kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

নৌযান শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি

কোথাও পণ্য কোথাও যাত্রী পরিবহনে বিঘ্ন

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কোথাও পণ্য কোথাও যাত্রী পরিবহনে বিঘ্ন

বেতন-ভাতা বাড়ানো, নদীপথে চাঁদাবাজি বন্ধসহ ১১ দফা দাবিতে সারা দেশে নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি বা ধর্মঘট গতকাল মঙ্গলবার বিচ্ছিন্নভাবে চলেছে। বরিশাল বন্দর থেকে কোনো নৌযান ছেড়ে যায়নি। চট্টগ্রামে নৌপথে পণ্য পরিবহন অচল হয়ে পড়লেও যাত্রীবাহী জাহাজ চলেছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় নৌযান চলাচল করেনি। এতে দুর্ভোগে পড়ে যাত্রীরা। তবে মুন্সীগঞ্জে লঞ্চ চলাচল ছিল স্বাভাবিক।

কালের কণ্ঠ’র বরিশাল অফিস জানায়, বরিশালে নৌযান শ্রমিকরা সোমবার দিনগত রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে কর্মবিরতি শুরু করে। গতকাল সকাল থেকে কোনো নৌযান বরিশাল নদীবন্দর ত্যাগ করেনি। অভ্যন্তরীণ নৌপথে লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ যাত্রীরা। কেউ বিকল্প পথে যাত্রা করলেও বেশির ভাগ যাত্রীকেই ফিরে যেতে হয়। তবে ঢাকা থেকে সোমবার রাতে ছেড়ে আসা লঞ্চগুলো বরিশাল নদীবন্দরে নোঙর করেছে এবং ভায়া রুটের লঞ্চগুলো বরিশাল হয়ে শেষ গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব আশিকুর রহমান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে। আজ (গতকাল) সরকার ও মালিকপক্ষের অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। ওই সিদ্ধান্তের ওপর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ফেডারেশনের বরিশাল অঞ্চলের সভাপতি আবুল হোসেন জানান, দাবি না মানা পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে।

এদিকে যাত্রীবাহী নৌযান মলিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, ‘২০১৬ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি শ্রমিক সংগঠন ও নৌ মালিক এবং সরকারের সঙ্গে হয়েছিল। শ্রমিক সংগঠনগুলো সেই চুক্তি ভঙ্গ করে ধর্মঘট ডেকেছে। তার পরও নৌমন্ত্রী শ্রমিকদের চুক্তির কোন বিষয়গুলো অসংগতি রয়েছে সেগুলো লিখিত আকারে দিতে বলেছেন। যুক্তিসংগত দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছেন। তার পরও শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকে যাত্রীদের ভোগান্তির মধ্যে ফেলেছে।

খুলনা অফিস জানায়, খুলনায় পণ্যবাহী নৌ চলাচল বন্ধ ছিল। গতকাল প্রথম প্রহর থেকে খুলনার বিআইডাব্লিউটিএ, ৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ঘাট এবং রুজভেল্ট জেটিতে অবস্থানরত কোনো জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও বোঝাই করা হয়নি।

বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের খুলনা জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, কেন্দ্রের ডাকা ধর্মঘট খুলনা ও মোংলায় সর্বাত্মকভাবে পালিত হচ্ছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম জানান, ধর্মঘটে চট্টগ্রামে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় গতকাল সকাল থেকে নদীপথে পণ্য পরিবহন কার্যত অচল হয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য খালাস, বহির্নোঙর থেকে পণ্য দেশের বিভিন্ন রুটে নিয়ে যাওয়া এবং কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাটে জাহাজে পণ্য ওঠানামা বন্ধ ছিল। জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ চলাচলও বন্ধ ছিল। তবে যাত্রীবাহী জাহাজ বিভিন্ন নৌপথে চলাচল করে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে বড় জাহাজ থেকে জেটিতে পণ্য ওঠানামা এবং বন্দরে জাহাজ চলাচল, পণ্য সরবরাহ সব কিছুই স্বাভাবিক ছিল।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নৌযান ধর্মঘটের প্রভাব চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য উঠানামায় পড়েনি। তবে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস অনির্দিষ্টকাল বন্ধ থাকলে বহির্নোঙরে খোলা পণ্যবাহী জাহাজের জট লেগে যায়।’

এদিকে, ধর্মঘট নিয়ে শ্রমিকদের বিবদমান দুটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছে। একটি পক্ষ গত সোমবার ঢাকায় শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছে; আরেকটি পক্ষ গতকাল সকাল থেকেই ধর্মঘট শুরু করে।

সকাল থেকে কর্ণফুলী নদীর ঘাটে এবং বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে জানিয়ে লাইটার জাহাজ ঠিকাদার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হাজি শফিক আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, রমজানকে ঘিরে প্রচুর পণ্য বহির্নোঙর এবং ১১টি ঘাটে খালাস হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রশাসনের উচিত দ্রুত বিষয়টি সমাধান করা; যাতে রমজানের পণ্য পরিবহনে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাট এবং বিভিন্ন জেটি থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বছরে চার কোটি টন পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। এর বড় অংশ নিজস্ব জাহাজের মাধ্যমে শিল্প-কারখানার মালিকরা পরিবহন করে থাকেন। আর দেড় কোটি টন পণ্য ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের মাধ্যমে জাহাজ বুকিং দিয়ে পরিবহন করা হয়ে থাকে। ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হলে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত সবগুলো জাহাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর বাড়তি খরচের দায় গিয়ে পড়বে পণ্যের দামের ওপর।

খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতির সভাপতি সোলায়মান আলম বাদশা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পণ্য আমদানি-রপ্তানি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর কোথাও সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই পুরো প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। সুতরাং রমজান ঘিরে এ ধর্মঘট কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ধর্মঘটের আর্থিক ক্ষতির বোঝা প্রথমে আমদানিকারকরা নিলেও শেষ পর্যন্ত কিন্তু ভোক্তারাই এর দায় বহন করে।’

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের লঞ্চঘাট থেকে মুন্সীগঞ্জসহ কয়েকটি রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করলেও চাঁদপুর, মোহনপুর, এখলাছপুরসহ অন্যান্য দূরপাল্লার লঞ্চ চলাচল বন্ধ ছিল। এতে ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রীরা। ধর্মঘট পালনকারী কোনো শ্রমিক কর্মচারীকে লঞ্চঘাটে দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার সিনিয়র সহসভাপতি বদিউজ্জামান বাদল জানান, শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে মালিক সমিতির কাছে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের দাবি উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি আরো জানান, সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সদরঘাটে লঞ্চ মালিক কার্যালয়ে সব লঞ্চ ও নৌযান মালিকদের নিয়ে আলোচনায় বসে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে জনগণের স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, কর্মবিরতির কারণে লক্ষ্মীপুর নৌপথে চলাচলকারী ২১ জেলার যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। সকালে মজুচৌধুরীরহাট ঘাট থেকে সি-ট্রাক পারিজাত ছেড়ে গেলেও এরপর থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার কোনো নৌযান ছেড়ে যায়নি।

চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, সকাল থেকে রাজধানীর সদরঘাটসহ ১০টি নৌরুটে চাঁদপুর থেকে যাত্রীবাহী কোনো লঞ্চ এবং পণ্যবাহী জাহাজ চলেনি। এতে দুর্ভোগে পড়ে হাজারো যাত্রী।

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মুন্সীগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে অন্যান্য দিনের মতোই নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে লঞ্চ ছেড়ে যায়। নারায়ণগঞ্জ থেকেও লঞ্চ যথাসময়ে মুন্সীগঞ্জ টার্মিনালে ভিড়েছে। শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী রুটে লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক ছিল। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলগামী বড় আকারের লঞ্চ মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরী দিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়। তবে অন্যান্য দিনের চেয়ে লঞ্চের সংখ্যা কম ছিল। মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

মন্তব্য