kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

ইনকাদের পার্পল ভুট্টা সৈয়দপুরে

তোফাজ্জল হোসেন লুতু, সৈয়দপুর (নীলফামারী)   

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইনকাদের পার্পল ভুট্টা সৈয়দপুরে

নীলফামারীর সৈয়দপুরে উচ্চপুষ্টির পেরুভিয়ান (পেরু অঞ্চলের) পার্পল ভুট্টার পরীক্ষামূলক চাষ করা হয়েছে। উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের অসুরখাই গ্রামের গবেষক, কৃষক আহসান-উল-হক বাবু তাঁর নিজস্ব গবেষণা প্লটে এই গাঢ় জাম রঙের ভুট্টার চাষে সাফল্য পেয়েছেন। এর আগে তিনি বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন জাতের ধান ও গমের আবাদ করে আশানুরূপ ফলন পেয়েছেন। প্রাচীন ইনকা সভ্যতায় এই ভুট্টার চাষ হতো বলে জানা যায়।

কৃষক আহসান-উল-হক বাবু জানান, রঙিন জাতের এই ভুট্টা উচ্চ পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং সুস্বাদু। এর স্বাদ অনেকটা রাজশাহীর বিখ্যাত পাকা ফজলি আমের সমতুল্য। পার্পল অর্থাত্ বেগুনি ভুট্টার মিষ্টতার (BRIX) মাত্রা ২০ আর পাকা ফজলি আমের মিষ্টতার মাত্রা ১৯।

বাবু জানান, শত শত বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুর আদিবাসীরা এই রঙিন ভুট্টা মুখরোচক খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত। এখনো এই শস্য খাদ্য হিসেবে আদৃত। প্রাচীনকালে ওই অঞ্চলের ইনকা সভ্যতার (Inca) অধিবাসীরা রঙিন ভুট্টার রস সুস্বাদু পানীয় (বেভারেজ) হিসেবে ব্যবহার করত। পার্পল কর্ন এখনকার মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের ফ্লিন্ট কর্নের সমগ্রোত্রীয়। ফ্লিন্ট কর্ন দিয়ে এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাদ্য তৈরি হয়।

রঙিন ভুট্টা  সম্পর্কে  জানতে ইন্টারনেট সার্চে আরো জানা গেছে, ব্লুবেরির (blueberries) চেয়েও এই রঙিন ভুট্টা ৫-১০ গুণ বেশি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট (Antioxidants) সমৃদ্ধ, যা ডালিমের দানার মতো কাঁচাও খাওয়া যায়। 

এসব তথ্য দিয়ে বাবু আরো জানান, প্রথমে তিনি ইন্টারনেটের মাধ্যমে রঙিন ভুট্টা সম্পর্কে অবগত হন। পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে রঙিন ভুট্টা বীজ বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের ই-মেইল ঠিকানা সংগ্রহ করেন। এরপর আমেরিকায় অবস্থানরত তাঁর নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে কিছু বীজ সংগ্রহ করেন।

বীজগুলো থেকে চারা করার নিমিত্তে একটি পটে একটি করে বীজ বপন করা হয়। এরপর ১২ দিন বয়সী ভুট্টার চারা ‘রেইজড বেড ফারো অ্যান্ড টুইন প্লান্টেশন’ পদ্ধতিতে জমিতে রোপণ করা হয়। গত বছরের ২২ নভেম্বর রোপিত প্রতিটি চারা থেকে তিন-চারটি করে কার্যকর কুঁশি বের হয়। এরপর প্রতিটি কুঁশি থেকে দু-একটি করে কার্যকরী ভুট্টার মোচা বের হয়। আর প্রতিটি ভুট্টা গাছেই গড়ে তিন-চারটি ভুট্টার মোচা হয়। সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে এই ভুট্টা চাষে ব্যবহার করা হয়েছে বায়োগ্যাস, কেঁচো সার, হাড়ের গুঁড়া, শিংয়ের গুঁড়া, কোকো কয়ার ও সামান্য পরিমাণে ডিএপি, এমওপি এবং ইউরিয়া সার। কীটনাশক হিসেবে মেহগনি ও নিমতেল ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে রঙিন ভুট্টা চাষের অর্গানিক প্লটে মোটেও আর্মি ওয়ার্ম পোকার কোনো আক্রমণ দেখা যায়নি।

এখন যে পরিমাণ ভুট্টা উত্পন্ন হয়েছে তার ক্ষেতে তা মাড়াই করে ২০ কেজির মতো ভুট্টা দানা সংগ্রহ হবে বলে জানান বাবু। এই ভুট্টা চাষ আর্থিকভাবে লাভজনক। এ ছাড়া এটা উচ্চ পুষ্টিকর এবং খেতে সুস্বাদু।

গবেষক কৃষক বাবু জানান, তিনি বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন উন্নত জাতের গম চাষ করে আসছেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় তিন-চার হাজার বছর আগের দৃষ্টিনন্দন ‘খোরাসান’ জাতের গমও। এ ছাড়াও বিলুপ্তপ্রায় কাটারিভোগ, বালাম, কালোজিরা, রাঁধুনিপাগল, কালাভাত (চাল খয়েরি রং) প্রভৃতি জাতের ধান সংগ্রহ করে চাষাবাদ অব্যাহত রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার লক্ষ্য এসব বিলুপ্তপ্রায় জাতের গম, ভুট্টা ও ধান অর্গানিকভাবে চাষাবাদের মধ্য দিয়ে গবেষণা কার্যক্রম এবং চাষাবাদ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া।’

তাঁর গবেষণা ও চাষাবাদ কর্মকাণ্ড জাতীয় পুষ্টি নীতিমালা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সামান্য হলেও ভূমিকা রাখবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদী।

তিনি আরো বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয় এবং গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সার্বিক সহযোগিতা পেলে আমার গবেষণা কার্যক্রম আরো বেগবান এবং সাফল্যমণ্ডিত হবে।’

সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ বাসুদেব দাসের সঙ্গে কৃষক বাবুর চাষকৃত রঙিন ভুট্টা নিয়ে কথা হয়। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার কৃষি ব্লকে ওই রঙিন ভুট্টা আবাদ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগে আমি দীর্ঘদিন যাবত্ কর্মরত আছি। দেশের নানা জায়গায় কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু চাকরি জীবনে এ ধরনের রঙিন ভুট্টা চাষ কোথাও আমার চোখে পড়েনি। রঙিন ভুট্টা নরম অবস্থায় খেতে প্রচলিত ভুট্টার চেয়ে বেশ মিষ্টি। এ ধরনের বিলুপ্তপ্রায় জাতের ভুট্টা সংগ্রহ করে চাষের জন্য এলাকার কৃষি উদ্যোক্তা আহসান-উল-হক বাবু প্রশংসার দাবিদার।’

মন্তব্য