kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

নুসরাত হত্যায় অভিযুক্ত আ. লীগ নেতা রুহুল

মাদক চাঁদাবাজি সন্ত্রাস দখলবাজি সর্বত্র তার নাম

শেখ আবদুল হান্নান, সোনাগাজী   

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মাদক চাঁদাবাজি সন্ত্রাস দখলবাজি সর্বত্র তার নাম

অবৈধ বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়ায় ২০১৮ সালের ২৯ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোহেল পারভেজ ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরীন ফেরদৌসির বিরুদ্ধে মামলা করেন রুহুল আমিন। পরে অবশ্য মামলা প্রত্যাহার করেন। ছোট ফেনী নদীর দুটি বালুমহাল সাবেক এমপি রহিম উল্যাহ ইজারা নিয়েছিলেন। এখানেও রুহুল ও তাঁর ক্যাডার বাহিনীর দাপট। দখল করে নেন এ দুটি বালুমহাল। প্রতিদিন তাঁর ক্যাডাররা এসব বালুমহাল থেকে বালু বিক্রি করে অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। উপজেলার সব সরকারি প্রকল্পের কাজের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করেন রুহুল ও তাঁর ক্যাডাররা। টাকার বিনিময়ে একাধিকবার গ্রেফতারি পরোয়ানার দাগী আসামিকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছেন তিনি। দলের নেতাকর্মীদের নির্যাতন করা ছাড়াও বহু অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সর্বশেষ অভিযোগ উঠেছে সোনাগাজীর আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যায় রুহুলের সম্পৃক্ত থাকার।

এই রুহুল আমিন হলেন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তবে দল বলছে, তাঁর অপকর্মের দায় দল নেবে না।

সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনায় প্রথম থেকেই অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলার পাশাপাশি অভিযোগের তীর ছিল আওয়ামী লীগ নেতা ও মাদরাসা কমিটির সহসভাপতি (সদ্য বিলুপ্ত) রুহুল আমিনের দিকে। গত শুক্রবার সোনাগাজী থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে গত ৭ এপ্রিল নুসরাতের জানাজার মঞ্চেই অবস্থান করেছিলেন রুহুল। মঞ্চে রুহুলকে দেখে অবাক হয়েছিল নুসরাতের স্বজন ও স্থানীয় লোকজন। রুহুলের আচরণও ছিল সন্দেহজনক। সব নেতা জানাজায় আবেগাপ্লুত হলেও রুহুল মাঠে নিজের ক্যাডারদের সঙ্গে খোশগল্প করছিলেন। অনেকেই মন্তব্য করছিল, ‘যারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত তারাই আবার জানাজার মঞ্চে!’

জানাজায় শরিক হওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার ও ফেনী ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আসামিরা (নুসরাত হত্যার) এ জানাজার মাঠেই হয়তো রয়েছে। আসামিরা ৪০ হাত মাটির নিচে থাকলেও তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে।’

রুহুল আমিনের উত্থান

সোনাগাজীর চরচান্দিয়া ইউনিয়নের কুচিয়াঘোনা কেরানীবাড়ির কোরবান আলীর ছেলে রুহুল আমিন। পড়াশোনা করেন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। বড় ভাই আবুল কাশেম যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। তিনি সেখানে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আরেক ভাই আবু সুফিয়ানও যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির রাজনীতি করেন। একসময় পেটের তাগিদে সৌদি আরব চলে যান রুহুল আমিন। সেখানে ট্যাক্সি চালিয়ে অর্থ উপার্জন করতেন। কোনোরকমে চলত সংসার। পরে জাতীয় পার্টির হাত ধরে রাজনীতিতে উত্থান হলেও অল্প দিনে উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদে চলে আসেন রুহুল। অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গড়েন ক্যাডার বাহিনী। নিজ দলের নেতাকর্মীরাও তাঁর বাহিনীর হাতে নির্যাতত হয়েছে। দলীয় নেতা, মাদরাসার একাধিক শিক্ষক-অভিভাবক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।

দলীয় ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯৯৭ সালে উপজেলা জাতীয় পার্টির সদস্য ছিলেন রুহুল আমিন। একই বছর উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ফয়েজুল কবিরের হাতে সোনাগাজী ফরিদ সুপারমার্কেটের সামনের এক সমাবেশে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। কিন্তু কখনো দলে সক্রিয় ছিলেন না তিনি। ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি সৌদি আরবে থেকে ট্যাক্সি চালান। ২০০৯ সালের পর তিনি বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতিতে গোপনে সম্পৃক্ত হন। তিন বছর পর হঠাৎ আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। দলের অন্য নেতারা এর ঘোর বিরোধিতা করেন। অনেক তদবির করে অবশেষে ২০১৩ সালে সোনাগাজী আওয়ামী লীগের সদস্য হন রুহুল। ২০১৬ সালে নিজাম হাজারী এমপির আশীর্বাদে সোনাগাজী আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে জেলা আওয়ামী লীগের এক সভায় সোনাগাজী আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি।

এ সময় ছোট ফেনী নদীর মুহুরী প্রকল্প অংশের একটি বালুমহাল এবং ছোট ফেনী নদীর সাহেবের ঘাট এলাকায় আরেকটি বড় বালুমহাল সাবেক এমপি রহিম উল্যাহ ইজারা নিয়েছিলেন। কিন্তু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার পর রুহুল ও তাঁর ক্যাডার বাহিনী বালুমহাল দুটি দখলে নেয়। এখনো বালুমহাল দুটিতে কয়েক কোটি টাকার বালু রয়েছে বলে জানায় স্থানীয় লোকজন। প্রতিদিন তাঁর ক্যাডাররা বালুমহালগুলো থেকে বালু বেচে অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

দলের একাধিক সূত্র জানায়, সোনাগাজী থানায় সালিস ও তদবির বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত রুহুল আমিনের ক্যাডাররা। আওয়ামী লীগের নেতা হলেও বিএনপি-যুবদলের ক্যাডারদের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক। তাঁদের মধ্যে আছেন উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক খুরশিদ আলম, রুহুলের চাচাতো ভাই চরচান্দিয়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিয়াধন ও তাঁর ২০-২৫ জনের ক্যাডার বাহিনী। তাঁর বাহিনীতে আরো আছেন সম্প্রতি ৩০০ পিস ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার দুলাল ওরফে বাটা দুলাল, ইয়াবা বিক্রেতা হেলাল, সিরাজ ওরফে সিরাজ ডাকাত, আবুল কাশেম ওরফে কাশেম মাঝি, সাব মিয়া, ফকিরবাড়ির গোলাপ, আব্দুল হালিম সোহেলসহ বেশ কয়েকজন।

অভিযোগ রয়েছে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য আবুল কালাম বাহারকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করে রুহুল আমিনের ক্যাডাররা। সোনাগাজী সদর ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা স্বপন, চরদরবেশ ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হোসেন আহমেদ, মতিগঞ্জ ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনসহ অনেকে বিভিন্ন সময় রুহুল আমিনের বাহিনীর হাতে মারধরের শিকার হন। রুহুলের অনুগত না হওয়ায় সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাধরণ সম্পাদক নুরুল আবসার, উপজেলা আওয়ামী লীগের উপতথ্য সম্পাদক আব্দুর রহিম খোকনসহ বেশ কয়েকজনকে পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়। দলের প্রভাব খাটিয়ে পদ বাণিজ্য করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। উপজেলার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। দলের প্রভাব খাটিয়ে উপজেলার চরচান্দিয়া পূর্ব বড়ধলি মৌজায় শতাধিক ভূমিহীনের জমি দখল করেন রুহুল। রুহুল না চাইলে উপজেলার কোনো ঠিকাদার দরপত্র গ্রহণ ও জমা দিতে পারে না। ঘুরেফিরে তাঁর অনুগত তিন-চারজন ঠিকাদার সরকারি কাজের দরপত্রে অংশ নেয়।

অভিযোগ মতে, রুহুল আমিন সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার সহসভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মাদরাসা মার্কেটের ১২টি দোকান, ভেতরের বিশাল পুকুরের মাছ চাষ ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নানা উপায়ে আদায় করা বাড়তি টাকার ভাগ পেতেন রুহুল ও আরেক সদস্য কাউন্সিলর মাকসুদ। ক্যাম্পাসের বাইরে মাদরাসার রয়েছে জমিসহ কোটি টাকার সম্পদ। ’

দলীয় সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের সম্মেলনে কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে ফয়েজ কবির নির্বাচিত হলেও মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে কোনো নির্বাচন ছাড়া রুহুল আমিন কিভাবে সভাপতি হলেন, তা অনেকেই জানে না। ফয়েজ কবির বলেন, ‘আমি আমার পদ থেকে পদত্যাগ করিনি। আমাকে বাদও দেওয়া হয়নি। তাহলে অন্য কেউ কিভাবে এ পদের পরিচয় দেয়? রুহুল কিভাবে সভাপতি হলেন, জানি না।’

ফেনী-৩ (সোনাগাজী-দাগনভূঞা) আসনের সাবেক এমপি রহিম উল্যাহ বলেন, ‘আমি ও ডাক্তার গোলাম মাওলা সোনাগাজী শহীদ ছাবের পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিতে সভাপতি পদে প্রার্থী ছিলাম। কিন্তু সোনাগাজী বাজারের পশ্চিম অংশের একটি পক্ষ হঠাৎ রুহুল আমিনকে সেখানে নিয়ে যায়। পরে অভিভাবক সদস্যসহ কয়েকজন সদস্যকে চাপ দিয়ে রুহুলকে সভাপতি করা হয়। রুহুল ও তার লোকজন দফায় দফায় আমার ওপর হামলা চালিয়েছে।’

সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম খোকন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নুসরাত হত্যায় যে-ই জড়িত থাকুক তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এ ঘটনায় আমাদের দলের কোনো নেতা বা কর্মী জড়িত থাকলেও তার ব্যাপারে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’

 

মন্তব্য