kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

মৌসুমি ফ্লুর প্রকোপ দেশজুড়ে

নাক-মুখ ঢেকে চলাফেরা করার পরামর্শ ডায়রিয়া-কলেরা, ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ারও ঝুঁকি

তৌফিক মারুফ   

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মৌসুমি ফ্লুর প্রকোপ দেশজুড়ে

তিন বছরের শিশুসন্তান শাওলীকে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে আগারগাঁওয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছিলেন পল্লবীর গৃহিণী শাহিনা আক্তার। সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই রায়হানুল ইসলাম। কী হয়েছে জানতে চাইলে একটু থেমে রায়হান বলেন, ‘শাওলীর তিন দিন ধরে সর্দি-কাশি আর জ্বর ছিল, গত রাত থেকে শুরু হয়েছে শ্বাসকষ্ট। ওর অবস্থা খারাপ।’ গত মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে তাঁদের পেছনে পেছনে ওই হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায় আরো বেশ কয়েকজন মা-বাবা ভিড় করে আছেন তাঁদের শিশুসন্তান নিয়ে। এর মধ্যেই শ্বাসকষ্টের সঙ্গে ডায়রিয়া থাকায় এক শিশুকে পাঠানো হয় মহাখালীতে আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) হাসপাতালে।

পরে আইসিডিডিআরবি হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায় শিশু থেকে বিভিন্ন বয়সের ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর ভিড়। চিকিৎসক-নার্সরা ব্যস্ত তাদের চিকিৎসা দিতে। হাসপাতালের বাইরের অস্থায়ী প্যান্ডেলেও চলছিল চিকিৎসা। দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন আট শতাধিক রোগীর ভিড় হচ্ছে বলে ওই হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ সফি আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন প্রতিদিনই আমাদের হাসপাতালে ১,২০০-১,৩০০ রোগী আসে। বেশির ভাগ ভাইরাল সমস্যা। এর পরই রয়েছে ডায়রিয়ার রোগী। এক রকম ঘরে ঘরেই জ্বর-সর্দি-কাশি-শ্বাসকষ্ট। এবার এই প্রকোপটা অন্যবারের চেয়ে বেশিই দেখা যাচ্ছে।’

ইউরোপ-আমেরিকায় ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ শীতকালে হলেও বাংলাদেশে এর প্রকোপ দেখা দেয় গ্রীষ্ম-বর্ষায়। এবারও দেশে মৌসুমি ভাইরাসজনিত রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। তবে এবার সর্দি-কাশি-গলা ব্যথার উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া ৪০-৫০ শতাংশ রোগীই ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বছর ছিল ‘এ’ বেশি। ইনফ্লুয়েঞ্জার পাশাপাশি পানিবাহিত ডায়রিয়া-কলেরার প্রকোপ দেখা দিয়েছে মৌসুমের শুরুতেই। সেই সঙ্গে ঝুঁকি রয়েছে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ারও। ফলে বিশেষজ্ঞরা এসব রোগের ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, “এই সিজনে বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘এ’ ও ‘বি’-এর প্রকোপ থাকে। এর মধ্যে এবার ‘বি’-এর প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে ‘এ’-এর আওতায় এইচ থ্রি বা এইচ১এন১ (সোয়াইন ফ্লু) পাওয়া যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ডায়রিয়া-ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকিও আছে।”

আইইডিসিআর সূত্র মতে, গত বছর এপ্রিল থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ইনফ্লুয়েঞ্জার হাসপাতালভিত্তিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এক বছরে দেশের ১০টি হাসপাতালে মোট চার হাজার ৭২০টি নমুনা পরীক্ষা করে তার মধ্যে ৩২৪টি নমুনায় ফ্লু পাওয়া যায়। সেগুলোর মধ্যে মাত্র ৮৬টিতে ‘বি’ এবং বাকি ২৩৮টি ‘এ’ ক্যাটাগরির ইনফ্লুয়েঞ্জা। ‘এ’ ক্যাটাগরির ২৩৮টির মধ্যে ১৮৯টি ছিল সোয়াইন ফ্লু (এ১এইচ১) এবং ৪৩টি এএইচ৩ পাওয়া যায়। একই পর্যবেক্ষণের আওতায় গত মার্চ মাসে ওই ১০টি হাসপাতালে ২০৯টি নমুনা পরীক্ষায় ১০টি ফ্লুর মধ্যে মাত্র একটি পাওয়া গেছে ‘এ’ ক্যাটাগরির, বাকি ৯টিই ‘বি’ ক্যাটাগরির ভাইরাস।

পথেঘাটে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শরবত বা পানীয় পরিহার করতে হবে : অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘মৌসুমি ভাইরাজজনিত রোগ থেকে রক্ষার জন্য মাস্ক, রুমাল-টিস্যু বা কাপড় দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে চলাফেরা করা ভালো। ভাইরাসে আক্রান্ত কারো কাছে গেলে অধিকতর সতর্ক থাকা খুবই জরুরি। কারণ একজনের হলে তা আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি এক ঘরে ভাইরাসজনিত জ্বর-সর্দি-কাশি হলে তা ঘরে অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে ডায়রিয়া থেকে রক্ষায় নিরাপদ পানি পান করা, গরমে পথেঘাটে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের যেকোনো ধরনের শরবত বা পানীয় পরিহার করতে হবে। কেউ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

আইইডিসিআরের আরেক গবেষক বলেন, বাংলদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার সিজন মূলত এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত, কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকায় এই ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ ঘটে শীতের সময়ে। এ দেশে ঠাণ্ডায় ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ খুবই কম, এখানে তা বেড়ে যায় বর্ষা ও গরমকালে। এমনটা কেন হচ্ছে সেটা এখনো বের করা যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, মৌসুমি রোগে বয়স্ক ও শিশুদের ঝুঁকি বেশি। তাই তাদের অধিকতর সতর্কতার আওতায় রাখা উচিত।

এদিকে ডায়রিয়ার প্রকোপও গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বেশি বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে গত দুই সপ্তাহ ধরেই ঢাকার কয়েকটি এলাকায় ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। সে অনুসারে আইসিডিডিআরবির হাসপাতালেও রোগীর চাপ বেড়ে গেছে। ওই হাসপাতালের ভেতরে জায়গা না হওয়ায় এখন বাইরে অস্থায়ী প্যান্ডেল স্থাপন করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে আমরা এরই মধ্যে ওয়াসা-সিটি করপোরেশনসহ আরো কয়েকটি সংস্থা নিয়ে বৈঠক করেছি। এ ছাড়া সারা দেশে কলেরা স্যালাইন, খাবার স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ করেছি। যেখানেই প্রকোপ দেখা যাবে, সেখানেই যাতে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায় সে জন্য নির্দেশনা দেওয়া আছে। এ ছাড়া নিরাপদ পানি পান করার জন্য আমরা জনসচেতনতামূলক প্রচারকাজও শুরু করেছি।’

আইসিডিডিআরবির পরামর্শক ও রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, থেমে থেমে কয়েক দিন পর পর যেমন বৃষ্টি হচ্ছে, আবার প্রচণ্ড গরমও পড়ছে। গরমে অতিষ্ঠ মানুষ ঘরের বাইরে বেরিয়ে কাজের ফাঁকে পথেঘাটে অস্বাস্থ্যকর পানীয় পান করে, যা থেকে মানুষের শরীরে ডায়রিয়ার জীবাণু ঢুকে পড়ছে। আবার জলাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই খাবার পানির পাইপে পয়োনিষ্কাশনের ময়লাযুক্ত পানি ঢুকে কলেরার জীবাণুতে আক্রান্ত হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুসারে, গত এক সপ্তাহে আইসিডিডিআরবি ছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা (হাসপাতালে ভর্তি) ছিল পাঁচ হাজার ১৪৬ জন। এর প্রায় দ্বিগুণ রোগী যায় শুধু আইসিডিডিআরবিতে। এর মধ্যে গত ১৯ এপ্রিল ৮৫৩ জন, ২০ এপ্রিল ৮৬৭ জন, ২১ এপ্রিল ৮৭২ জন, ২২ এপ্রিল ৭৬৮ জন, ২৩ এপ্রিল ৮৮৯ জন, ২৪ এপ্রিল ৮৬০ জন এবং ২৫ এপ্রিল ৮৪৯ জন রোগী ডায়রিয়া-কলেরায় আক্রান্ত হয়ে যায় আইসিডিডিআরবিতে।

 

 

মন্তব্য