানে গমে এক টাকা ২০ পয়সা, ভুট্টায় এক টাকা ৫০ পয়সা আসে। বিকল্প হিসেবে কৃষককে এসব লাভজনক ফসলের কথা ভাবার পরামর্শ দিলেন এই কৃষিবিদ। তিনি বলেন, ‘প্রায় দুই কোটি টন বোরো ধান থেকে সরকার যদি ১৩ লাখ টন কেনে তার প্রভাব বাজারে সামান্যই পড়বে। কিন্তু সরকার কতটুকুই বা কিনবে? আর কিনে কী করবে? হয়তো রপ্তানি করতে পারে।’ তবে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ২৫-৩০ লাখ টন চাল মজুদের ক্ষমতা রেখে রপ্তানির চিন্তা করার পরামর্শ এই কৃষিবিদের। কৃষকরা যাতে স্থানীয় পর্যায়ে কিছুদিন ধান মজুদ রাখতে পারে সে জন্য গুদাম নির্মাণ, নির্ধারিত মূল্যে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার ব্যবস্থা এবং কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শও দিলেন তিনি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘আমাদের কৃষকদের বেশির ভাগই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক, তারা ফসল ধরে রাখতে পারে না। ধার-কর্জ থাকে, খরচের চাপ থাকে। ধান কেটেই বিক্রি করতে হয় তাদের। তা ছাড়া ছোট ঘরে ধান রাখবেই বা কোথায় তারা! সবাই ধান নিয়ে আসে বাজারে, ব্যাপারীরা সুযোগ বুঝে দাম কমিয়ে দেয়, সেই দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয় কৃষক। প্রতিবছরই এ সমস্যা আমাদের। কৃষকদের ধান ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়াতে হবে।’

ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, সরকারের ধরে দেওয়া দাম কৃষকদের কাজে আসে না, এর সুফল পায় মিলমালিকরা। ইউনিয়ন পর্যায়ে গুদাম তৈরি করে কৃষকের ধান দু-তিন মাস রাখার ব্যবস্থা করা এবং সেই ধানের বিপরীতে ঋণ দিলে কৃষকদের আর অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করতে হবে না। তিনি আরো বলেন, একসময় বলা হতো, যান্ত্রিকীকরণের ফলে কর্ম হারাবে শ্রমিকরা, এখন তো আর সেই সমস্যা নেই। তাই কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হলে যন্ত্রের মূল্য কৃষকের সাধ্যের মধ্যে রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে ঋণের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। ধানের বাজারব্যবস্থার উন্নয়নেও সরকারকে কিছু করতে হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক পঙ্কজ কান্তি মজুমদার বলেন, ‘কৃষি যন্ত্রপাতিতে সরকারি ভর্তুকি এখন ৩০ শতাংশ। যন্ত্রের ব্যবহারও বাড়ছে। রিপার, কম্বাইন হার্ভেস্টর অনেকে এককভাবে কিনতে পারে না। এ ক্ষেত্রে আমরা কয়েকজনের গ্রুপ তৈরি করে কিনতে বলি। তালিকাভুক্ত কৃষকরা এক লাখ টাকার রিপার ৭০ হাজার টাকায় কিনতে পারে। যন্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষার পর নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকির টাকা দিয়ে দেওয়া হয়।’

তবু ফসল কাটায় যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে না কেন জানতে চাইলে খুলনায় কর্মরত এ কৃষিবিদ জানান, এ ক্ষেত্রে কৃষকদেরও কিছুটা অনাগ্রহ আছে। কারণ ফসল কাটার যন্ত্র সারা বছর বসিয়ে রাখতে হয়, তা ছাড়া পরিচালন, রক্ষণাবেক্ষণের দক্ষতারও ঘাটতি আছে। তবে এ অবস্থা কাটিয়ে অচিরেই ফসল কাটায়ও যন্ত্রের ব্যবহার বাড়বে বলে আশাবাদ তাঁর। তিনি জানান, সেচে ও চাষাবাদে প্রায় শতভাগ যন্ত্রের ব্যবহার এখন।

প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধি দেশে দেশে : কৃষি প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে এশিয়ার চাল উত্পাদনের চালচিত্র। ৫০ বছর আগেও যেসব দেশের কৃষি ছিল মানুষ ও পশুনির্ভর, সেখানে এখন শতভাগ যন্ত্রচালিত। জাপান আরো এক ধাপ এগিয়ে, তারা রোবটচালিত বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রযুগে প্রবেশ করছে। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, তাইওয়ানের ধান চাষে ব্যাপক সাফল্যের পেছনে রয়েছে লাগসই ও সাশ্রয়ী কৃষি প্রযুক্তি। ওই সব দেশেও অর্ধেকেরও বেশি চাষী প্রান্তিক। তাদের কাছে সহজলভ্য প্রযুক্তি পৌঁছে দিয়েই ধান চাষে বিপ্লব এনে এসব দেশ এখন বৈশ্বিক চালের বাজারের নিয়ন্ত্রক। প্রথমে সমবায় বা যৌথ ভিত্তিতে যন্ত্র ভাগাভাগি করলেও এখন ঘরে ঘরে পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, কম্বাইন হার্ভেস্টরসহ নানা ছোট-বড় কৃষি যন্ত্র। দক্ষিণ কোরিয়ায় কৃষি প্রযুক্তির হার খানাপ্রতি ১ দশমিক ১ ইউনিট।  কৃষিতে চরম শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছিল সে দেশেও। শতভাগ যন্ত্রের ব্যবহারে তা কাটিয়ে উঠেছে দেশটি। এশিয়া রাইস ফাউন্ডেশনের এক জরিপে দেখা গেছে, সে দেশে ১৯৭১ সালে হেক্টরপ্রতি এক হাজার ৭০০ ঘণ্টা শ্রমের দরকার ছিল, যা এখন মাত্র ১৬২ ঘণ্টা। যান্ত্রিক কৃষিতে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ভারতও।

[প্রতিবেদনটির জন্য তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন শেকৃবি প্রতিনিধি শাহাদাত হোসেন।]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা