kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

‘আমার দোলাকেও পাওয়া গেছে’

নিহত আরো ৫ জনের পরিচয় শনাক্ত

‘নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘আমার দোলাকেও পাওয়া গেছে’

পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুনে নিহত ফয়সালের লাশ নিতে এসে গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর স্বজনরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

এবার পাওয়া গেল রেহনুমা তাবাসসুম দোলাকেও (২১)। প্রিয় বান্ধবী বৃষ্টির সঙ্গেই চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ আগুনে তাঁর মৃত্যু হয়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে শিল্পকলা একাডেমি থেকে একসঙ্গে কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফিরছিলেন দুই বান্ধবী। এর পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন দুজন। গত ৬ মার্চ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ পরীক্ষায় লাশ শনাক্ত হয়েছিল বৃষ্টির। গতকাল মঙ্গলবার সিআইডি আরো পাঁচ নিহতের পরিচয় শনাক্তের তথ্য জানায়, যার মধ্যে ছিল দোলার লাশও। তাঁদের চারজনের লাশ গতকালই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গ থেকে হস্তান্তর করা হয় স্বজনদের কাছে। এ নিয়ে দুই দফায় সিআইডি ১৬ জনের পরিচয় শনাক্ত করেছে।

গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে সিআইডি জানিয়েছে, চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর পর নিহতদের ৬৯টি বডিব্যাগে ঢুকানো হলেও সেসব ব্যাগের মধ্যে ৬৬টি লাশ ছিল। তিনটিতে ছিল অন্য নিহতদের খণ্ডিত লাশ। পরীক্ষায় তিনটি খণ্ডিত লাশ পাওয়া গেছে, যেগুলো আগেই স্বজনদের হস্তান্তর করা হয়েছে। সিআইডির ল্যাবে এখন দুটি শনাক্ত না হওয়া লাশ আছে। আর তিন দাবিদার স্বজন আছে যাদের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিলছে না তাঁদের নমুনা।

এদিকে চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডে জেলা প্রশাসনের হিসাবে নিহত ৭১ জনের মধ্যে (৬৯ বডিব্যাগ হিসাব করে) আগেই ৬৩ জনের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রথম দফায় ৪৬ জন, দ্বিতীয় দফায় দুজন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া চারজনের লাশ হস্তান্তর করা হয়। গত ৬ মার্চ হস্তান্তর করা হয় ১১ লাশ। গতকাল পাঁচজনকে নিয়ে মোট ৬৮ লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলো। সিআইডির ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ নমুনা দিয়ে স্বজন নিখোঁজ বলে দাবি করেছে ২৩ পরিবারের ৪৮ জন। তাদের ১৬ জনের লাশ শনাক্ত হওয়ায় এখনো নিখোঁজ সাতজন। এ হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৭৫ জনে দাঁড়ায়।

গতকাল রাজধানীর মালিবাগে প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি শেখ হিমায়েত হোসেন বলেন, মর্গে ৬৮টি মরদেহের ব্যাগ পায় সিআইডি। এর মধ্যে ৪৮টি পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত করায় সেগুলো হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০টি ব্যাগ থেকে ও ২৩টি পরিবারের সদস্যের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা নিয়ে পরীক্ষা শুরু করা হয়। পরীক্ষার পর প্রথম ধাপে ১১টি মরদেহের পরিচয় মেলে। আজ (গতকাল) আরো পাঁচটি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে।

সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার রুমানা আক্তার বলেন, বাকি চারটির মধ্যে একটিতে যে হাতের বিচ্ছিন্ন অংশ ছিল সেটা ছিল ২৩ নম্বর মরদেহের, যা আগেই হস্তান্তর করা হয়।

এ ছাড়া ৬৬ নম্বর ব্যাগটিতে তিনটি অঙ্গের খণ্ডাংশ ছিল, এগুলো মরদেহ নম্বর ৮ ও ১৩-এর শরীরের অংশ। এই দুটি মরদেহও আগে হস্তান্তর করা হয়ে গেছে। সিআইডির কাছে বর্তমানে রয়েছে দুটি মরদেহ। তবে দুই মরদেহের সঙ্গে তিন পরিবারের কারো ডিএনএ নমুনার মিল পাওয়া যায়নি। এগুলো মর্গে থাকবে। কেউ মরদেহগুলোর দাবি করলে তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে মেলানো হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল শনাক্তের পর ঢাকা মেডিক্যাল মর্গে সন্তানের লাশ নিতে আসেন শিক্ষার্থী দোলার বাবা দলিলুর রহমান দুলাল ও মা সুফিয়া বেগমসহ স্বজনরা। ‘আমার দোলাকেও পাওয়া গেছে’—বলেই কুঁকড়ে কেঁদে ওঠেন মা। দোলার মামা আল আকবর বলেন, আজিমপুরের লালবাগ রোডে দোলার বাসা। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালের আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। বান্ধবী বৃষ্টির সঙ্গে আবৃত্তিচর্চা করতেন তিনি। ২০ ফেব্রুয়ারি শিল্পকলা একাডেমিতে তেমনি একটি আবৃত্তির অনুষ্ঠানে যোগ দেন তাঁরা। ফেরার পথে অগ্নিকাণ্ড তাঁদের প্রাণ কেড়ে নেয়। দুই বোনের মধ্যে দোলা ছিলেন বড়।

লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে চকবাজারের প্যাকেজিং ব্যবসায়ী হাজি ইসমাইল হোসেনের (৫০)। লাশ গ্রহণ করে ভাতিজা শাহিন হোসেন বলেন, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের আহমেদপুরের ইসহাক হোসেনের ছেলে ইসমাইল পরিবার নিয়ে রাজধানীর মিরপুরের মধ্য পীরেরবাগে থাকতেন। দুই মেয়ে ও এক ছেলের জনক তিনি।

গতকাল আরো হস্তান্তর করা হয়েছে রংপুরের পীরগঞ্জের ডাসারপুরের সালাম মিয়ার ছেলে মোস্তফা মিয়ার (৩০) লাশ। কামরাঙ্গীর চরে থেকে রিকশা চালাতেন তিনি। স্বজনরা লাশ নিয়েছে প্লাস্টিকের দানা ব্যবসায়ী ফয়সাল সারওয়ারের (৫২)। পুরান ঢাকার পোস্তার হাজি বাল্লু রোডে তাঁর বাসা। তাঁর ভাগ্নে নজরুল ইসলাম বলেন, বন্ধু মাহমুদের সঙ্গে চুড়িহাট্টার একটি রেস্টুরেন্টে চা পান করতে গিয়ে নিহত হন তাঁর মামা।

স্বজনরা না আসায় গতকাল হস্তান্তর করা হয়নি চকবাজারে প্লাস্টিকের দানা ব্যবসায়ী জাফরের লাশ। আজ বুধবার লাশটি হস্তান্তর করা হতে পারে।

এখনো নিখোঁজ যাঁরা : এখনো নিখোঁজ আছেন সাত বছরের শিশু আফতাহী, চকবাজারের হাজি বাল্লুগেটের জহিরুল হক সুমনের স্ত্রী বিবি হালিমা শিল্পী (২৫), কামরাঙ্গীর চরের রিকশাচালক শাহাবুদ্দীন (৩৩), সোয়ারীঘাটের রিকশাচালক হেলাল (২৫), পথচারী রফিক মিয়া (২৫), নূরুল ইসলাম (৪০) ও রাজু (২৩)।

মন্তব্য