kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

হাজারীবাগে ট্যানারির ভবনে রাসায়নিক!

তানজিদ বসুনিয়া   

২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হাজারীবাগে ট্যানারির ভবনে রাসায়নিক!

হাজারীবাগ ট্যানারিতে গিয়ে একটি ট্রাক বেঙ্গল লেদার কমপ্লেক্স লিমিটেডের ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা গেল গত ১ এপ্রিল সকালে। ট্রাকের গায়েও লেখা ছিল ‘বেঙ্গল লেদার লিমিটেড’। পরে একটু দূরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ভবনের সামনে চায়ের দোকানে বসে কথা হয় ওই এলাকায় বাসিন্দা বেলাল হোসেনের সঙ্গে। চাকরিজীবী বেলাল বলেন, ‘এই ট্রাকে করে কেমিক্যাল নিয়ে যাওয়া হবে হেমায়েতপুর। শুধু এটাই না, বড় ট্যানারিগুলা তাদের নিজস্ব গাড়িতে করে এগুলা নিয়ে যায়।’

বিকেল ৩টায় পুনরায় ওই ট্রাকটি ফিরে আসতে দেখে বেঙ্গল লেদারের কর্মকর্তা মো. লুত্ফরের কাছে সকালে ট্রাকে রাসায়নিক নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কি না জানতে

চাইলে তিনি বলেন, ‘কেমিক্যালের খালি ড্রামের দাম সাভারে খুব কম, তাই এগুলা এখানে নিয়ে আসলাম। এখানে কোনো কেমিক্যাল নেই, শুধু কয়টি ড্রাম আনতে ট্রাক নিয়ে গিয়েছিলাম।’ শুধু খালি ড্রাম আনতে পাঁচ টনের একটি ট্রাক হাজারীবাগ থেকে সাভার পাঠানো কতটা যৌক্তিক জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে চলে যান।

ওই সময় পাশে থাকা রিকশাচালক মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘কয়েকটা খালি ড্রাম আনতে এত বড় ট্রাক ব্যবহার বেঙ্গল তো দূরে থাক পাগলও করবে না। চার-পাঁচটি খালি ড্রামের এমন কি দাম যে একটা বড় ট্রাকে এত টাকার তেল খরচ করে সেগুলো নিয়ে আসতে হবে? এসব কথা বিশ্বাস করবেন না। এরা সবাই কেমিক্যাল নিয়ে যায় এখান থেকে। কেউ ভোরে নিয়া যায়, কেউ রাইতে। খোঁজ নিলে সব খবর পাইবেন।’

ওই দিন হাজারীবাগে ঢাকা ট্যানারি মোড়, গজমহল ট্যানারি কিন্ডারগার্টেন মার্কেট, পিলখানা পাঁচ নম্বর গেটের পাশে লেদার কলেজ এলাকা, শাহজাহান মার্কেট, শিকারিতলাসহ বেশ কিছু স্থানে প্রকাশ্যে রাসায়নিক বেচাকেনা চলতে দেখা যায়। ঢাকা ট্যানারি মোড়ের সোলেয়মান স্টোর, আউয়াল স্টোর, বিএসএফসহ বেশ কিছু স্টোরে প্রকাশ্যে রাসায়নিক বিক্রি করতে দেখা গেছে। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী জুয়েল রানা বলেন, ‘আমরা খুচরা কাস্টমারগোর কাছে কেমিক্যাল বেচি। বড়গুলার তো গোডাউন আছে। আর হেগো দোষ দিয়া লাভ নাই, এত কেমিক্যাল সাভারে রাখব কই? এগুলা রাখারও তো একটা জায়গা লাগব।’ আরেক কর্মচারী মো. মাসুম বলেন, ‘অভিযান তো মাঝেমধ্যে চালায়, কিন্তু কী করার আছে? আমাদেরও তো বাঁচতে হইব।’

ঢাকা ট্যানারি মোড়ের বাঁ পাশে ছোট একটি দোকানে বসে ব্লেড দিয়ে শুকনো চামড়া কাটছিলেন ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী আলী হোসেন। তিনি বলেন, ‘কত কেমিক্যালের গোডাউন খুঁজবেন? কতজনের নাম হুনবেন আর কতজনের নাম লিখবেন? তদন্ত করলে বহুত গোডাউন পাইবেন। জায়গায় জায়গায় গোডাউন আছে।’

হাজারীবাগে বড় ট্যানারি প্রতিষ্ঠানে ভবনগুলোতে কেমিক্যাল মজুদ থাকার বিষয়টি স্বীকার করে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ কালের কণ্ঠ’কে বলেন, ‘বড় বড় ট্যানারিগুলোতে কেমিক্যাল মজুদ থাকলেও আশপাশে কোনো মানুষ বা বাড়ি-ঘর নেই। বড় ওয়্যারহাউসের আশপাশেও কোনো আবাসিক এলাকা নেই। আর এসব এখনো সাভারে রাখার মতো কোনো পরিবেশ তৈরি হয়নি। এ ছাড়া কিছু ট্রেডার্স হাজারীবাগ থেকে সাভারে কেমিক্যাল সরবরাহ করে থাকলেও তা কোনো বড় সমস্যা নয়।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বারবার বলা এবং অভিযান চালানো সত্ত্বেও আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরায়নি অনেক ব্যবসায়ী। বরং ট্যানারি সাভারে স্থানান্তরের পর হাজারীবাগে খালি পড়ে থাকা বড় ট্যানারি প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোতে মজুদ রাখা হয়েছে রাসায়নিক। সেখান থেকেই প্রতিনিয়ত সাভারে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সরবরাহ করছে ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলো। ভোরে ও গভীর রাত ছাড়াও কিছু প্রতিষ্ঠান দিনে-দুপুরেও ট্রাকে করে নিয়ে যায় রাসায়নিক। মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও আগেই খবর পেয়ে গুদাম বা দোকান বন্ধ করে সটকে পড়েন ব্যবসায়ীরা। এভাবেই রাসায়নিকের রমরমা ব্যবসা চলছে হাজারীবাগে।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম কালের কণ্ঠ’কে বলেন, ‘হাজারীবাগের ট্যানারিতে কেমিক্যাল মজুদ রাখার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। আমি বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখব। আর আমরা যে ৩৫টি কেমিক্যাল নিয়ে ডিল করি সেগুলোর মধ্যে কোনো কেমিক্যালের অস্তিত্ব সেখানে পাওয়া গেলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

দূষণ কমাতে ট্যানারি সরিয়ে সাভারে নিয়ে গেলেও এখনো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে হাজারীবাগে। এসবের মধ্যে আছে খাদিজা এন্টারপ্রাইজ, রেভল্যুশন ট্যানারি, ইউসুফ ট্যানারি, চৌধুরী লেদার, বিটিআই, এফ কে লেদার, এশিয়া, এম এইচ লেদার, লেক্সকো, ফিনিক্স লেদার, রুপালি, বেঙ্গল লেদার। লেক্সকো, ফিনিক্স লেদার, রুপালি, বেঙ্গল লেদারসহ বেশ কয়েকটি ট্যানারি প্রতিষ্ঠান ফুটওয়্যারের কাজ করলেও হাজারীবাগের ভেতরের দিকে ট্যানারির কাজ পুরোদমে চলছে।

মন্তব্য