kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

ট্যানারির বর্জ্যে এখন বিপর্যস্ত লেশ্বরী

তানজিদ বসুনিয়া   

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ট্যানারির বর্জ্যে এখন বিপর্যস্ত লেশ্বরী

ধলেশ্বরী তীরে ফেলা এই আবর্জনা বৃষ্টিবাদলে গড়িয়ে যায় নদীতে। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর আবাসিক এলাকা আর পাশের বুড়িগঙ্গার সর্বনাশ ঘটিয়ে ট্যানারির বর্জ্য এখন বিপর্যস্ত করছে ধলেশ্বরীকে। সাভার উপজেলার হেমায়েতপুরে যমযম সিটির সামনে এক চায়ের দোকানে আড্ডায় রত স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে আর সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ট্যানারির বর্জ্যে দূষিত হয়ে মরতে বসেছে ধলেশ্বরী।

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিশিল্প সরাতে সাভারের তেঁতুলঝোরা ইউনিয়নে ট্যানারিপল্লী গড়ে তোলা হয়। এলাকাবাসী জানায়, পরিকল্পিত কাঠামো ও সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবেশবান্ধব ট্যানারিপল্লী গড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। ১৯৯.৪০ একর জায়গায় এই চামড়া শিল্পনগরীর পাশেই ধলেশ্বরী নদী। পরিকল্পিত ডাম্পিং স্টেশনের অভাবে ট্যানারির বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে ধলেশ্বরী।

হেমায়েতপুরের ঝাউচর বরতৈলবাজার এলাকায় গত ৪ এপ্রিল সকালে চায়ের দোকানে কথা হয় স্থানীয় মৎস্যজীবী মো. আফজালের সঙ্গে। তিনি জানান, একসময় তাঁর আয়ের প্রধান উৎস ছিল ধলেশ্বরী নদীর মাছ। কিন্তু বর্তমানে সংসার চালাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। তিনি বলেন, ‘এমন না যে ধলেশ্বরীতে মাছ পাওয়া যায় না। আগের চেয়ে কম হলেও মাছ পাওয়া যায় এখনো। কিন্তু এই মাছ কেউ কিনতে চায় না। রান্না করার পরও মাছ কেমন জানি গন্ধ করে। এইভাবে কি আর সংসার চলে?’ কাছে থাকা আব্দুর রহিম বলেন, ‘সরকার এত টাকা খরচ করতাছে, ওদেরও (ট্যানারি মালিকদের) তো ম্যালা টাকা। কিছু টাকা খরচ করে ভালোভাবে কাজটা (ডাম্পিং ইয়ার্ড ও বর্জ্য শোধনাগার) শেষ করলে তো নদীটা বাঁচত। ট্যানারির কর্মচারীরা আইসা ময়লা নদীর ধারে ফেলে, কেউ কিছু কয় না। কারে অভিযোগ দিমু, ওগো লোকজনই তো রাইতে আইসা বাঁধ ভাইঙ্গা দেয়।’

এলাকাবাসীর অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত চীনা কম্পানির গোঁড়ামি, যথার্থ তদারকির অভাব এবং চামড়াশিল্প কর্তৃপক্ষ ও মালিকদের উদাসীনতায় যথাযথ পরিশোধন ছাড়াই বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীতে। এত দিনেও চালু হয়নি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ক্রোমিয়াম সেপারেশন ব্যবস্থা। সল্ট পরিশোধনেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অপরিশোধিত বর্জ্য স্ক্রিনিং করার পর দুটি আলাদা পাইপলাইনে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারে (সিইটিপি) এবং ক্রোম রিকোভারি ইউনিটে নির্গমন করানো অত্যাবশ্যক হলেও প্রকৃতপক্ষে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বর্জ্য স্ক্রিনিং ছাড়াই পাইপলাইনে ছেড়ে দিচ্ছে। এ জন্য দূষণ বাড়ছে ধলেশ্বরীতে। এ কারণে প্রায়ই মাছ মরে ভেসে থাকতে দেখা যায়।

গত ৪ ও ৫ এপ্রিল গিয়ে দেখা গেছে, ডাম্পিং ইয়ার্ডের পাশে ডোবা ও নদীর ধারে ফেলা ট্যানারির কঠিন বর্জ্য এবং ঝিল্লির অংশ পচে উৎট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ডাম্পিং ইয়ার্ডের বাঁধ ভেঙে নদীতে বর্জ্য যেতে যেতে ধলেশ্বরীর তীরে তিনটি বড় নালার সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া চামড়া শিল্পনগরীর অবকাঠামোগত কাজও আছে অসমাপ্ত অবস্থায়। সিইটিপির পাশে বর্জ্যের ডাম্প ইয়ার্ডও খুবই ভঙ্গুর।

