kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

সরকারি হাসপাতাল

বৈকালিক সেবা চালু করা নিয়ে টালবাহানা!

তৌফিক মারুফ   

১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বৈকালিক সেবা চালু করা নিয়ে টালবাহানা!

কবিরুল ইসলাম তাঁর বাবাকে নিয়ে সকাল সাড়ে ১০টায় সাভারের হেমায়েতপুর থেকে রওনা দিয়ে রাজধানীর মহাখালী ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পৌঁছেন দুপুর দেড়টায়। এবাস-ওবাস করে, যানজট ঠেলে হাসপাতালে পৌঁছতে তাঁর এতটা সময় পার হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছে আউটডোরের টিকিট কাউন্টারে কর্তব্যরত কর্মচারীর মুখে শুনলেন ‘টিকিট কেটে কী লাভ! আজ আর দেখাতে পারবেন না। এরই মধ্যে যে পরিমাণ রোগী টিকিট কেটেছেন, আড়াইটার মধ্যে তাঁদেরই দেখা শেষ করা যাবে না, বরং আজ চলে যান। কাল আবার আসেন।’

কবিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই কথা শুনে কিছুক্ষণ অনুনয়-বিনয় করলাম, আবার কিছুক্ষণ রাগারাগিও করলাম। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। সকালের মতো বিকেলেও যদি আউটডোর ব্যবস্থা থাকত, তাহলে আমাদের এমন হয়রানির শিকার হতে হতো না।’

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে না পেরে ফিরে যাওয়া আকতার হোসেন নামে আরেক রোগীর স্বজন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অফিসের ফাঁকে হুড়াহুড়ি করে দুপুর ১টার সময় হাসপাতালে গিয়ে শুনলাম, ওই দিন আর পরীক্ষা হবে না। হাসপাতালের লোকজন বলল, সিরিয়াল যা আছে, তা আগে শেষ করতে হবে। নতুন সিরিয়াল দিলে সময়ে কুলাবে না। আড়াইটার পর আউটডোরে আর পরীক্ষা হয় না।’

এভাবে প্রতিদিন ঢাকাসহ দেশজুড়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বহু রোগী হয়রানির শিকার হয়ে ফিরে যাচ্ছে সময়ের কারণে। অন্যদিকে দিনে দিনে হাসপাতালগুলোতে বেড়েই চলছে রোগীর ভিড়। রোগীর ভিড়ের এই প্রভাব পড়ছে আউটডোরে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপরও। মাত্র ছয় ঘণ্টা সময়ে অসংখ্য রোগী দেখতে হয় কর্তব্যরত চিকিৎসককে। এর মধ্যে চিকিৎসকদের দাপ্তরিক কাজও করতে হয়। কারো থাকে কলেজে ক্লাস, কারো থাকে মিটিং, কাউকে আবার ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে যেতে হয় রোগী দেখতে। এ ছাড়া সার্জারির অনেককে জরুরি প্রয়োজনে অনির্ধারিত অপারেশনে অংশ নিতে হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে অপেক্ষমাণ সব রোগী দেখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এমন পরিস্থিতি উত্তরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি নির্দেশনা দিয়েছেন সব সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের বিকেলে হাসপাতালেই প্র্যাকটিস করতে। গত ১২ মার্চ একনেকের সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে যাতে চিকিৎসকরা একটা উইং (শাখা) নিয়ে বসে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারেন, সেভাবেই হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। বারডেমে একটা উইং আছে, স্পেশালিস্ট ডাক্তাররা বসেন। আমরা কেন এটা করব না!’

পরিকল্পনামন্ত্রী আরো বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, চিকিৎসক ও রোগীরা বাইরে বাইরে দৌড়ায়। হাসপাতালেই তাদের একটা সুন্দর জায়গা করে দেন। এখানেই তারা প্র্যাকটিস করুক, যাতে চিকিৎসকদের বাইরে যেতে না হয় এবং রোগীরাও সরকারি হাসপাতালের সেবা পাক।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে বহির্বিভাগে ‘বৈকালিক স্পেশালাইজড কনসালটেশন সার্ভিস নামে’ একটি সেবা চালু আছে। নির্দিষ্ট বিভাগের জন্য ২০০ টাকায় টিকিট কেটে বিকেলে বহির্বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন রোগীরা।  

স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে চিকিৎসকদের বেপরোয়া প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ে সমালোচনা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে রোগীদের বঞ্চিত করে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বাইরের অন্য হাসপাতাল-ক্লিনিকে দুপুরের পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রাইভেট প্র্যাকটিস করায় বরাবরই তোপের মুখে পড়েন সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলের।

সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিজ নিজ হাসপাতালে বৈকালিক সেবা দেওয়ার বিষয়টি আবারও আলোচনায় উঠে আসে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকে তোড়জোড় শুরু হয় পরিকল্পনা প্রণয়ন কৌশল নিয়ে। আর এটি করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষের নজরে আসে প্রয়োজনীয় জনবল ও অর্থের জোগানের বিষয়টি। ফলে আপাতত এই কার্যক্রমের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কাজ হচ্ছে। সেই সঙ্গে অন্য দেশের মতো এ দেশের চিকিৎসকদেরও ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস সিস্টেমের মধ্যে আনতে পথ খোঁজা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা দেওয়ার আগেই আমরা কয়েক বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে ১০টি সরকারি হাসপাতালে বৈকালিক আউটডোর সেবা কার্যক্রম শুরু করেছিলাম। নানা সমস্যার কারণে যদিও বর্তমানে সব কটিতে সেটি ভালোভাবে কার্যকর নেই।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে আমরা অন্যান্য দেশের মতো মূলত ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের পরিকল্পনা করছি। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি হাসপাতালের চিকিৎসক রোস্টার অনুসারে হাসপাতালেই অতিরিক্ত সময়ে রোগী দেখবেন। তাঁরা বাইরে প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। আর অতিরিক্ত সময়ে হাসপাতালে প্র্যাকটিসের জন্য সেবাগ্রহীতা রোগীরা যে ফি দেবে, তা ওই চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মীদের মধ্যে স্তর অনুসারে ভাগ করে দেওয়া হবে প্রণোদনা হিসাবে। এতে রোগীরা সরকারি হাসপাতালে বিকেলের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা পাবে বাইরের চেম্বারের মতোই।’

যদিও চিকিৎসকদের সর্বজনীন সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন সেটা সব হাসপাতালে বৈকালিক সেবা কিংবা হাসপাতালেই প্রাইভেট প্র্যাকটিসের নির্দেশনা বলে আমি মনে করি না। আমার মনে হয় তিনি শুধু মাঠপর্যায়ে চিকিৎসকদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধার কথা বলেছেন, যাতে ওই চিকিৎসকরা অফিস টাইমের পরে হাসপাতালে একটা বসার জায়গা বা ক্যান্টিনের মতো কিছু একটা পান।’ তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে বৈকালিক সেবা চালু সহজ কথা নয়। এটা করার আগে বহু রকম সমস্যার সমাধান করতে হবে। কারণ আমাদের দেশে এ বিষয়ে কোনো আইন নেই। আইন না করে এটা করা যাবে না। চিকিৎকদের বর্ধিত সময়ের জন্য বেতন-ভাতা, অন্য কর্মচারীদের ব্যবস্থাপনাসহ অনেক জটিলতা রয়েছে। এসব সম্পন্ন করে তবেই ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের কথা ভাবা যেতে পারে। আর অবশ্যই এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে হবে।’

চিকিৎসকদের আরেক সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের পরিকল্পনা ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাকে আমরা অবশ্যই ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। এটি কার্যকর করা খুবই জরুরি। কারণ এতে শুধু রোগীদেরই সুবিধা হবে না, সঙ্গে মানুষের কাছে চিকিৎসকদের মর্যাদা ও আস্থা বাড়বে। তবে এই কার্যক্রম চালুর আগে প্রয়োজনীয় একটি নীতিমালা করে ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করতে হবে। শুধু নির্বাহী আদেশে এটি শুরু করলে তা টেকসই না হয়ে বরং আরো বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যে পরিকল্পনা করছি, সেখানে এসব জটিলতা সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কারণ সম্ভাব্য সমস্যা কাটানোর পথ তৈরি না করে আগেই ব্যবস্থা চালু করলে তা টেকসই করা যাবে না। তাই আমরা আগে জনবল ও অর্থের জোগান কিভাবে সমন্বয় করা হবে, রোগীদের কাছ থেকে যে ফি নেওয়া হবে, তাতে বর্ধিত খরচ সংকুলান হবে কি না—এসব সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখছি।’

এদিকে ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের ব্যবস্থা কার্যকর করার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা জানান, যেসব দেশে ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের ব্যবস্থা কার্যকর আছে, সেসব দেশে আগে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় স্বাস্থ্যবীমা কার্যকর করা হয়েছে। যে ব্যবস্থায় দেশের একেবারে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী বাদে উপার্জনশীল প্রত্যেক নাগরিক তাঁর আয়ের গড় হার অনুসারে স্তরবিন্যাসের মাধ্যমে নিয়মিত স্বাস্থ্য বীমায় সাপ্তাহিক, মাসিক বা বার্ষিক প্রিমিয়াম দিয়ে থাকেন। এই প্রিমিয়ামের টাকা সরকারি কোষাগারে চলে যায়। আর যখনই যাঁর চিকিৎসার প্রয়োজন হবে তিনি হাসপাতালে গিয়ে তাঁর নির্দিষ্ট কার্ড দেখিয়ে বিনা খরচে চিকিৎসা করাতে পারেন। ওই রোগীর চিকিৎসা বাবদ খরচের টাকা পরিশোধ করা হয় সরকারের স্বাস্থ্য বীমা স্কিম থেকে। ফলে চিকিৎসকদের আর বাইরে প্র্যাকটিস করতে হয় না। তাঁরা হাসপাতালের মাধ্যমে সরকারের কাছ থেকে বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা