kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

আরেকটি মসৃণ জয়

সাকিবের চোট গুরুতর নয়

সাইদুজ্জামান, ডাবলিন থেকে   

১৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আরেকটি মসৃণ জয়

কে একজন পাশ থেকে বলে উঠলেন, ‘দুর, ম্যান্দমারা ম্যাচ। জমল না!’ অথচ ২৯২ রান তাড়া করে জেতা ম্যাচে মসলার ঘাটতি থাকার কথা নয়। তবে সেই তিনিও ম্যাচের শেষ ভাগে উদ্বেগাকুল। পিঠের চোট নিয়ে যে ইনিংস অসমাপ্ত রেখে ড্রেসিংরুমে ফিরে গেছেন সাকিব আল হাসান। আরেকটি পঞ্চাশ নিয়ে তাঁর ফেরার দৃশ্যাবলি উৎকণ্ঠা ছড়িয়েছে সর্বত্র।

কার্যকারণে নামটা ত্রিদেশীয় সিরিজ। বহুজাতিক কোনো আসর জেতা হয়নি বলে আয়ারল্যান্ডের এ সিরিজকে ঘিরে বেশ ব্যান্ড-ট্যান্ডও বাজাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশ দলের অন্দরমহলের চোখ বিশ্বকাপে। সাকিব নিজেও ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ থেকে বিশেষ মিশন নিয়ে এসেছেন ডাবলিনে। অবশ্যই সেটি বিশ্বকাপকে ঘিরে। ওজন কমিয়ে শুধু বহিরাঙ্গেই নয়, মাঠের তৎপরতাতেও তাঁকেই মনে হচ্ছিল দলের সবচেয়ে ফিট ক্রিকেটার। সেই তিনি পিঠের ব্যথায় কাতরালেন এবং ৪৭ থেকে ৫০ ছুঁয়েই ফিরেছেন সাজঘরে। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে অনায়াস জয়, শতভাগ সাফল্য নিয়ে ফাইনালে নামার আত্মবিশ্বাস—ব্যথা নিয়ে সাকিবের মাঠ ছেড়ে যাওয়ার কাছে এসবই বড্ড ঠুনকো।

একগাদা ‘আহা’, ‘উহু’ নিয়েই আয়ারল্যান্ডে পা রেখেছিল বাংলাদেশ। মাহমুদ উল্লাহ এখনো বোলিং করার অবস্থায় পৌঁছাননি, থ্রো করাতেই জড়োসড়ো। মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের সামান্য চোট আছে পিঠে। চোট থেকে বাঁচাতে মোস্তাফিজুর রহমানকে সযতনে আগলে রাখে টিম ম্যানেজমেন্ট। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার থেকে শিখেছেন শরীরে ব্যথা নিয়েই খেলে যেতে হবে। সে সব বিবেচনায় বাংলাদেশ দলের ‘হাসপাতালে’ সাকিবকে অক্সিজেনের বড়সড় সিলিন্ডারের মতোই দেখাচ্ছিল। সেই তিনিই...! আশঙ্কার ব্যাপার হলো—সামান্য ব্যথায় ব্যাটিং ফেলে যাওয়ার লোক নন সাকিব। তার পরও গেছেন যখন, তখন ধরেই নিতে হচ্ছে উদ্বেগ একেবারেই অমূলক নয়। যদিও আজকের আগে সাকিবের অবস্থা নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি টিম ম্যানেজমেন্ট। তবে হাবভাবে মনে হলো, সাকিবের চোটকে গুরুতর বলে মনে করছে না বাংলাদেশ দল।

এই একটি দৃশ্য বাদ দিলে ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশের নিজস্ব ক্রিকেট ব্র্যান্ডের কাটতি অব্যাহত রয়েছে। বোলিং কিংবা ব্যাটিংয়ে সেই ‘ধরো আর মারো’ ভাব নেই। যার যতটুকু সামর্থ্য, তার সবগুলোর সম্মিলিত ফল মিলছে একের পর এক জয়, গতকালেরটি ৬ উইকেটের। মাঝে একটি ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ায় এ আসরে তিন জয়ের সুখানুভূতি নিয়ে ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ।

অথচ পল স্টার্লিংয়ের সেঞ্চুরি আর উইলিয়াম পোর্টারফিল্ডের সেঞ্চুরি ছুঁই ছুঁই ইনিংসের বদৌলতে আইরিশরা ২৯২ রান তুলে ফেলার পর মনে হচ্ছিল অবশেষে বিশ্বকাপ উপযোগী ব্যাটিং প্র্যাকটিসের সুযোগ বুঝি মিলল বাংলাদেশের। কিন্তু কিসের কি? তামিম ইকবাল ও সৌম্য সরকারের পরিবর্তে এ ম্যাচে সুযোগ পাওয়া লিটন কুমার দাশ শুরুতেই বাকি ব্যাটসম্যানদের ওপর থেকে রানের চাপটা কমিয়ে দিয়েছেন। এ দুজনের মেদহীন ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল আজও বুঝি কয়েক ব্যাটসম্যানের ঠিকঠাক অনুশীলনটা আর হলো না।

তবে আরেকটি দাপুটে জয়েও খানিকটা অতৃপ্তি রয়েই গেল। বয়েড র‌্যানকিনের একটি বল থার্ড ম্যানে পাঠাতে গিয়ে স্টাম্পে বল টেনে এনেছেন তামিম। অবশ্য বিদায়ের আগে ৪৭ বলে নিজের ৪৬তম ফিফটি করে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা স্ট্রাইক রেট নিয়ে অনুযোগের মৃদু জবাব দিয়ে গেছেন তিনি। বলা হয়নি, আগের দিন অনুশীলনে বলের আঘাতে পায়ে চোট পেয়েছিলেন বাঁহাতি এ ওপেনার। যদিও গতকাল তামিমের ফিল্ডিং কিংবা ব্যাটিংয়ে তার প্রভাব দেখা যায়নি। দলীয় ১১৭ রানে উদ্বোধনী সঙ্গীকে হারালেও স্বাচ্ছন্দ্যেই ব্যাট করছিলেন লিটন, অপর প্রান্তে যে ইনফর্ম সাকিব। কিন্তু সেঞ্চুরি যখন ভবিতব্য, ঠিক তখনই ধেয়ে আসে ম্যাকার্থির ইয়র্কার। ব্যক্তিগত ৭৬ রানে বোল্ড হওয়া লিটন অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন যে প্রয়োজনে সৌম্যর জায়গা নিতে পারেন তিনিও।

এ সিরিজে বাংলাদেশ দলের উজ্জ্বলতম দিক হলো বড় জুটির সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ছে না ব্যাটিং। বরং ম্যাচটা কে শেষ করে আসবেন—এমন ভাবনায় উঠে আসছে অনেক নাম। যেমন, তামিম-লিটন ফিরে যাওয়ার পর সাকিব-মুশফিকুর রহিমের ব্যাটিংয়েও সমান আস্থা। র‌্যানকিনের লেগ স্টাম্পের বাইরে পিচ করা বলে ব্যাট লাগিয়ে আইরিশ উইকেটরক্ষক উইলসনের দুর্দান্ত ক্যাচে মুশফিকের আউট হওয়াও তাই আর মনে ভয় জাগায়নি। তিনি গেছেন তো মাহমুদ উল্লাহ আছেন না! এরপর সাকিবের চোট শুধু তাঁর ফিটনেস নিয়েই সংশয় জাগিয়েছে, দলের আরেকটি জয়ের পথে বাধা বলে মনে হয়নি। সব শেষ মোসাদ্দেক হোসেন যখন উইকেট দিয়ে এসেছেন, তখন জয় থেকে মাত্র ১৫ রান দূরে বাংলাদেশ। তাতে সাব্বির রহমান ক্রিজে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন। মার্ক অ্যাডাইরের বল লংঅন দিয়ে সীমানার বাইরে পাঠিয়ে ম্যাচের যবনিকাপাতও তাঁর ব্যাটেই হয়েছে। মধুরেনুসমাপয়েত এ ম্যাচে মিডল অর্ডারের দাবি মিটিয়ে ৩৫ রানে অপরাজিত থেকেছেন মাহমুদ।

ম্যাচটা যে এমন একতরফা হবে, প্রথমার্ধে তেমন ইঙ্গিত কিন্তু ছিল না। আগেই ফাইনাল নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় এ ম্যাচটা বাংলাদেশের জন্য ছিল নিছকই আনুষ্ঠানিকতার। তবে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে স্কোয়াডের সবাইকে ম্যাচ প্র্যাকটিস করানোর সুযোগও ছিল। সেটাই করেছে বাংলাদেশ। চারটি পরিবর্তন হয়েছে একাদশে। তাতে বোলিং পরিকল্পনায়ও অদল-বদল হয়েছে। তার সুবিধা শুরুর দিকে আইরিশরা কিছুটা নিলেও সময় যত গড়িয়েছে ততই কর্তৃত্ব হাতবদল হয়ে গেছে বাংলাদেশের কাছে। পল স্টার্লিং ও উইলিয়াম পোর্টারফিল্ডের মধ্যকার ১৭৪ রানের জুটিতে তিনশোর্ধ্ব ইনিংসের ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু আবু জায়েদ রাহি বোলারদের আরাধ্য ইনিংসে ৫ উইকেট পাওয়ার জন্য এ ম্যাচটাকেই যে বেছে নিয়েছিলেন! আইরিশরা রানের ঘোড়া ছোটাতে গিয়ে বারবারই হোঁচট খেয়েছে আবু জায়েদের গতি বৈচিত্র্যের কাছে।

খোলা প্রেসবক্স থেকে মাঠের কথাবার্তা পরিষ্কার শোনা যায়। আবু জায়েদ রানআপ শুরুর আগে দূর থেকে মাহমুদ বলছিলেন, ‘ভাই, আস্তে বল খেলতে পার না।’ সে মতে বল ছেড়ে স্টার্লিংয়ের উইকেট পেতেই আবু জায়েদ ছুটে গেছেন মাহমুদকে কৃতজ্ঞতা জানাতে।

ম্যাচের পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন অধিনায়ককেও। এখানে ম্যাচ প্রস্তুতির সুযোগ না পেলে নিশ্চিতভাবেই বিশ্বকাপে শুয়ে-বসে কাটাতে হতো তাঁকে। গতকাল ম্যাচ প্র্যাকটিস হয়েছে মোসাদ্দেকেরও। বোলিং বিকল্প হিসেবে তাঁর ওপর আস্থা রাখতেই পারেন মাশরাফি।

মোটামুটি বিশ্বকাপ স্কোয়াডের সবারই প্রস্তুতি হয়েছে ত্রিদেশীয় এ সিরিজে। ওহ, ফাইনাল তো এখনো বাকি! তবু ওটা ব্যাকসিটে। টানা তিন ম্যাচে এমন অনায়াস জয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালকে ঘিরে জল্পনা-কল্পনা যে মনে উঁকিই দিচ্ছে না!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা