kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি

মৃত্যুর দুয়ার থেকে বেঁচে ফিরলেন ১৫ প্রবাসী

হায়দার আলী   

২২ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মৃত্যুর দুয়ার থেকে বেঁচে ফিরলেন ১৫ প্রবাসী

পরিবারের সুখের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লিবিয়া থেকে নৌপথে ইতালি রওনা হয়েছিলেন আব্দুল মতিন। অর্ধশত বাংলাদেশিসহ ৭০ জন আরোহী নিয়ে প্লাস্টিকের নৌকাটি যাত্রার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই ডুবে যায় সাগরে। চোখের সামনেই পরিচিত বেশ কয়েকজনকে পানিতে তলিয়ে যেতে দেখেন আব্দুল মতিন। সাগরের উত্তাল ঢেউ মোকাবেলা করে তীব্র ঠাণ্ডা পানিতে কোনো মতো ভেসে ছিলেন আব্দুল মতিন। ভাগ্য ভালো, তিউনিশিয়ার কাছাকাছি সাগরে জেলেরা দেখতে পেয়ে তাদের উদ্ধার করে।

লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে তিউনিশিয়ার উপকূলবর্তী ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীবাহী নৌকাডুবির ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া ১৫ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে টার্কিশ এয়ারলাইনসের টিকে-৭১২ ফ্লাইটে তাঁরা ঢাকায় পৌঁছান।

গতকাল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে আনুষ্ঠানিকতা শেষে বাড়ি ফেরার সময় কথা হয় আব্দুল মতিনের সঙ্গে। সেই রাতের ঘটনার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, ‘অনেককেই চোখের সামনে পানিতে তলিয়ে

যেতে দেখিছি। বেঁচে দেশে ফিরতে পারব ভাবিনি। আর কেউ যেন এভাবে দালালদের কথায় সাগরপথে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা না করে।’

পরিবারের লোকজন জানায়, সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জের গুরুনগর গ্রামের নুর মিয়ার ছেলে আব্দুল মতিন। চার সন্তানের এই জনক পরিবারে সচ্ছলতা আনতে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দালাল রফিক মিয়ার প্ররোচনায় পড়ে গত বছরের মে মাসে পাড়ি দেন লিবিয়ায়। দেশ ছাড়ার আগেই দালালকে নগদ দিতে হয় পাঁচ লাখ টাকা। লিবিয়া পৌঁছানোর পর কয়েক দফায় দিতে হয়েছে আরো দুই লাখ ২০ হাজার টাকা। লিবিয়ায় একটি বাড়িতে আটকে রেখে ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হতো না। আরো টাকার জন্য লিবিয়ার দালাল মোহাম্মদ আলী প্রায়ই তাঁকে মারধর করত।

আব্দুল মতিনের স্ত্রী রোজিনা আক্তার কাঁদতে কাঁদতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই ছেলে আর দুই মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে ইতালি যেতে চেয়েছিলেন তিনি। এখন বাচ্চার বাবাই যদি বেঁচে না থাকে তাহলে বিদেশে দিয়ে কী হবে! সাড়ে সাত লাখ টাকা গেছে, জমিজমা সব কিছুই বিক্রি করে দিয়েছি। তার পরও যে আমার স্বামী বেঁচে আমাদের কাছে ফিরে এসেছে এটাই আল্লাহর দরবারে হাজার শুকরিয়া।’

আব্দুল মতিনের মতো নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরে এসেছেন কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার শম্ভুপুর গ্রামের সুরুজ মিয়ার ছেলে আমির হোসেন। মা-বাবা হারানো আমির হোসেন সৌদি আরবে কয়েক বছর থেকে দালালদের প্ররোচনায় পড়ে দেশে ফেরত আসেন। গত বছরের মে মাসে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার বৈরাগী এলাকার দালালের মাধ্যমে নগদ পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে পাড়ি দেন লিবিয়ায়। দালালদের সঙ্গে কথা ছিল ইতালি যাওয়ার পর পুরো টাকা দিতে হবে। কিন্তু লিবিয়ায় যাওয়ার পর সেখানেও টাকার জন্য মারধর করে দালালরা। নিরুপায় হয়ে দুই শতাংশের ভিটেবাড়ি বন্ধক দিয়ে আরো দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা তুলে দেন লিবিয়ার আলী দালালের বাংলাদেশি স্বজনদের কাছে। শেষ পর্যন্ত বেঁচে দেশের মাটিতে ফিরে এসেছেন—এটা যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না আমির হোসেন। মোবাইল ফোনে এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘পানিতে সাঁতরাতে সাঁতরাতে আর পারছিলাম না। মনে করছিলাম আর পৃথিবীর আলো দেখতে পারব না। ওই সময় মাছ ধরার নৌকায় করে কিছু মানুষ আমাদের প্রাণে বাঁচিয়েছে। বেঁচে আছি এটাই বড়। আর কিছু এখন বলতে পারছি না। সেসব কথা মনে হলেই বুকটা কেঁপে ওঠে।’ আমির হোসেনের স্ত্রী স্বপ্না আকতার বলেন, ‘আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, জীবন নিয়ে ফিরেছেন। আমার স্বামীর সঙ্গে থাকা অনেকের লাশটাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।’

আব্দুল মতিন ও আমির হোসেন ছাড়াও গতকাল একই ফ্লাইটে যাঁরা দেশে ফিরে এসেছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার রাশেদ মিয়া ও সজীব মিয়া, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের ইরফান চৌধুরী, মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার খাইন বিজয়, সিলেট সদর উপজেলার রুবেল আহম্মেদ, সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জের আনোয়ার হোসেন হাসান ও ইকবাল হোসেন, সিলেট সদরের সাইদুল ইসলাম ও বিশ্বনাথ উপজেলার মাসুম মিয়া এবং গাজীপুর মহানগরের বোর্ডবাজারের সেন্টু চন্দ্র সাহা।

ভৈরবের পঞ্চবটি গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে ইরফান চৌধুরী গত বছরের মে মাসে ছয় শতাংশ জমি বিক্রি করে গিয়েছিলেন লিবিয়া। ভৈরবের জগন্নাথপুরের তাতারকান্দির দালাল জুয়েল মিয়ার মাধ্যমে লিবিয়া থেকে ইতালি যেতে চেয়েছিলেন। ছেলে দেশে ফেরার পর আবেগতাড়িত কণ্ঠে দরিদ্র বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘যাওয়ার সময় নিল ৫০ হাজার টাকা, যাওয়ার পর নিল চার লাখ টাকা। আমার টাকা গেছে যাক। আল্লাহ পোলারে আমার বুকে ফেরত তো দিয়েছে।’

দেশে ফেরত আসার পর সেন্টু সাহার স্ত্রী অঞ্জনা রানী বলেন, ‘দেশে ফুটপাতে ফেরি করে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতেন তিনি। দালালদের কথায় জমি বিক্রি করে ৯ লাখ টাকা দিয়ে লিবিয়া যায়। সেখান থেকে ইতালি যাওয়ার কথা ছিল। তবু ভালো যে ভাগ্যক্রমে বাচ্চার বাবা বেঁচে ফিরে এসেছে।’

আইওএমের কমিউনিকেশন অফিসার মো. আসিফ বলেন, ‘ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে বেঁচে যাওয়া ১৫ জন প্রবাসী ফেরত এসেছেন। মোটামুটি সবাই সুস্থ আছেন। দু-একজনের পায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। আমাদের তিউনিশিয়ার টিম সেখানে হেলথ চেকআপ করেছে। এখন আইওএমের পক্ষ থেকে তাঁদের বাড়ি ফেরার বিষয়ে কিছু সহায়তা করা হবে। পরবর্তী সময়ে তাঁদের কিভাবে সহযোগিতা করা যায় তা দেখা হবে।’

বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহকারী পরিচালক তানভীর আহমেদ গতকাল বলেন, ‘১৫ প্রবাসীই তিউনিশিয়া থেকে ফেরত এসেছেন। বিকেল পর্যন্ত ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া চলে। আইওএম এবং ব্র্যাক তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা করে। তিউনিশিয়া থেকেও কিছু আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে।’

মন্তব্য