kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

সাক্ষাৎকার

শুধু বুড়িগঙ্গা নয় সব নদী অবৈধ দখল-দূষণমুক্ত করা হবে

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শুধু বুড়িগঙ্গা নয় সব নদী অবৈধ দখল-দূষণমুক্ত করা হবে

আওয়ামী লীগের পর পর তিনবারের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সরকারের নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই তিনি ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গাকে অবৈধ দখলমুক্ত করতে শুরু করেন অভিযান। আগামী ১০ বছরের মধ্যে বুড়িগঙ্গাসহ দেশের সব নদী অবৈধ দখল ও দূষণমুক্ত করতে কাজ করছেন তিনি। কালের কণ্ঠকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, শুধু বুড়িগঙ্গা নয়, সারা দেশের সব নদীকে অবৈধ দখল ও দূষণমুক্ত করে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়া হবে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল মামুন।

 

কালের কণ্ঠ : প্রধানমন্ত্রী এবারের মন্ত্রিসভায় পুরনো ও সিনিয়রদের বাদ দিয়ে আপনাদের মতো তরুণদের বেছে নিয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দিয়েছেন। এর কারণটা কী বলে মনে করেন?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আসলে বাদ কাউকেই দেননি। প্রধানমন্ত্রী টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছেন। মন্ত্রিসভায় তিনি প্রতিবারই রদবদল করেছেন।

এবারও করেছেন। সবাই আমাদের সঙ্গে আছেন। শুধু দায়িত্বটা পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সামনে এগিয়ে যেতে চান। তারই অংশ হিসেবে এ পরিবর্তন।

 

কালের কণ্ঠ : দায়িত্ব নেওয়ার পর মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা করেছেন কি?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৬-এ যখন প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন, তখনই এখানে মনোযোগ দিয়েছিলেন। পাঁচ বছরে অনেক কাজ করেছিলেন। সেই সময় মৃতপ্রায় শিপইয়ার্ডকে নৌবাহিনীর হাতে দিয়ে জাগ্রত করেছিলেন। ২০০৮ সালে তিনি যখন বিজয়ী হয়ে আবার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তখন এই সেক্টরের পরিধি বিস্তারের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছেন। তখন থেকেই গভীর সমুদ্রবন্দরের কথা আলোচনায় আছে। কাজেই এ পদক্ষেপগুলো প্রধানমন্ত্রী গত দুই সরকারের আমলেই গ্রহণ করেছেন। এগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করাই আমাদের কাজ। অনেকগুলো হয়ে গেছে। অনেকগুলো চলমান আছে। কিছু আছে, যেগুলো সামনে বাস্তবায়িত হবে।

 

কালের কণ্ঠ : গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কী অবস্থা? ওটা কোন পর্যায়ে আছে?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : পায়রাকে সমুদ্রবন্দর করা হয়েছে। মাতারবাড়ীতে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। সেখানে বন্দর রয়েছে। ভবিষ্যতে এটা গভীর সমুদ্রবন্দর হবে। এর বাইরে আমাদের সোনাদিয়া রয়েছে। এই সোনাদিয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা চলছে। এর মধ্যেই আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

 

কালের কণ্ঠ : অবকাঠামো সমস্যা, নাব্যতা সংকট ও যোগাযোগব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে ব্যবসায়ীরা মোংলা বন্দর ব্যবহারে অগ্রহী নয়। এ বন্দর ব্যবহারে ব্যবসায়ীদের আগ্রহী করতে কোনো পদক্ষেপ নেবেন কি?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আমরা এরই মধ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। মোংলা বন্দরে ড্রেজিংয়ের কাজ চলছে। সেখানে ড্রেজিং করার পর বালু কোথায় ফেলব, সেটা নিয়ে একটি সমস্যা ছিল। এসব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এটার যে নাব্যতা সংকট, সেটা কেটে যাবে। এর গতিশীলতা আরো বৃদ্ধি পাবে।

 

কালের কণ্ঠ : দেশের ৯২ শতাংশ পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে আমদানি-রপ্তানি হয়। ব্যবসায়ীদের জন্য এ বন্দর ব্যবহার সহজ ও দ্রুত করতে আপনার কি কোনো পরিকল্পনা আছে?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : ওখানে একটি বে টার্মিনাল করছি এবং আরো বেশি সম্প্রসারণ করার জন্য আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আমরা কর্ণফুলী নদী দখলমুক্ত করছি। এ নদী দখলমুক্ত করতে পারলে আমরা ব্যবহার করতে পারব। সেখানে টার্মিনাল নির্মাণকাজে আরো গতিশীলতা আসবে। ছোট ছোট লাইটারেজ যেগুলো আছে, সেগুলো খালাস করার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেই। কর্ণফুলী নদী দখলমুক্ত করতে পারলে লাইটারেজগুলো খালাস করতে পারব। আমরা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে চট্টগ্রাম পোর্ট থেকে ডিসেন্ট্রালাইজ করার জন্য পায়রা, মোংলা ও মাতারবাড়ী এবং ভবিষ্যতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে একটি বন্দর নির্মাণ করা যায় কি না, সেই ব্যাপারে প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আশা করছি নোয়াখালীর সুবর্ণচরেও একটি নৌবন্দর হবে। পানগাঁওকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দরে মাল খালাস করে তা রেল বা সড়কপথে আনতে হচ্ছে। এতে চাপ পড়ছে। সেই চাপটাকে হালকা করতে পানগাঁও বন্দরের ব্যবহার আরো বৃদ্ধি করতে চাই।

 

কালের কণ্ঠ : চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র গড়ে উঠেছে। এ চক্র অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। এই চক্র ভাঙতে কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : প্রধানমন্ত্রী বারবারই বলেছেন যে সুশাসন নিশ্চিত করতে দুর্নীতি দূর করবেন। আপনারা জানেন, দুর্নীতি দমন কমিশন ধীরে ধীরে পদক্ষেপ নিচ্ছে। কাজেই আমি মনে করি, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুদক যদি শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি আরো বেশি তৎপর হয়, তাহলে এই জটিলতাগুলো কেটে যাবে।

 

কালের কণ্ঠ : দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথ উন্নয়নে কোনো রোডম্যাপ আছে কি?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : অবশ্যই আছে। ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ আমরা তৈরি করতে চাই। এই প্রকল্পগুলো আমরা নিয়েছি। তা বাস্তবায়ন করা যদিও দুরূহ, তবু আশা করছি কিছুদিনের মধ্যে সেই সক্ষমতা অর্জন করে নৌপথ তৈরি আমরা করতে পারব। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা নদীগুলোকে জীবন ও জীবিকার হাতিয়ারে পরিণত করব। বাংলাদেশ যে নদীমাতৃক দেশ, তা বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারিনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছেন, এর মাধ্যমে নদী ও সমুদ্র অর্থাৎ যাকে ব্লু ইকোনমি বলছি, এটাকে ব্যবহার করে আমরা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চাই।

 

কালের কণ্ঠ : বিআইডাব্লিউটিএ, বিআইডাব্লিউটিসি, স্থলবন্দরসহ কয়েকটি সংস্থায় সিবিএর নামে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয়। প্রশাসনিক কাজে তাদের হস্তক্ষেপ বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেবেন কি?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : এখানে যে যার কাজ করবে। শ্রমিকরা শ্রমিকের কাজ করবে। কর্মকর্তা যাঁরা আছেন, তাঁরা তাঁদের কাজ করবেন। আমরা যে সুশাসনের কথা বলছি, সেই সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য নীতিমালার বাইরে বেআইনিভাবে কোনো কিছুই করতে দেওয়া হবে না।

 

কালের কণ্ঠ : ঢাকার বুড়িগঙ্গা রক্ষায় দুই তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান চলছে। ভবিষ্যতেও এটা চলমান থাকবে কি?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : এটা আমার বিষয় নয়, সরকারের সিদ্ধান্ত। সরকারের সিদ্ধান্তই মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করছে। এ মন্ত্রণালয়কে অন্য মন্ত্রণালয়গুলো সহযোগিতা করছে। বিশেষ করে ঢাকার নদী এবং চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর নাব্যতা, দূষণ এবং অবৈধ দখলমুক্ত করার জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্সের মাস্টারপ্ল্যান আমরা বাস্তবায়ন করব। এর জন্য এই নগরীর মানুষগুলো একসময় গর্ববোধ করবে। আমরা সেভাবেই কাজ করছি। ঢাকার আশপাশে যে নদীগুলো আছে, সেগুলো শুধু নয়, পুরো দেশে যত নদী দখল হয়েছে, তীর দখল হয়েছে, সেগুলোকে আমরা মুক্ত করে নদীর স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেব।

 

কালের কণ্ঠ : তাহলে আমরা কি বলতে পারি, অচিরেই ঢাকার বুড়িগঙ্গা তার জীবন ফিরে পাবে?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আসলে কত দিন লাগবে, সেটা বলা মুশকিল। আমরা যদি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকাই—ফ্রান্সের প্যারিস অথবা ইংল্যান্ডের লন্ডন বা অন্য কোনো দেশ, তাদের শহরের মধ্যে যে নদীগুলো আছে, সেই নদীগুলোর জীবন ফিরিয়ে আনতে অনেক বছর লেগেছে। লন্ডনের টেমস নদী ডাম্পিং স্টেশন ছিল। তাকে ব্যবহারের উপযোগী করতে ৫৫ বছর সময় লাগে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা বা বালু নদী, কর্ণফুলী নদী তো এক দিনে দখল হয়নি। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময় থেকে নদীগুলো দখল করে হত্যা করা হয়েছে। এগুলো দখলমুক্ত করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে। আমরা যে মাস্টারপ্ল্যান করেছি সেখানে ২, ৩, ৫ ও ১০ বছর মেয়াদি কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।

 

 

মন্তব্য