kalerkantho

১৩ জেলায় পরিবহন ধর্মঘটে জিম্মি যাত্রীরা

চট্টগ্রামে দুপুরে ও উত্তরে রাতে প্রত্যাহার। এবার সিলেটসহ অন্যান্য জেলায় ধর্মঘটের প্রস্তুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১৩ জেলায় পরিবহন ধর্মঘটে জিম্মি যাত্রীরা

নিজেদের দাবি আদায়ে আগাম ঘোষণা ছাড়া গত বুধবার রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চট্টগ্রাম অঞ্চল ও উত্তরের আট জেলায় অবৈধ পরিবহন ধর্মঘট পালন করেছে বিক্ষুব্ধ পরিবহন শ্রমিকরা। টানা ১৮ ঘণ্টা যাত্রীদের জিম্মি করে গতকাল দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম থেকে সব মিলিয়ে ৮৮টি রুটে পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে দাবি না মানা হলে আবারও ধর্মঘট আহ্বান করা হবে বলে জানিয়েছে পরিবহন শ্রমিকরা। এদিকে উত্তরের রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁওসহ আট জেলায় অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের প্রথম দিন গতকাল অতিবাহিত হয়েছে। তবে আট জেলায় গতকাল রাতেই এ ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।

আগাম ঘোষণা ছাড়া এমন ধর্মঘটে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়ে এসব জেলা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেতে ইচ্ছুক যাত্রীরা। রাজধানী ঢাকার সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন বাস টার্মিনাল, চট্টগ্রামের পাঁচ জেলা ও উত্তরের আট জেলায় সংশ্লিষ্ট বাস টার্মিনালে যাত্রীরা বাস না পেয়ে দূরের গন্তব্যে যেতে বিপাকে পড়ে। এ ছাড়া পণ্য পরিবহনও বিঘ্নিত হয়।

গত সোমবার রাতে চট্টগ্রামের পটিয়ায় পুলিশের গোয়েন্দা শাখার সদস্য পরিচয়ে শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসের চালক জালাল উদ্দিনকে (৫০) পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন পরিবহন শ্রমিক নেতারা। এ হত্যার প্রতিবাদেই গত বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে চট্টগ্রাম থেকে ৮৮টি রুটে পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছিল। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের পূর্বাঞ্চলীয় শাখা এ ধর্মঘট আহ্বান করে।

ওই সংগঠনের আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মৃণাল চৌধুরী জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলোর যৌথ বৈঠকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক নিহত বাসচালক জালালের পরিবারকে এক লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের গ্রেপ্তারের আশ্বাসও তাঁরা পেয়েছেন। এ কারণে প্রশাসনকে তাঁরা সময় দিচ্ছেন। দাবি আদায় না হলে আবার ধর্মঘটের মতো কঠোর কর্মসূচি আসতে পারে।

তবে অভিযোগ পাওয়া গেছে, সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রামে চালক হত্যাকাণ্ডের ইস্যুটিকে কাজে লাগিয়ে নিয়ে মূলত তাদের আগের পরিকল্পিত আন্দোলন বেগবান করতে তত্পরতা চালাচ্ছে। আগামী ২৯ এপ্রিলের মধ্যে তারা সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে ধর্মঘট আহ্বানের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। তাদের এ ধর্মঘট আহ্বানের পেছনের উদ্দেশ্য মূলত নতুন সড়ক পরিবহন আইনে চালক ও মালিকদের শাস্তি ও জরিমানা কমানো।

তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন রংপুর বিভাগের সভাপতি আখতার হোসেন বাদল জানান, চালক জালাল উদ্দিন হত্যায় জড়িতদের বিচারের দাবিতেই অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট পালন করা হয়েছে।

ধর্মঘটে গত বুধবার সন্ধ্যা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান পথে বাস ও ট্রাক চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে উত্তরের বিভিন্ন জেলায় ঢাকা থেকে বাস চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে রাজধানীর সায়েদাবাদ, কল্যাণপুর, গাবতলী বাস টার্মিনালে গিয়ে যাত্রীরা বাস চলছে না শুনে ফিরে আসে। উত্তরে যাওয়ার জন্য বাসের টিকিট কাটতে গেলেও বিভিন্ন টার্মিনাল থেকে যাত্রীরা ফিরে আসে।

জালাল হত্যার জের ধরে তাঁর গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের প্রথম দিন গতকাল বাস চলাচল বন্ধ ছিল। সেখানে গতকাল সড়কও অবরোধ করে রাখে পরিবহন শ্রমিকরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের সংঘর্ষে ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়।

সকাল থেকে দিনাজপুর শহরের সুইহারী কলেজ মোড়, দিনাজপুর জেলা ট্রাক ও ট্যাংক লরি, কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সামনে মহাসড়কে ও দশ মাইল মোড়ে তিন দিকে ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে দিনাজপুর-রংপুর-পঞ্চগড়-ঠাকুরগাঁও জেলার সঙ্গে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয় পরিবহন শ্রমিকরা।

দিনাজপুর জেলা ট্রাক ও ট্যাংক লরি, কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়ন ও দিনাজপুর মোটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের শ্রমিকরা দিনাজপুর শহরের সুইহারী কলেজ মোড়, দিনাজপুর জেলা ট্রাক ও ট্যাংক লরি, কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সামনে মহাসড়কে ও দশ মাইল মোড়ে তিন দিকে ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে দিনাজপুর-রংপুর-পঞ্চগড়-ঠাকুরগাঁও জেলার সঙ্গে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।

নীলফামারীতেও গতকাল সকাল থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ ছিল। গতকাল ভোর ৬টা থেকে জেলা ও উপজেলা শহরের ঢাকাগামী বাস কাউন্টারগুলো বন্ধ থাকে। জেলা শহরের শাহীপাড়ার আব্দুল আজিজ (৩৫) চাকরি করেন ঢাকার একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে। তিনি চার দিনের ছুটিতে গিয়েছিলেন নীলফামারীর বাড়িতে। কর্মস্থলে যোগদানের জন্য গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় যাত্রার জন্য টিকিট নিয়েছিলেন নাবিল পরিবহনের। প্রস্তুতি নিয়ে কাউন্টারে এসে বাস ধর্মঘটের কথা শুনে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন।

ঠাকুরগাঁওয়ে ভোর ৬টা থেকে জেলার অভ্যন্তরীণসহ দূরপাল্লার সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ থাকে। কোনো ধরনের মাইকিং বা আগাম প্রচারণা ছাড়াই এভাবে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ। ধর্মঘটে ছাত্র-ছাত্রী এবং কর্মজীবীসহ সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়ে।

[এ প্রতিবেদনের জন্য তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় প্রতিনিধি।]

মন্তব্য