kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

জনশক্তির বাজারে নামছে অন্ধকার

নতুন শ্রমবাজার খুলছে না, একে একে বন্ধ হচ্ছে পুরনো বাজার

হায়দার আলী   

২১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জনশক্তির বাজারে নামছে অন্ধকার

ধীরে ধীরে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির বাজারে যেন অন্ধকার নেমে আসছে। নতুন শ্রমবাজার খোলা তো দূরের কথা, পুরনো শ্রমবাজারই একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, লেবাননসহ কয়েকটি দেশে জনশক্তির বাজার এখন প্রায় বন্ধ আছে। আর ওমান, কাতার, জর্দানের মতো শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর হার এখন তলানিতে ঠেকেছে। এ অবস্থায় কর্মী যাওয়ার পুরো চাপ সৌদি আরব, ওমান ও কাতারে। কিন্তু এই তিনটি দেশ আগের মতো শ্রমিক নিতে পারছে না। লাখ লাখ টাকা খরচ করে সেখানে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়াসহ নানা কারণে অনেকেই খালি হাতে দেশে ফিরছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দাসহ নানা কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভুগতে হচ্ছে। সম্প্রতি যেসব কর্মী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গেছে, তারা কাজ না থাকা, ফ্রি ভিসার নামে প্রতারণা, আকামা না দেওয়া, প্রতারণাসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। সৌদি আরব ও মালয়েশিয়াতেই পাঁচ লাখের বেশি শ্রমিক অবৈধ হয়ে অমানবিক জীবন যাপন করছে।

এদিকে অবৈধ পথে কর্মী যাওয়া আগের চেয়ে বেড়েছে। প্রবাসী শ্রমিক, দেশে ফেরত আসা শ্রমিক ও বিএমইটির তথ্য এবং অভিবাসী বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

শ্রম অভিবাসন বিশ্লেষক হাসান আহমেদ কিরণ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুবাইয়ে কর্মীর চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশ থেকে না নিয়ে ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা থেকে কর্মী নেওয়া হচ্ছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমিরাতের মতো বড় একটি শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানো শুরু করতে পারিনি। আমরা মনে করি, এ জন্য শুধু কূটনৈতিক তৎপরতা দিয়েই হবে না, রাজনৈতিক তৎপরতাও লাগবে।’ তিনি বলেন, কুয়েতের শ্রমবাজারে অজ্ঞাত কারণে কর্মী পাঠানো বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব, কাতার ওমানে কর্মী গিয়েও ভালো বেতন পাচ্ছে না। আকামা পরিবর্তনের নামে কষ্টের শিকার হচ্ছে। ছয় থেকে সাত লাখ টাকায়

সৌদি আরব গিয়ে কষ্টে আছে শ্রমিকরা। ‘সৌদিকরণের’ কারণে স্থানীয় নাগরিকরা কাজে যোগদান করায় বাংলাদেশি অনেকেই বেকার হয়ে পড়ছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘প্রচলিত শ্রমবাজারের ওপরই এখনো নির্ভরশীল আমরা। সাত থেকে আট বছর ধরেই নতুন বাজার খুঁজতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার, কিন্তু আশার আলো নেই সেভাবে। একটি নতুন বাজারও খুলতে পারেনি। উল্টো পুরনো মার্কেটগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে।  সৌদি আরবের বাজারটি এখন নানা সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, আরব আমিরাতের বাজার ছয় ধরে বন্ধ, মালয়েশিয়ার বাজারটিও বন্ধ। এটা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।’

অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক বলেন, ‘রিক্রুটিং এজেন্সির ভিসা কেনাবেচার কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে অভিবাসন ব্যয় অনেক গুণ বেশি। পুরো রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়াটি আনইথিক্যালি চলছে। সিন্ডিকেটের কারণে মালয়েশিয়ার বাজারটি বন্ধ হয়ে গেছে। আরব আমিরাতের বাজারটিও একটি সিন্ডিকেট দখলে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।’ তিনি বলেন, ‘বৈধভাবে শ্রমিক যেতে না পারলে সমুদ্রপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ দেশের বাইরে যেতে চাইবে, সরকারের উচিত এই সেক্টরের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া।’

অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘এশিয়ার অন্য অনেক দেশ কম শ্রমিক বিদেশে পাঠালেও রেমিট্যান্স পাচ্ছে বেশি। কিন্তু দ্বিগুণের বেশি শ্রমিক পাঠিয়েও আমরা রেমিট্যান্স পাচ্ছি কম, কারণ অদক্ষ শ্রমিক যাচ্ছে বেশি। অদক্ষ শ্রমিক বিদেশে গিয়ে পদে পদে হয়রানি ও শোষণের শিকার হচ্ছে। কম মজুরিতে নিয়োগ, নিচু পদে কাজ করা, এমনকি চাকরিচ্যুত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত টিকতে না পেরে অনেককেই দেশে ফিরে আসতে হচ্ছে।’

