kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

লক্ষ্মীপুরে দগ্ধ তরুণীর বার্ন ইউনিটে মৃত্যু

স্ত্রীর স্বীকৃতি চাওয়ায় আগুন দেওয়ার অভিযোগ

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি   

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



লক্ষ্মীপুরে দগ্ধ তরুণীর বার্ন ইউনিটে মৃত্যু

স্ত্রীর স্বীকৃতি চাইতে এসে লক্ষ্মীপুরে আগুনে দগ্ধ চট্টগ্রামের তরুণী শাহীনুর আক্তার (২৪) মারা গেছেন। গতকাল সোমবার সকাল ১১টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। শাহীনুর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার সোনাগাজি গ্রামের জাফর আলমের মেয়ে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশ।

গত রবিবার বিকেলে কমলনগর উপজেলার চরফলকন ইউনিয়নের আইয়ুবনগর এলাকার একটি সয়াবিন ক্ষেত থেকে তাঁকে শরীরে জ্বলন্ত আগুন নিয়ে দৌড়ে বের হতে দেখে স্থানীয়রা। স্থানীয় ইউপি সদস্য হাফিজ উল্যা ও  গ্রাম পুলিশ আবু তাহের তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে সদর হাসপাতালে ভর্তি করান। কিন্তু অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়।

খবর পেয়ে রবিবার সন্ধ্যায় লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সফিউজ্জামান ভূঁইয়া ও পুলিশ সুপার আ স ম মাহাতাব উদ্দিন সদর হাসপাতালে ওই তরুণীকে দেখতে যান। সদর হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক (আরএমও) আনোয়ার হোসেন জানান, আগুনে ওই তরুণীর মুখ-হাতসহ শরীরের ৪০-৫০ শতাংশ পুড়ে গেছে। এখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁকে ঢাকায় বার্ন ইউনিটে রেফার করা হয়।

এদিকে রবিবার সন্ধ্যায় লক্ষ্মীপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহীনুর সাংবাদিকদের জানান, মোবাইল ফোনে সালাউদ্দিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। প্রায় দেড় বছর আগে কাজী অফিসে তাঁদের বিয়ে হয়। ছয় মাস আগে জেনেছেন যে সালাউদ্দিন বিবাহিত। এ কথা শুনে কিছুদিন আগেও কমলনগর এসেছেন। কিন্তু স্ত্রীর স্বীকৃতি পাননি। এরপর গত শুক্রবার তিনি আবার লক্ষ্মীপুর আসেন। স্ত্রীর স্বীকৃতি চাওয়ায় সালাউদ্দিন তাঁর গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন।

তবে কমলনগর থানার পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, ওই তরুণী বাজার থেকে কেরোসিন কিনে এনে নিজের গায়ে আগুন দিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে গতকাল বিকেলে অভিযুক্ত সালাউদ্দিনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গত শনিবার বিকেলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য হাফিজ উল্যা সালিস বৈঠক করেন। বৈঠকে শাহীনুরকে বিয়ের কথা অস্বীকার করেন সালাউদ্দিন। এ সময় শাহীনুরের কাছে বিয়ের কাবিননামা চাওয়া হলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। পরে তাঁকে বিয়ের কামিননামা নিয়ে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়। রাত হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় পারভিনের বাড়িতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। পরদিন দুপুরে তাঁকে চট্টগ্রামে যাওয়ার জন্য অটোরিকশায় হাজিরহাট বাসস্ট্যান্ডে পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি পথে অটোরিকশা থেকে নেমে যান। বিকেলে তিনি সালাউদ্দিনের বাড়ির পাশে সয়াবিন ক্ষেতের ভেতর থেকে শরীরে জ্বলন্ত আগুন নিয়ে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে বেরিয়ে এসে একটি বাড়ির গোয়ালঘরে ঢুকে পড়েন। পরে তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়।

আটক পাঁচ : এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইউপি সদস্য হাফিজ উল্যা, গ্রাম পুলিশ আবু তাহের, তরুণীর দাবি করা স্বামী সালাউদ্দিনের ভাই আলাউদ্দিন ও আবদুর রহমানসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। রবিবার রাত থেকে গতকাল বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে আটক এই পাঁচজন লক্ষ্মীপুর সদর মডেল ও কমলনগর থানায় পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক হওয়ার আগে ইউপি সদস্য হাফিজ উল্যা বলেন, বিয়ের কাগজপত্র নিয়ে আসার জন্য ওই তরুণীকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর শুনি তিনি সয়াবিন ক্ষেতে গিয়ে গায়ে আগুন দিয়েছেন। ক্ষেতের ভেতরে কেরোসিনের বোতল, দিয়াশলাইয়ের বাক্স, জুতা, ব্যাগ, চুল, বোরকা ও পুড়ে যাওয়া ওড়না পড়ে ছিল। পরে গ্রাম পুলিশের সহায়তায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

কমলনগর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ওই তরুণীর ব্যবহৃত হাতব্যাগে কেরোসিনের গন্ধ পাওয়া গেছে। তিনি নিজেই কেরোসিন বহন করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে তিনি নিজের গায়ে নিজেই আগুন দিয়েছেন। তবে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।’

জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রিয়াজুল কবির বলেন, ‘তরুণীর অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। অগ্নিদগ্ধ তরুণীর দুরকম ভাষ্য পাওয়া গেছে। তাঁর বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি এলেই থানায় মামলা নেওয়া হবে।’

বিচার দাবি পরিবারের

রাউজান (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, বার্ন ইউনিটে মারা যাওয়া শাহীনুর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াজিসপুর ইউনিয়নের সোনাগাজী চৌধুরীবাড়ির জাফর আলম ও মৃত সাজু আকতারের মেয়ে। গতকাল শাহীনুরের বাড়িতে গেলে স্থানীয় লোকজন জানায়, জাফর আলমের দুই সংসার। আগের ঘরে শাহীনুররা দুই বোন ও এক ভাই। পরের সংসারে তিন ছেলে। শাহীনুরের মা মারা গেলে ৮-৯ বছর আগে শাহীনুর মামার বাড়ি চলে যান। সেখান থেকে পাঁচ-ছয় ধরে চট্টগ্রাম শহরে ফুফুর সঙ্গে থেকে গার্মেন্টে চাকরি করতেন। প্রায় দেড় বছর আগে তাঁর প্রেম হয় চট্টগ্রাম শহরে বসবাসরত লক্ষ্মীপুরের সালাউদ্দিনের সঙ্গে।

শাহীনুরের মামা কামাল উদ্দিন বলেন, ‘গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী ও দুই সন্তান থাকার কথা গোপন রেখে প্রেমের সূত্রে সালাউদ্দিন শাহীনুরকে বিয়ে করে বছরখানেক আগে। এরপর চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন জায়গায় তাকে রাখে। বিয়ের কাবিননামাও সালাউদ্দিন নিজের কাছে রেখে দেয়। কয়েক দিন ধরে সালাউদ্দিনের খোঁজ না পেয়ে শাহীনুর গত রবিবার লক্ষ্মীপুরে সালাউদ্দিনের বাড়িতে যায়। পরে সালাউদ্দিন বাড়ির পাশে সয়াবিন ক্ষেতে নিয়ে শাহীনুরের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়।’

এদিকে গতকাল সকালে শাহীনুরের রাউজানের বাড়িতে আসেন লক্ষ্মীপুর থানার এসআই জাহাঙ্গীরসহ এক দল পুলিশ। তারা শাহীনুরের বাবা জাফর আলম ও মামা কামাল উদ্দিনকে লক্ষ্মীপুরে নিয়ে যান। রাউজান থানার ওসি কেপায়েত উল্লাহ বলেন, ‘আইনি প্রক্রিয়া এবং লাশ বুঝে নেওয়ার জন্য তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

জাফর আলম বলেন ‘আমি মেয়ের হত্যার বিচার চাই। আর যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সে জন্য অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড দাবি করছি।’

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সরোয়ার্দী সিকদার বলেন ‘আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারার যে নৃশংস ঘটনা ঘটেছে, এর সর্বোচ্চ বিচার হওয়া উচিত।’

মন্তব্য