kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

প্রতিবাদী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা

পুলিশের ব্যর্থতায় ক্ষোভ সংসদীয় কমিটির

আগুন লাগানোর কথা স্বীকার জোবায়েরের

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফেনী ও সোনাগাজী প্রতিনিধি   

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পুলিশের ব্যর্থতায় ক্ষোভ সংসদীয় কমিটির

ফেনীর সোনাগাজী মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতায় ক্ষোভ জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। হত্যাকারীদের বিচার এবং নারীর সহিংসতার প্রতিবাদে সোনাগাজীর জিরো পয়েন্টে গতকাল উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের ব্যানারে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে কোনো লেনদেন হয়েছে কি না সে ব্যাপারে সোনাগাজীতে দুটি ব্যাংকের শাখায় পিবিআই অনুসন্ধান চালিয়েছে। হত্যা মামলার অন্যতম আসামি সাইফুর রহমান মো. জোবায়ের রবিবার আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেয়াশলাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করে।

সংসদীয় কমিটিতে ক্ষোভ

পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথ পদক্ষেপ নিলে নুসরাতের এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এড়ানো যেত বলে মনে করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। গত রবিবার কমিটির বৈঠকে তাঁরা বর্বর ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তাঁরা।

জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি শামসুল হক টুকু। বৈঠকে কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, হাবিবর রহমান, সামছুল আলম দুদু, ফরিদুল হক খান, পীর ফজলুর রহমান, নূর মোহাম্মদ ও সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কমিটি সূত্র জানায়, বৈঠকে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্য পীর ফজলুর রহমান নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার বিষয়টি উত্থাপন করেন। কমিটির সভাপতি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। আলোচনা শেষে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হয়।

এ বিষয়ে পীর ফজলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি বলেছি পুলিশ সতর্ক থাকলে অনেক ঘটনা ঘটার আগে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। নুসরাত যখন ওসির কাছে অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিল তখন তিনি (ওসি) যদি গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করতেন তা হলে হয়তো নুসরাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটত না।’

কমিটির সভাপতি শামসুল হক টুকু সাংবাদিকদের বলেন, কোনো তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলে অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানি ঠেকানো যায়। আগামীতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে না পারে সেদিকে লক্ষ রাখতে বলা হয়েছে। আগামী বৈঠকে চাঞ্চল্যকর নুসরাত মামলার অগ্রগতি নিয়ে আরো আলোচনা হবে বলে তিনি জানান।

সোনাগাজীতে পূজা উদ্যাপন পরিষদের মানববন্ধন

‘ধর্ষণমুক্ত নিরাপদ দেশ চাই, মা-বোনদের নিরাপত্তা চাই’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নুসরাতের হত্যাকারীদের বিচার এবং সব সহিংসতার প্রতিবাদে সোনাগাজীর জিরো পয়েন্টে গতকাল সোমবার দুপুরে উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের ব্যানারে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পরিষদের উপজেলা সভাপতি জগদীশ চন্দ্র শীলের সভাপতিত্ব এবং ছাত্র যুব ঐক্য পরিষদ জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক বিদ্যুত্ মহাজনের সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের ফেনী জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সুজিত মজুমদার, সদস্য রুপম শর্মা, উপজেলা সহসভাপতি শান্তি রঞ্জন কর্মকার, দুলাল মজুমদার, উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাবু সমর দাস, কৃষ্ণ মাস্টার, পলাশ বসাক, ডা. হারাধন, ডা. শুকলাল, ভবন বাবু, চরচান্দিয়া ইউনিয়ন সম্পাদক পলাশ দাস, রঞ্জিত বালামী, চন্দন দাস প্রমুখ।

হত্যাকাণ্ডে লেনদেন অনুসন্ধানে সোনাগাজীতে দুটি ব্যাংকের শাখায় পিবিআই

রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় অবৈধ অর্থ লেনদেনের উত্স অনুসন্ধানে সোনাগাজীর দুটি ব্যাংকের শাখা পরিদর্শন ও কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

রবিবার দুপুরে পিবিআই চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ইকবালের নেতৃত্বে চার সদস্যের দল জনতা ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক সোনাগাজী শাখায় গিয়ে মামলার আসামিদের ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখে।

পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ইকবাল কালের কণ্ঠকে বলেন, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোনো ধরনের অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না, তাঁরা তা খতিয়ে দেখছেন। তাঁরা জনতা ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক সোনাগাজী শাখা পরিদর্শন ও খোঁজখবর নেন। তিনি আরো বলেন, জেলা শহরেও বেশ কয়েকটি ব্যাংকের শাখা পরিদর্শন করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অবৈধ লেনদেনের উত্স খোঁজা হবে। এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পেয়েছেন কি না—জানতে চাইলে তদন্তের স্বার্থে তিনি সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে রাজি হননি। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ সুপার মইন উদ্দিন, নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বাসু দত্ত ও পরিদর্শক জাহিদুর জামান।

নুসরাতের গায়ে আগুন দেয় জোবায়ের

নুসরাত হত্যা মামলার এজাহারের অন্যতম আসামি সাইফুর রহমান মো. জোবায়ের রবিবার ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম ও সোনাগাজী আমলি আদালতের বিচারক শরাফ উদ্দিন আহমেদের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দির পর পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবাল সাংবাদিকদের জানান, জোবায়ের আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়—সে ঘটনার দিন কিলিং মিশনে সরাসরি অংশগ্রহণ করে নুসরাতে গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেয় এবং দেয়াশলাই কাঠির মাধ্যমে আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনি আরো বলেন, জবানবন্দিতে জোবায়ের হত্যার বিষয়ে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। এ নিয়ে  মামলার আট আসামি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিল।

আদালত প্রাঙ্গণে কাঁদলেন রানা-মামুন

নুসরাত হত্যা মামলার আসামি ইফতেখার উদ্দিন রানা ও এমরান হোসেন মামুনকে রবিবার বিকেলে আদালতে সোপর্দ করে পিবিআই। জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম ও সোনাগাজী আমলি আদালতের বিচারক শরাফ উদ্দিন আহমেদ তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদালতের বাইরে পিবিআইয়ের গাড়িতে তাদের কাঁদতে দেখা যায়। পিবিআই জানায়, রানাকে রাঙামাটি ও মামুনকে কুমিল্লার পদুয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরা ওই মাদরাসার ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। দুজনই ঘটনার সময় গেট পাহারায় ছিল। পরে তাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করা হবে বলে জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, পিবিআই পরিদর্শক শাহ আলম।

শবেবরাতে নুসরাতের কবর জিয়ারত

‘আমার বোন সুরেলা কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত করতে পারত, শবেবরাতে নামাজের পাশাপাশি পুরো রাত কোরআন তিলাওয়াত করত, হাদিস ও ইসলামী সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে ইবাদত বন্দেগিতে রাতটা কাটাত, সেই বোন এ শবেবরাতে নেই, নির্মমতার শিকার হয়ে শায়িত হয়ে আছে কবরে’—নুসরাত জাহান রাফির কবর জিয়ারতের পর এ কথা বলছিলেন তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।

নোমান আরো বলেন, ‘আমাদের পুরো পরিবারের মধ্যমণি ছিল বোনটি, যেন সবার নয়নের মণি। শবেবরাতের রাতে বোন পরিবারের জন্য হালুয়া-রুটি ও সুস্বাদু খাবার রান্না করত। সবাইকে নিয়ে ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে রাতটা পার করত। কিন্তু এ বছর শবেবরাতের রাতে সে নেই। খুনিরা তাকে বাঁচতে দেয়নি।’

নোমান বলেন, ‘আমরা এ ভাগ্যরজনীতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে বোনের রুহের মাগফেরাতের জন্য দোয়া করেছি। পাশাপাশি এ নির্মম হত্যার বিচারও চেয়েছি।’

মন্তব্য