kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন

‘কেউই ছাড় পাবে না’

সোনাগাজী প্রতিনিধি   

২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘কেউই ছাড় পাবে না’

ফেনী-৩ (সোনাগাজী-দাগনভূঞা) আসনের সংসদ সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় কেউ রেহাই পাবে না।

তিনি বলেন, ‘কারো যদি কোনো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিচয়ও থাকে, তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে তারও ছাড় পাওয়ার কোনো সুযোগ

নেই। এ ঘটনাটি ধামাচাপা হয়ে যাবে কিংবা রাজনৈতিক কারণে অন্য খাতে প্রবাহিত হয়ে যাবে, এটা আমি বিশ্বাস করি না।’

গতকাল মঙ্গলবার সোনাগাজী পৌর শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ড উত্তর চরচান্দিয়ায় নুসরাতের গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের সমবেদনা জানাতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি এসব কথা বলেন।

এ সময় তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, নুসরাত হত্যার অন্যতম হোতা মাদরাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার (বরখাস্ত) আগের অপকর্মগুলোর কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এতে মাদরাসা কমিটির কোনো অবহেলা আছে কি না, সেগুলো সুচারুভাবে তদন্ত করা হবে।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি ভবিষ্যতে ঢেলে সাজানো হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ চৌধুরী বলেন, প্রতিষ্ঠানে যে লেভেলের শিক্ষা আছে সে প্রতিষ্ঠানে কেউ সদস্য হতে চাইলে তাকে সে পর্যন্ত শিক্ষিত হতে হবে।

তিনি বলেন, কোনো উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় কিংবা মাদরাসা কমিটিতে প্রাইমারি পার না হওয়া কেউ আসবে—এমনটা আর সোনাগাজীতে হবে না। উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের কমিটিতে কেউ থাকতে চাইলে তাকেও উচ্চশিক্ষিত হতে হবে।

নুসরাতের পরিবারের নিরাপত্তার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘মামলাটির রায় হওয়া পর্যন্ত পরিবারটিকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে আমি ফেনী জেলা পুলিশ এবং ডিআইজির সঙ্গে কথা বলব।’

মামলার অগ্রগতির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকাণ্ডে আমি সন্তুষ্ট। এখন পর্যন্ত কোনো অবহেলা চোখে পড়েনি। যদি তাদের গাফিলতি বোঝা যেত তাহলে আমরা অন্য লেভেলে চেষ্টা করতাম।’

মামলাটি দ্রুত বিচার আইনে নেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করব তদন্ত শেষ করে আদালতের কাছে তুলে দিতে। এ ছাড়া আইনমন্ত্রী বলেছেন, এ মামলা দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর করা হবে।’

সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘তাঁকে সোনাগাজী থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আমার কাছে তথ্য আছে, আজ পিবিআই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছে। এখানে ইনফ্লুয়েন্স করার কোনো সুযোগ নেই।’

লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এর আগে নুসরাতের কবর জিয়ারত করেন এবং তার পরিবারকে সমবেদনা জানান। এ সময় নুসরাতের বাবা মাওলানা এ কে এম মুসা মানিকের হাতে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে এক লাখ টাকা দেন এমপি।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর সহধর্মিণী জেসমিন মাসুদ, সোনাগাজী মডেল থানার ওসি কামাল হোসেন, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও যুবলীগ সভাপতি আজিজুল হক হিরণ, পৌর কাউন্সিলর নুর নবী লিটন, উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আবু সুফিয়ান এবং জেলা ও উপজেলা জাতীয় পার্টির নেতারা উপস্থিত ছিলেন। নুসরাতের বাবা মাওলানা এ কে এম মুসা মানিক ছাড়াও তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ও ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান উপস্থিত ছিল।

১৭ দিনেও থামেনি নুসরাতের মায়ের কান্না

‘ও আল্লাহ, আমাকে নিয়ে আঁর নুসরাতকে ফিরিয়ে দাও! চোখে ঘুম এলে আঁর নুসরাতে দেখি। আঁই ঘুম যাইতান্ন, তোরা আঁর নুসরাতকে ফিরিয়ে দে।’

৬ এপ্রিল সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে অগ্নিসংযোগের পর থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ১৭ দিনেও নুসরাতের মমতাময়ী মা শিরিন আক্তারের বিলাপ এভাবেই হাহাকার তুলে চলেছে সমগ্র বাড়িজুড়ে। ক্ষণে ক্ষণে এসব কথা বলে কেঁদে উঠছেন শিরিন, চোখ ভিজে যাচ্ছে নুসরাতের বাবা মাওলানা এ কে এম মুসা মানিকেরও।

গতকাল মঙ্গলবার নুসরাতের শয়নকক্ষে তার খাটের ওপর বসে এবং শুয়ে আহাজারি করতে দেখা গেল নুসরাতের মা শিরিন আক্তারকে। ঘরটিতে নুসরাতের কাপড়চোপড়, বই-খাতা, আসবাব সবই আছে। শুধু নেই নুসরাত। এখন সার্বক্ষণিক নুসরাতের কক্ষেই থাকেন তার মা শিরিন আক্তার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ ও স্বজন এসে তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু কিছুতেই তাঁর কান্না থামছে না।

নুসরাতের ভাই নোমান বলেন, ‘আম্মা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না নুসরাতের অতীত স্মৃতি আর পোড়া গায়ে দুঃসহ যন্ত্রণার কথা। নুসরাতের পোড়া গন্ধ যেন আজও তাঁর নাকে লাগছে।’

নুসরাত তার শয়নকক্ষের দেয়ালে লাল কাগজে লেখে রেখেছিল ‘মা আমার চোখের মণি’ এবং মাকে নিয়ে লেখা একটি গানের কয়েকটি লাইন—‘আমি চাঁদকে বলি তুমি সুন্দর নও আমার মায়ের মতো/গোলাপকে বলি তুমি মিষ্টি নও/আমার মায়ের মতো/মা যে আমার সবার সেরা বিধাতার শ্রেষ্ঠ উপহার/হয় না কভু কারো সাথে মায়ের তু্লনা/আই লাভ ইউ মা, আই মিস ইউ মা!’

গত ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় নুসরাত।

মানববন্ধন অব্যাহত

এদিকে নুসরাত জাহান রাফিকে হত্যার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন অব্যাহত রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ফেনী সদর উপজেলার কালীদহ এসসি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের সড়কে মানববন্ধন করেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

মানববন্ধনে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি এম এ হান্নান, প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন, স্থানীয় কালীদহ ইউপি চেয়ারম্যান দিদারুল আলম, ইউপি সদস্য ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য বেলাল হোসেন, সেলিম, দাতা সদস্য নুরুল আফসার, শিক্ষক প্রতিনিধি লিটন চন্দ্র ভৌমিক, জাহিদুন নবী, দীপালি পোদ্দার, সাবেক সহসভাপতি এস এম আমজাদ হোসেন, প্রাথমিক শিক্ষক নেতা মহিউদ্দিন খোন্দকার, কালীদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কবিতা রানী দাস, স্থানীয় আনিকা কিন্ডারগার্টেনের প্রধান শিক্ষক লুত্ফুর নাহার ঝর্না উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য