জানা যায়, গত ছয় মাসে দুবার ডাম্প ইয়ার্ডের বাঁধ ভেঙে বর্জ্য গিয়ে পড়ে ধলেশ্বরীতে। সেখানে শুধু ভুসি ও মাটি দিয়ে বাঁধের ওই পাশটি আটকে রাখা হয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই যেকোনো সময় সেই অংশ ভেঙে পুনরায় নদীতে গিয়ে পড়বে বর্জ্য। ডাম্প ইয়ার্ড পরিপূর্ণ হওয়ায় এর পাশের স্থানগুলোতে ফেলা হচ্ছে বর্জ্য। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে ডাম্প ইয়ার্ডের আশপাশের ডোবা-নালায় কঠিন বর্জ্য ফেলছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি জানার পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। অনেক ট্যানারি শিল্প-কারখানার তরল বর্জ্য উপচে পড়ে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বর্ষায় এ সমস্যা গুরুতর আকার ধারণ করে। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে একাধিকবার প্রতিবাদ জানানো হলেও কোনো সমাধান পায়নি তারা। গত ৪ এপ্রিল একটি ছোট ট্রাক্টরে করে ডাম্প ইয়ার্ডের পাশের একটি স্থানে বর্জ্য ফেলার সময় এক কর্মচারীর কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা (ডাম্প ইয়ার্ড) তো ভর্তি হয়ে গেছে। আর এসব আমাদের বলে কী করবেন, যাদের কাছে গিয়ে বলার দরকার তাদের বলেন। আমরা আমাদের কাজ করতেছি।’

সাভারের পরিবেশবাদী সংগঠন নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক বলেন, ‘হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারে আসার ফলে ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন তো হয়ইনি, বরং ক্ষতিই হয়েছে বেশি। ধলেশ্বরী নদী তার উত্কৃষ্ট উদাহরণ। ৩০ বছর পর এখানেও ঠিক হাজারীবাগের মতো অবস্থা হবে। তখন হয়তো এখান থেকে সরিয়ে পদ্মার পার বা মেঘনার পারে নিয়ে যাওয়া হবে। এভাবেই জোড়াতালি দিয়ে চলছে। এর থেকে উত্তরণটা খুব জরুরি। এ জন্য জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সবাইকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দেখাতে হবে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেখানে সিইটিপি ত্রুটিপূর্ণ ও অকার্যকর, সেখানে ধলেশ্বরী নদী কিভাবে দূষণমুক্ত থাকতে পারে? হাজারীবাগে ট্যানারি থাকা অবস্থায় বুড়িগঙ্গা থেকে বর্জ্যগুলো নদী থেকে অন্য কোথাও যেতে পারত না দুপাশে বিল্ডিং থাকার কারণে। কিন্তু ট্যানারি সাভারে নেওয়ায় ধলেশ্বরীর দুপাশেই চাষাবাদের প্রচুর জমি দূষিত হয়ে গেছে, এখনো হচ্ছে। এ বিষয়ে এখনই কোনো পদক্ষেপ না নিলে সামনে আরো খারাপ দিন অপেক্ষা করছে ধলেশ্বরীর জন্য।’

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা এবং সরকার উভয়ে মিলেই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। তবে সরকারকে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। দূষণের কারণে এক্সপোর্টের ওপরও কিছুটা প্রভাব পড়ছে।’

বিসিকের চেয়ারম্যান মোস্তাক হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আপনি ভুল দেখেছেন। হয়তো ভুল জায়গা থেকে ঘুরে এসেছেন। নদীর পানি বর্তমানে সামান্য লাল হলেও সেটি আগের মতোই আছে। মূলত গার্মেন্টের কালো পানি যাওয়ায় ধলেশ্বরী ধূষিত হচ্ছে আগে থেকে, ট্যানারির বর্জ্যের কারণে নয়।’ কঠিন বর্জ্য ডাম্পিং ইয়ার্ডে না ফেলে নদীর তীরে ফেলার বিষয়ে তিনি আরো বলেন, ‘রাতের অন্ধকারে কেউ যদি কাজটি করে থাকে তাহলে কী বলবেন? কিছু ট্যানারির অসাধু কর্মচারী কাজটি করে থাকতে পারে। মাঝেমধ্যে বর্জ্য যাওয়ার ড্রেনেও বস্তা ফেলা হয়। সেটি আমি ভিডিও করে ট্যানারি মালিকদের দেখিয়েছি। খুব শিগগির পরিবেশ অধিদপ্তরকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান শুরু করব। যারা এই কাজটি করছে তাদের বড় জরিমানা করা হবে।’ ডাম্পিং ইয়ার্ডের বাঁধ ভেঙে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এ বিষয়ে এখনো কোনো অভিযোগ আসেনি। আমি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিলাম।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সুলতান আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু ধলেশ্বরীই নয়, সাভার অঞ্চলের দূষণ নিয়ে আমরা কিছুদিন আগে বসেছিলাম। সেখানে সংসদীয় কমিটি, বিসিক, বুয়েট, মালিকপক্ষ, স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনকারীরাও ছিল। সাভারে ট্যানারি এলাকায় কিছু সমস্যা থাকলেও সেটি আগের চেয়ে এখন ভালো অবস্থায় আছে। নদীর পানির রঙে কিছুটা সমস্যা আছে। পানির রং কিছুটা বাদামি। ধলেশ্বরী দূষণ রোধে বিসিকের আরো অনেক কিছু করার আছে। আর দূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা চলছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা