kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

আমাকেও দালালরা শার্ট ধরে টেনে নিয়ে যায় : পরিচালক

চা দোকানের নামে দালালদের ‘অফিস’

জহিরুল ইসলাম   

১৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




আমাকেও দালালরা শার্ট ধরে টেনে নিয়ে যায় : পরিচালক

রাজধানীর শ্যামলী শিশু মেলার সামনের রাস্তা দিয়ে আগারগাঁও বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের সামনের সড়কে নামতেই এ প্রতিবেদককে ঘিরে ধরল কয়েকজন। একেকজনের একেক প্রশ্ন, ‘ভাই, পাসপোর্ট করতে আইছেন?’, ‘ভাই রিনিউ করবেন?’, ‘ভাই ফরম পূরণ করতে পারতাছেন না?’, ‘আপনার বাসা দূরে, আসতে পারবেন না?’ এ রকম ডজনখানেক প্রশ্ন। এর মধ্য থেকে আকরাম নামের এক দালাল বলে উঠলেন, ‘আরে ভাই, সমস্যা কোনো ব্যাপার না। কোনো সমস্যা নাই, খালি টাকা দিয়া ছবি আর ফিঙ্গার দিয়া চইলা যাইবেন। পুলিশও যাইবো না আপনার বাড়ি। এই দিক থেইক্কা সব ম্যানেজ হইয়া যাইবো। তয় ইমার্জেন্সি করলে ১৫ হাজার আর নরমাল করলে আট হাজার (টাকা) দিলেই হইবো। আর না আসতে পারলেও কোনো সমস্যা নাই, বাড়ি চইলা যাইবো। বাড়তি ফি যোগ কইরা দিবেন।’

সরেজমিনে পরিস্থিতি জানার জন্য গত বুধবার আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে গেলে এমন অসংখ্য প্রস্তাব পাওয়া গেল দালালদের কাছ থেকে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর পৌনে ১টা পর্যন্ত। পাসপোর্ট অফিসের সামনের রাস্তা, ফটক, ফরম জমা দেওয়ার স্থান, মূল ভবনের লিফটের আশপাশেসহ বিভিন্ন জায়গায় তাদের অবস্থান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় অর্ধশত দালাল এই অফিসের সামনে চা দোকানের নামে রীতিমতো অফিস খুলে বসেছে। ‘লৌকিক নজরদারির’ কারণে দালালরা এখন ভেতরে ঢুকতে না পারলেও ভেতরের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগের কাজটি করে দিচ্ছেন আনসার ও পুলিশ সদস্যরা।

ভুক্তভোগী, দালাল ও পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মূলত স্বাভাবিক উপায়ে এবং নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট পাওয়া যায় না বলেই মানুষ বাধ্য হয়ে দালাল ধরে। দালাল না ধরলে ফরমে ধরা হয় নানা ত্রুটিবিচ্যুতি। পরিস্থিতি এমন জটিল করে রাখা হয়েছে যে এক মাসেও জরুরি পাসপোর্ট পাচ্ছে না আবেদনকারীরা। ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, ভেতরের লোকজনের সঙ্গে যোগসাজোশ না থাকলে দালালরা কিভাবে এত গ্যারান্টি দিয়ে দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছে? ফলে অফিসের বাইরে ‘এই দালালদের থেকে সাবধান থাকুন’ বলে তাদের ছবি ঝোলানো থাকলেও এর নিচে দাঁড়িয়েই তারা দাপটের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যায়।

এ বিষয়ে ঢাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘কী করব, তাদের জন্য মাথা আর ঠিক রাখতে পারছি না। পুলিশ সদস্য সব সময় এখানে থাকে। তাদের সামনেও যদি সাধারণ মানুষকে নিয়ে এভাবে টানাটানি করে, কী বলব! আপনারা তথ্য দিয়ে সহায়তা করলে ব্যবস্থা নিতে পারি।’

পরে পরিচালককে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে দালালদের কথোপকথন এবং কিছু ভিডিও চিত্র দেখানো হলে তিনি তাত্ক্ষণিক র‌্যাব-২-এ ফোন করে দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন। অনুরোধ রক্ষা করে র‌্যাব জানিয়েছে, আজ বৃহস্পতিবার থেকে র‌্যাব টহলে নামবে। এ সময় পরিচালক অভিযুক্ত এক পুলিশ সদস্য ও এক আনসার সদস্যকে ডেকে আনেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান। একপর্যায়ে তিনি বলেন, অফিসের কাছে রাস্তায় যানজটের কারণে তিনি প্রায়ই গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে অফিসে ঢোকেন। তখন দালালরা তাঁকেও নানা প্রস্তাব দেয়। তিনি বলেন, ‘আমাকেও গতকাল (মঙ্গলবার) দালালরা শার্ট ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। পরে পুলিশে দিয়ে দিয়েছি। যাদের নাম পেলাম, সবাইকে আটক করে আপনাকে আবার খবর দেব, ছবি নিয়ে যাবেন।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের সামনের রাস্তা এবং আগারগাঁও সড়কের দক্ষিণ পাশে বসা ফটোকপি থেকে শুরু করে সব জায়গায় দালালদের ছড়াছড়ি। নামে ‘চা’ দোকান হলেও এগুলো সবই দালালদের অনির্ধারিত অফিস। রাস্তা থেকে পাসপোর্ট করতে আসা মানুষকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে দোকানে নিয়ে ফরম পূরণ, দ্রুত দেওয়ার বায়নায় প্রথম থেকেই টাকা খসানো শুরু করে এসব দালাল।

গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই প্রতিবেদকের পাসপোর্ট করানোর কথা বলে পৃথক তিনটি চুক্তি হয় তিন দালাল আর এক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে। এর মধ্যে আকবর নামের এক দালাল ১৪ হাজার টাকায় জরুরি পাসপোর্ট করিয়ে দেবেন বলে প্রস্তাব দেন। সিরাজ নামের এক দালাল একই প্রস্তাব দেন ১৩ হাজার টাকায়। মাফিয়া খাতুন নামের এক নারী দালাল প্রস্তাব দেন, ১১ হাজার টাকায় মাত্র ১৫ দিনে পাসপোর্ট করিয়ে দেবেন। পরে দুপুর ১২টার দিকে পাসপোর্ট ফরম জমা দেওয়ার কথা বললে এক আনসার সদস্য জানালেন ‘আজ আর কাগজ জমা দেওয়া যাবে না।’ তখন সামনে দাঁড়ানো পুলিশ সদস্য শামীম বলেন, ‘দালালটালাল ধরার দরকার নাই। আমি কইরা দিমু কাইলকা নিয়া আসবেন।’ ঠিক এর পরেই কাইয়ুম নামের এক দালাল এসে বললেন, ‘এখনই কিসের বন্ধ! আপনি এহন সব কাগজ নিয়া আসেন। ছবি তোলার ব্যবস্থা আমি করছি। ১৫ হাজার টাকা দিবেন। সব ওকে।’

দেরিতে পাসপোর্ট পাওয়া প্রসঙ্গে মশিউর রহমান নামে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, গত ১৬ এপ্রিল তিনি জরুরি পাসপোর্টের জন্য টাকা জমা দেন। ২৮ তারিখ দেওয়ার কথা থাকলেও গতকাল ১৫ মে পর্যন্ত তিনি পাসপোর্ট পাননি।

গতকাল আফরাফুল আলম নামে প্রায় ৮০ বছরেরও বেশি বয়সের এক ব্যক্তি তাঁর সহকারীকে নিয়ে মিরপুর থেকে এসেছেন পাসপোর্ট রিনিউ করাবেন বলে। গাড়ি থেকে নামতেই হায়দার, শরীফ, সিরাজ, মাফিয়া খাতুন নামে কয়েকজন বৃদ্ধ মানুষটিকে নিয়ে টানাটানি শুরু করেন। একপর্যায়ে বয়স, ঝামেলা আর সময়ের কথা চিন্তা করে তিনি এক দালালকে ৫০০ টাকা দিতে রাজি হন।

আজাদ নামে এক দালাল এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের এহন আর ভেতরে ঢুকতে দেয় না। আমাগো কয়েকজনের ছবিও ঝুলাইয়া দিছে। তাই আনসার আর পুলিশগো দিয়া ভেতরে পাঠাই। তয় অফিসারগো নাম জানি না। গেইটে আনসার হেমায়েত আর ভেতরে কাইয়ুমসহ কয়েকজন নিয়া যায়।’

উল্লেখ্য, পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পর জানা গেল, গতকালই দালাল কাইয়ুমকে গ্রেপ্তার করেছে শেরেবাংলা থানার পুলিশ। আর পুলিশ সদস্য কনস্টেবল শামীমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন পাসপোর্ট অফিসের সামনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা শেরেবাংলা থানার এএসআই ইউসুফ।

শেরেবাংলা থানার ওসি জানে আলম বলেন, ‘এগুলো আমাদের থানার পুলিশ না। আমাদের থানার শুধু ইউসুপ থাকে। তার দায়িত্ব হচ্ছে দালালরা যাতে টাকা নিতে না পারে সেটা দেখা।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা