kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

সিলগালা বিজিএমইএ ভবন

চীনা প্রযুক্তিতে ডিনামাইট ব্যবহার করে ভাঙার পরিকল্পনা

বিশেষ প্রতিনিধি ও নিজস্ব প্রতিবেদক    

১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সিলগালা বিজিএমইএ ভবন

রাজধানীর হাতিরঝিলে অবৈধভাবে নির্মিত বিজিএমইএ ভবন ভাঙার প্রক্রিয়া শুরু করেছে রাজউক। গতকাল ভবন থেকে মালপত্র সরিয়ে অন্যত্র নেওয়া হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর হাতিরঝিলে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বিজিএমইএ ভবন সিলগালা করে দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউক। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে পরিচালিত অভিযানে ভবন মালিকদের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্য কয়েক দফা সময় দেওয়ার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিভিন্ন ফ্লোরসহ প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর মালিকানাধীন ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয় গতকাল সকালেই। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ভবনটি ভাঙতে এক্সকাভেটর ও জনবল নিয়ে গেলেও বহুতল ভবনটি বুঝে নিয়ে আপাতত ক্ষান্ত হন রাজউকের কর্মকর্তারা।

রাজউক পরিচালক (প্রশাসন) খন্দকার অলিউর রহমান ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ‘আমরা ভবন মালিকদের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্য কয়েক দফা সময় দিয়েছি। তার পরও দেখা গেছে, কোনো কোনো ফ্লোরে বেশ কিছু মালামাল রয়ে গেছে। সেগুলো নেওয়ার জন্য মালিকরা রাজউকের কাছে আবেদন করলে তা কিভাবে হস্তান্তর করা হবে তা বিবেচনা করা হবে। আমরা সন্ধ্যা ৭টা থেকে ভবনটির ফ্লোরগুলো সিলগালা করে দিয়েছি। এর আগে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিট থেকে ভবনের প্রতিটি ফ্লোর সিলগালা করে দেওয়ার পর সাড়ে ৭টার দিকে প্রধান ফটকে সিলগালা করা হয়।’

সরেজমিন দেখা গেছে, ভবন ছাড়তে আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখানে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। ভবনটির চতুর্থ ও পঞ্চম তলা ছাড়া বাকি সবকটি তলায় ব্যাবসায়িক কার্যক্রম চলছিল। দুপুরে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ঢাকা ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে চেয়ার-টেবিলসহ অন্যান্য আসবাবপত্র খুলছিল শ্রমিকরা। তবে চতুর্থ তলায় বিজিএমইএ মূল অফিস খালি ছিল। পঞ্চম তলা থেকে মালামাল আংশিক সরিয়ে বাকিগুলো গোছানোর কাজ চলছিল। ভবনটির ছয় ও সাত তলায় জার্মান কনসোর্টিয়াম, পিপলস ফ্যাশন এবং স্কাইল্যান্ড মোটরসের অফিসেও মালামাল ছিল। একই সঙ্গে ১১ ও ১২ তলায় বিজিএমইএ সহসভাপতি ও ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুর রহিমের অফিসেও ছিল মালামাল। মালামাল দেখা গেছে ১৫ তলায় বিজিএমইএর অ্যাপারেল ক্লাবেও।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ভবন খালি করতে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে তাদের পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ভবন ছাড়তে নোটিশ দেয়নি রাজউকও। এমনকি ভবনটিতে রাজউকের অভিযানের সময় উপস্থিত ছিলেন না বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানও। এই দুই সংস্থার অস্পষ্টতার কারণে হঠাৎ মালামাল সরাতে গিয়ে তাদের বিপাকে পড়তে হয়েছে।

স্কাইল্যান্ড মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘বিজিএমইএ ও রাজউক কর্তৃপক্ষ কোনো রকম নোটিশ না দেওয়ায় ভবন ছাড়ার প্রস্তুতি ছিল না। ভবন খালি করার জন্য অন্তত ২৪ ঘণ্টার একটি নোটিশ রাজউক ভবন মালিকদের দিতে পারত।’

বিজিএমইএ সহসভাপতি আবদুর রহিম বলেন, ‘ভবন ছাড়তে হবে—এমন প্রস্তুতি আমাদের ছিল। তবে আজই ছাড়তে হবে এ বিষয়ে বিজিএমইএ এবং রাজউক থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।’

সূত্র জানায়, রাজউকের কর্মকর্তারা গতকাল সকালে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে বিজিএমইএ ভবনের সামনে হাজির হন। রাজউকের পরিচালক খন্দকার অলিউর রহমানের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এরপর ভবনটির ভেতরে শুরু হয় দেন-দরবার। ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে মালামাল সরাতে দফায় দফায় সময় দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত বিকেল ৫টার মধ্যে মালামাল সরিয়ে নিতে আলটিমেটাম দেওয়া হয় ব্যবসায়ীদের। রাজউকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা মালামাল সরানো শুরু করে দুপুর থেকে। দুপুরে ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানে করে ডিবিএল গ্রুপ, এক্সিম ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মালামাল সরিয়ে নিতে দেখা যায়। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার পর ভবনটি সিলগালা করে দেয় রাজউক।

খন্দকার অলিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকাল সাড়ে ৮টায় বিজিএমইএ ভবনে অভিযান চালানো হয়। বিকেল ৫টার মধ্যে ভবন খালি করে দেওয়ার আলটিমেটামের পর ভবন থেকে মালামাল সরিয়ে নিয়েছে ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে ভবনটি রাজউকের অধীনে রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সভায় ভবনটি ভাঙার দিনক্ষণ ঠিক করা হবে।’

কোনো আগাম নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি না জানতে চাইলে রাজউক পরিচালক বলেন, ‘নোটিশ না দিলেও আদালতের নির্দেশনা অনুসারে ১২ এপ্রিলের পর যেকোনো সময় রাজউকের অভিযান পরিচালনার এখতিয়ার ছিল। সেই এখতিয়ারবলেই আমরা অভিযান পরিচালনা করেছি।’

জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, আদালতের নির্দেশনা অনুসারে নির্দিষ্ট সময়েই বিজিএমই কার্যালয় ওই ভবন থেকে উত্তরার নতুন ভবনে স্থানান্তর হয়েছে। এ ছাড়া তিন মাস আগেই বিজিএমইএ পরিচালনা পর্ষদের সভায় হাতিরঝিলের ভবন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে রাজউকের গতকালের অভিযান প্রসঙ্গে তিনি আগে থেকে কিছু জানতেন না।

ডিনামাইট প্রযুক্তিতে ভাঙার পরিকল্পনা : রাজউক সূত্র জানায়, বহুল আলোচিত বিজিএমইএ ভবনটি ডিনামাইট প্রযুক্তিতে ভাঙার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ব্যাপারে এরই মধ্যে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ভবনটি ভাঙার সময় ও প্রক্রিয়া ঠিক করার বিষয়ে সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রাজউক ও হাতিরঝিল প্রকল্পের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই ভবন ভাঙার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী ও হাতিরঝিল প্রকল্পের পরিচালক রায়হানুল ফেরদৌস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তিতে ভবনটি ভাঙতে এরই মধ্যে চীনের একটি কম্পানি এটি পরিদর্শন করে গেছে। প্রাথমিকভাবে ডিনামাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে এই ভবন ভাঙার পরিকল্পনা রয়েছে।’

কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়—গণপূর্তমন্ত্রী : গণপূর্তমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজধানীর কারওয়ান বাজারসংলগ্ন বেগুনবাড়ী-হাতিরঝিল প্রকল্পের বেগুনবাড়ী খালের ওপর নির্মিত বহুতল ভবনটি ভেঙে সরিয়ে নিতে বিজিএমইএকে দেওয়া সময় শেষ হয়েছে গত ১২ এপ্রিল। কিন্তু ভবনটি বহাল থাকায় আজ (গতকাল) রাজউক এটির দখল নিয়ে সিলগালা করে দিয়েছে। ভবন ভাঙার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই সিলগালা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, একটি ভবন ভাঙতে বেশ কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। প্রাথমিক কাজ করা হয়েছে। এখন ভবনটি ভাঙার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে।’ এর আগে নিজস্ব ফেসবুক পেজে এক স্ট্যাটাসে মন্ত্রী বলেন, ‘বিজিএমইএ ভবন বেআইনিভাবে নির্মাণ হয়েছিল। ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আসনু, সকলে আইন মেনে চলি।’

অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত গ্রহণ : এদিকে ভবনটি ভাঙতে দরপত্র আহ্বানের অংশ হিসেবে আইনগত প্রক্রিয়া জানার জন্য রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের মতামত নিয়েছে রাজউক। গতকাল সন্ধ্যায় রাজউক চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে মতামত নেয়। জানা গেছে, দু-এক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।

আরো সময় চেয়ে আদালতে যাওয়ার খবর : এর আগে গতকাল দুপুরে বিজিএমইএ আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালতে সময় বাড়ানোর আবেদন উপস্থাপন করতে যাচ্ছে এমন খবরে সেখানে উপস্থিত হন সংশ্লিষ্ট পরিবেশবাদী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। তিনি আদালত চলার পুরোটা সয়ম আদালত কক্ষে বসা ছিলেন। কিন্তু কেউ বিজিএমইএর আবেদন আদালতে নিয়ে যাননি।

এ বিষয়ে মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের কাছে খবর আসে যে ভবন সরাতে আরো সময় চেয়ে বিজিএমইএ আবেদন নিয়ে আসছে। এ কারণে আদালতে হাজির ছিলাম। কেউ আসেনি। তাই এই ভবন ভাঙতে আর কোনো আইনগত বাধা নেই।’

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ বিজিএমইএর এক আবেদনে গত বছরের ২ এপ্রিল এক আদেশে ভবন সরিয়ে ফেলতে বিজিএমইএকে চলতি বছরের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দেন। বিজিএমইএর পক্ষ থেকে ‘আর সময়ের আবেদন করা হবে না’ এমন মুচলেকা দেওয়ার পরই আদালত আদেশ দেন। সেদিন আদালত বলেন, ‘সময় চেয়েছেন এক বছর। যতদিন চেয়েছেন, ততদিন দিয়েছি। বেশিও দিয়েছি—১২ মাস ১০ দিন। এটা মনে রাখবেন।’

মন্তব্য