বিএমইটি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে কর্মী গেছে দুই লাখ ২৬ হাজার ৭৭১ জন। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই গেছে এক লাখ ২৩ হাজার ৪৭৪ জন, যা বিদেশে যাওয়া মোট শ্রমিকের ৫৪ শতাংশ। সৌদি আরবের পরই গত চার মাসে বেশি কর্মী গেছে কাতারে, ২৮ হাজার ১৬৯ জন, যা শতকরা ১২ ভাগের বেশি। এর পরই ওমানে ২৬ হাজার ৪৪৪ জন। তবে এক বছর আগের হিসাবের চেয়ে এই দেশগুলোতে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা অনেক কমে গেছে।

বিএমইটির তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে কর্মী যায় পাঁচ লাখ ৫১ হাজার ৩০৮ জন, কুয়েতে ৪৯ হাজার ৬০৪ জন, ওমানে ৪৯ হাজার ৭৪, কাতারে ৮২ হাজার ১২ জন, বাহরাইনে ১৯ হাজার ৩১৮ জন, মালয়েশিয়ায় ৯৯ হাজার ৭৮৭ এবং সিঙ্গাপুরে ৪০ হাজার ৪০১ জন।

পুরুষ কর্মীর পাশাপাশি সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে নারী কর্মীরাও যাচ্ছে। চলতি বছরের চার মাসে ৪৫ হাজার ২৯০ জন নারী কর্মী গেছে বিভিন্ন দেশে। সবচেয়ে বেশি গেছে সৌদি আরবে—প্রায় ২৯ হাজার ৯০৪ জন। নারী কর্মীদের ৬৬ শতাংশই যাচ্ছে সৌদি আরবে। জর্দান, ওমান ও কাতারেও নারী কর্মীরা যাচ্ছে, কিন্তু সৌদি আরবসহ অন্য দেশগুলোতে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতি মাসেই দেশে ফিরে আসছে নারী কর্মীরা। তাদের কাছ থেকে জানা যাচ্ছে দালালদের প্রতারণা এবং নিয়োগকর্তার ভয়ংকর নির্যাতনের কাহিনী।

চলতি মাসেই সৌদি আরব ও মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফেরত আসা কুমিল্লার দাউদকান্দির আব্দুর রহিম, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের গোড়াই এলাকার নুরুল মোল্লা এবং নরসিংদীর রায়পুরার মিজানুর রহমানসহ সাতজনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁদের সবাই প্রতারণা শিকার এবং বেতন না পাওয়াসহ নানা নির্যাতনের কথা বলেছেন। তাঁরা জানান, দালালদের প্রতারণার কারণে মহাবিপদে পড়েছিলেন তাঁরা। যে কাজ কিংবা যে কম্পানিতে চাকরি দেওয়ার কথা সেখানে না দিয়ে কঠিন ও ভিন্ন কাজ দেওয়া হয় তাঁদের। কেউ কেউ অনেক মাস কাজ করলেও মালিক ঠিকমতো বেতন দেয়নি। আকামা করার কথা বলেও আকামা করে দেয়নি, ফ্রি ভিসায় গিয়ে তাঁরা পড়েছিলেন চরম বিপাকে।

এমন নানা প্রতারণার শিকার হয়ে চলতি বছরের চার মাসেই পাঁচ হাজারের বেশি শ্রমিক খালি হাতে দেশে ফিরেছে। বিমানবন্দরে ফেরত আসা অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা ব্র্যাকের কর্মকর্তা আল আমিন নয়ন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খালি হাতে প্রতিদিনই সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীরা ফেরত আসছে। অসহায় এমন এক হাজারের বেশি কর্মীকে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হয়েছে।’ 

জনশক্তি রপ্তানিকারক সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব মনসুর আহমেদ বলেন, ‘সৌদিকরণের কারণে ১২ ক্যাটাগরিতে প্রবাসী শ্রমিক নিষিদ্ধ, আকামা ফি বাড়ানোর ফলে যারা ছোট ব্যবসা ও দোকান করত তারা অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে দেশে চলে আসছে। কাতারে অবরোধের কারণেও সেখানে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কর্মী নেওয়ার পরিমাণ কমে গেছে। কুয়েতের বাজার বন্ধ এবং মালয়েশিয়ার বাজারেও কর্মী পাঠানো বন্ধ।’ 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বায়রার একজন সাবেক সভাপতি বলেন, ‘নতুন বাজার খোলার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা গত কয়েক বছরে কয়েক কোটি টাকা খরচ করলেও ফলাফল যেন শূন্য। এখন পর্যন্ত একটি নতুন শ্রমবাজারের দেখা মেলেনি।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা