kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

ব্রহ্মপুত্রে নাব্যতা সংকট, পড়েছে অসংখ্য চর-ডুবোচর

বন্ধ হওয়ার পথে ৩০ নৌপথ

কুদ্দুস বিশ্বাস, কুড়িগ্রাম (আঞ্চলিক)   

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বন্ধ হওয়ার পথে ৩০ নৌপথ

এককালের প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র আজ মৃতপ্রায়। নদে চর পড়ে যাওয়ায় নৌকা থেকে নেমে হেঁটেই পারাপার করতে হচ্ছে যাত্রীদের। ছবি : কালের কণ্ঠ

কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদে পানির অভাব, নাব্যতা সংকট আর অসংখ্য চর-ডুবোচর পড়ায় ৩০টির মতো নৌপথ বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে। বেশ কিছু নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও জামালপুর জেলার ব্রহ্মপুত্র নদ-বিচ্ছিন্ন শতাধিক চরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ নৌপথনির্ভর। কিন্তু নদে প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় নৌপথে যাত্রীবাহী বা পণ্যবাহী নৌকা চলছে ধুঁকে ধুঁকে।

একসময় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি তীরবর্তী বোরো ক্ষেতে ব্যবহার করত চরাঞ্চলের হাজারো কৃষক। তারা ডিঙি ও শ্যালো মেশিন দিয়ে বোরো ক্ষেতে সেচ কার্যক্রম চালাত। এতে জ্বালানি খরচ কম হতো, টাকা সাশ্রয় হতো। কিন্তু এখন নদের পানি তলায় ঠেকে যাওয়ায় সেটা পারছে না। ফলে চরজনপদের অসংখ্য কৃষককে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ করে সেচ দিতে হচ্ছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের যেদিকে চোখ যায় বালু আর বালু। বোঝার উপায় নেই যে এটাই প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র নদ। শংকর মাধবপুরে চরের মানুষকে হেঁটে বিশাল ব্রহ্মপুত্র পার হতে দেখা যায়। নদে অসংখ্য ডুবোচরে আটকে যায় যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী নৌকা। তখন মাঝিরা পানিতে নেমে ঠেলে নৌকা পার করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে এই অঞ্চলের নদ-নদীর ওপর। প্রতিবছর বর্ষায় দুই পার ও তীরবর্তী জমি ভাঙনের ফলেও নদ-নদী নাব্যতা হারাচ্ছে। নদ-নদী স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতি হারিয়ে ফেলায় এর প্রভাব পড়ছে জনজীবনে। এমন তথ্য জানা গেছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে।

বর্ষার সময় তিন মাস ব্রহ্মপুত্র নদের ৩০ নৌপথে নাব্যতা থাকে। তখন নৌকা বা ট্রলার স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে। বাকি ৯ মাস সমস্যা দেখা দেয়। এ নৌপথের দৈর্ঘ্য ১০০-১৫০ কিলোমিটার।

ব্রহ্মপুত্র নদের রৌমারীর পাখিউড়া, ফুলুয়ারচর ঘাট, মদা ব্যাপারীর ঘাট, চাক্তাবাড়ি ঘাট, কুটিরচর ঘাট ও খেড়ুয়া নৌকাঘাট থেকে চিলমারী, উলিপুর ও কুড়িগ্রামের মোগলবাসা নৌকাঘাটে প্রতিদিন যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী নৌকা যাতায়াত করে থাকে। একইভাবে রাজীবপুর নৌকাঘাট, কোদালকাটি, নয়াচর, মোল্লারচর, সানন্দবাড়ি, বাহাদুরাবাদ, ফুলছড়ি থেকে চিলমারী, গাইবান্ধার বালাসী, কামারজানি নৌপথে নৌকা চলাচল করে। বলতে গেলে জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলার মানুষ উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে। এর বাইরে অসংখ্য মানুষ নৌকা দিয়ে এক চর থেকে আরেক চরে যাতায়াত করে। কিন্তু বর্তমানে নদে পানি না থাকায় এসব নৌপথ বন্ধের উপক্রম হয়েছে। এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক নৌপথ। হুমকির মুখে রয়েছে অন্তত ১৫ লাখ মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা।

রৌমারীর ফুলুয়ারচর নৌঘাটের সাব-ইজারাদার আব্দুস সবুর বলেন, ‘৬ লাখ টাকা দিয়ে নৌকাঘাট ইজারা নিয়েছি। কিন্তু নদে পানি না থাকায় নৌকা চলাচল করতে পারছে না। এতে আমার আসল টাকাই ওঠানো সম্ভব হবে না।’ একই অবস্থা প্রায় সব নৌঘাটের ইজারাদারদের।

ছাইরুদ্দিন নামের এক খেয়া নৌকার মাঝি বলেন, ‘নদ শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। চরের লোকজন হেঁটে পারাপার হচ্ছে।’ চিলমারী নৌকাঘাটের টোল আদায়কারী লিচু মিয়া জানান, আগে যেখানে (যেমন চিলমারী-রৌমারী; চিলমারী-রাজীবপুর) পৌঁছতে দুই ঘণ্টা সময় লেগেছে এখন লাগছে তিন থেকে চার ঘণ্টা।

রাজীবপুর নৌঘাটের নৌকা ব্যবসায়ী তৈয়ব আলী জানান, নদে পানি না থাকায় তাঁর দুটি পণ্যবাহী নৌকা এখন শুকনায় পড়ে আছে। আবার নদের বুকে পণ্যবাহী অনেক নৌকা আটকে তলা ভেঙে মালপত্র নষ্ট হয়, নৌকারও ক্ষতি হয়। নদের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় নৌকাঘাটে যেতে তিন-চার কিলোমিটার বালুর চর হেঁটে নৌকায় উঠতে হয়। সময়ও লাগে অনেক বেশি।

 

 

মন্তব্য