kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

শিক্ষার মানোন্নয়ন

গলার কাঁটা ছয় প্রকল্প

শরীফুল আলম সুমন   

২৪ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গলার কাঁটা ছয় প্রকল্প

শিক্ষার মানোন্নয়নসংক্রান্ত ১৪টি প্রকল্প চালু আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের অধীনে। কিন্তু এসবের মধ্যে ছয়টি প্রকল্প গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনোভাবেই অগ্রসর হচ্ছে না ওই প্রকল্পগুলোর কাজ। ছয়টি প্রকল্পের জন্য প্রতিবছর বরাদ্দ করা অর্থের বড় অংশই বছর শেষে ফেরত দিতে হচ্ছে। এই ধীরগতির কারণে প্রকল্পের পুরো উদ্দেশ্যই এখন ব্যাহত হওয়ার পথে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মাউশি অধিদপ্তরের আওতাধীন ১৪টি প্রকল্পে চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ আছে দুই হাজার ৪৯৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে ৫৭.২৮ শতাংশ অর্থ ছাড় করা হলেও ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩৭.৮১ শতাংশ অর্থ। অথচ গত অর্থবছরে একই সময়ে প্রকল্পগুলোর আর্থিক অগ্রগতির হার ছিল ৪২.৯১ শতাংশ।

মাউশি অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেসব প্রকল্প এডিপির অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে, তাদের আমরা নানা পরামর্শ দিচ্ছি। মাউশি মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে মাসিক সভায়ও তাদের অগ্রগতির ব্যাপারে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। দু-একটি প্রকল্প জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় পিছিয়ে আছে। শেষ সময়েই ব্যয় করতে হয় উপবৃত্তিসহ বেশ কিছু প্রকল্পের অর্থ। ফলে শেষ দিকে এসে ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। আমরা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অর্থ ব্যয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।’

জানা যায়, সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় আছে ন্যাশনাল একাডেমি ফর অটিজম ও নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিস-এবিলিটিস (এনএএএনডি) প্রকল্প। ওই প্রকল্পে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৮.২৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে পেরেছে। প্রকল্পের মূল কাজ ছিল একটি অটিস্টিক একাডেমি স্থাপন করা। কিন্তু তিন বছর পর এসে শুধু জমি অধিগ্রহণ করতে সমর্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষ, যদিও সম্প্রতি এ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) পরিবর্তন করা হয়েছে।

আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রচলন (পর্যায়-২) প্রকল্পের অগ্রগতিও খুবই খারাপ। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ওই প্রকল্পে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১২.৬৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে পেরেছে কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের মূল কাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। কিন্তু মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম কিনতে গিয়ে আর্থিক নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো কম্পিউটারসামগ্রী কেনা শুরু করাই সম্ভব হয়নি। গত বছরের শেষ দিকে তাঁকে সরিয়ে নতুন পিডি নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও কাজে গতি আসেনি।

ঢাকা শহরের নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পে চলতি অর্থবছরের আট মাসে অর্থ খরচ হয়েছে মাত্র ০.৭৬ শতাংশ। এখন পর্যন্ত মাত্র একটি স্কুলের জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে সমর্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে এ প্রকল্প শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে ঠিকই মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরে কোনো নজরই ছিল না সরকারের। অনেক ভবন জরাজীর্ণ হয়ে যাওয়ায় ক্লাসরুমেরও সংকট দেখা দিয়েছিল। অবশেষে হাতে নেওয়া হয় ‘সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহের উন্নয়ন প্রকল্প’। কিন্তু যত আশা নিয়ে প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল তার প্রতিফলন নেই বললেই চলে। সূত্র মতে, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আর্থিক ব্যয়ের অগ্রগতি ২.৯১ শতাংশ। এত দিনেও দরপত্র আহ্বানই করতে পারেননি প্রকল্প পরিচালক।

দিন দিন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। এ জন্য সরকারি কলেজগুলোতে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ নামে একটি প্রকল্প আছে। কিন্তু চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে মাত্র ০.৮৫ শতাংশ অর্থ। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল ২০০ সরকারি কলেজে রাজস্ব বাজেটের আওতায় বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষকের আট হাজার ৬৫২টি পদ এবং ৪৭টি হোস্টেলের জন্য ৬২৫টি কর্মচারীর পদ সৃজন। একই সঙ্গে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিসহ ভবন নির্মাণ। কিন্তু এখনো কোনো কাজই শুরু হয়নি। চলতি অর্থবছরে এ প্রকল্প থেকে বরাদ্দ হ্রাসেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এমনকি স্বয়ং প্রকল্প পরিচালকই তাঁর সামনে নানা চ্যালেঞ্জ থাকার কথা জানিয়েছেন এডিপি বাস্তবায়ন সভায়।

‘তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নির্বাচিত বেসরকারি কলেজসমূহের উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের ৪৪.১৯ শতাংশ টাকা খরচ হলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে গত ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ আছে প্রকল্পের কেনাকাটায়। নিম্নমানের আসবাব ও কম্পিউটারসামগ্রী সরবরাহ করার অভিযোগ উঠেছে। তবে নতুন মন্ত্রী আসার পর গত মাসের শেষে প্রকল্প পরিচালককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সিন্ডিকেট ভেঙে নতুন পরিচালকের পক্ষেও যথাসময়ে প্রকল্প শেষ করা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

এ ছাড়া মাধ্যমিক শিক্ষা উপবৃত্তি প্রকল্প, পর্যায়-২-এ গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ১.১২ শতাংশ অর্থ। গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসের উপবৃত্তির টাকা ছাড় না করায় অর্থ ব্যয় সম্ভব হচ্ছিল না বলে সর্বশেষ এডিপি বাস্তবায়ন সভায় জানান প্রকল্প পরিচালক।

একাধিক সাবেক পিডি জানান, বর্তমানে যাঁরা প্রকল্পগুলোর পরিচালকের দায়িত্বে আছেন, তাঁদের অনেকের দক্ষতা ও পারদর্শিতার অভাবেই কিছু প্রকল্প ঝুলে গেছে।

 


খবরটি ইউনিকোড থেকে বাংলা বিজয় ফন্টে কনভার্ট করা যাবে কালের কণ্ঠ Bangla Converter দিয়ে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা