kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

রাজধানীর রাজপথে ‘নীরব’ ছিনতাই

এস এম আজাদ   

১৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাজধানীর রাজপথে ‘নীরব’ ছিনতাই

সন্ধ্যায় রাজধানীর ব্যস্ত রাজপথ। গত বুধবার পান্থপথের সিগন্যাল থেকে রিকশা করে মেট্রো শপিং মলে যাচ্ছিলেন পরিবহন ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান। কিছুদূর যেতেই রাস্তার পাশ থেকে এক যুবক তাঁকে উদ্দেশ করে সালাম দিয়ে বলে ওঠে, ‘কেমন আছেন ভাই? দাঁড়ান দাঁড়ান। আমাকে চিনতে পারছেন না?’ রহমান রিকশাচালককে থামতে বলেন। তিনি সালামের জবাব দিয়ে লোকটিকে চেনার চেষ্টা করছিলেন। লোকটি রিকশা ধরে হেসে বলল, ‘বাসায় যাচ্ছেন ভাই?’ রহমান তাঁর গন্তব্যের কথা জানাতে গিয়ে খেয়াল করলেন ওই যুবকের সঙ্গে আরো পাঁচজন আছে। তারা সবাই মিলে রিকশাটি ঘিরে ফেলল। তিনি চিনতে পারছেন না জানাতেই তাদের একজন আব্দুর রহমানের কোমরে তার হাত ঠেকিয়ে (হাতে শক্ত আগ্নেয়াস্ত্রের মতো কিছু ছিল) বলে, ‘ভাই সঙ্গে কী আছে? দিয়ে যান আমাদের।’ আরেকজন বলে, ‘ভাই, আমরা এলাকার ভদ্র ছেলে, পলিটিকস করি। সমস্যা করব না। আপনার মানিব্যাগটা দেন।’ ভীত আব্দুর রহমান মানিব্যাগটা বের করে দিলেন। ব্যাগে থাকা আট হাজার ৩০০ টাকা নিয়ে তাঁকে ব্যাগটি ফেরত দিয়ে একজন বলে, ‘ভাই, জানের মায়া করলে সোজা চলে যান, খামাখা পুলিশ-টুলিশ কইরেন না।’ এরপর চারজন হেঁটে এবং দুজন মোটরসাইকেলে কলাবাগানের গলিতে ঢুকে পড়ে।

ভুক্তভোগী আব্দুর রহমান দাবি করেন, ঘটনাস্থলের কিছু দূূরে ৩২ নম্বরে ট্রাফিক সিগন্যালে পুলিশ দেখলেও ভয়ে কিছুই জানাননি। পান্থপথ, ধানমণ্ডির ৭ নম্বর, লেকের পারসহ আশপাশে নিত্যনতুন কৌশলে পথ আটকে এমনই ‘নীরব’ ছিনতাইয়ের তথ্য মিলছে এখন হরহামেশা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পলাশী, আজিমপুর, নিউ মার্কেট, সদরঘাট, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর বসিলা, আগারগাঁও, মালিবাগ, মগবাজার, মিরপুরের দারুসসালাম, শাহ আলী, ১৪ নম্বর, কালশী, উত্তরার ৩ নম্বর ও দিয়াবাড়ীতেও ঘটছে এমন ঘটনা। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা বলছে, প্রতিদিন ভোরে ফাঁকা রাস্তায় এবং সন্ধ্যার সময় ব্যস্ত রাস্তায়ই বেশি ছিনতাই হচ্ছে। ছিনতাইকারীরা কখনো সালাম দিয়ে থামাচ্ছে, কখনো গলির মধ্যে গাড়ি বা রিকশা আটকে অস্ত্র দেখাচ্ছে। তুচ্ছ কারণে ঝগড়া বাধিয়েও ছিনতাই করে কিছু চক্র। প্রাইভেট কার বা মোটরসাইকেল থেকে টান দিয়ে কিংবা ভিড়ের মধ্যে টান দিয়ে ব্যাগ নিয়ে নিচ্ছে কিছু ছিনতাইকারী। এদের পুলিশ ‘সালাম পার্টি’, ‘ঠেক পার্টি’ ও ‘টানা পার্টি’ বলছে।

ঘটনার সূত্রে দেখা গেছে, ছিনতাইয়ে ভুক্তভোগীরা অল্প পরিমাণের টাকা, ব্যাগ, মোবাইল ফোন, ঘড়ি ও স্বর্ণালংকার খোয়াচ্ছেন। আগে ছিনতাইকারীদের দলে দু-তিনজন থাকলেও এখন পাঁচজনেরও বেশি থাকার তথ্য মিলছে। তারা নিজ মহল্লা বা পাশের মহল্লায় দল বেঁধে ছিনতাই করে। রক্তপাত বা সহিংস না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা হাসপাতালে যাচ্ছে না। অনেকে ঝামেলা এড়াতে পুলিশের কাছেও অভিযোগ করছে না। কেউ কেউ অভিযোগ করলেও ঘটনাটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত করে পুলিশ। অভিযোগ না হওয়ায় ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ তথ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। পুলিশের তল্লাশি টহলেও অনেকটা ঢিমেতাল। এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে ‘নীরব’ ছিনতাইচক্র।

জানতে চাইলে ধানমণ্ডি থানার ওসি আব্দুল লতিফ বলেন, ‘মাঝেমধ্যে মোটরসাইকেলে টান দিয়ে ব্যাগ নিয়ে যায়, এমন অভিযোগ পাচ্ছি। যেসব রাস্তায় বেশি সেখানে নজরদারি আছে। তবে ঠেক দিয়ে বা সালাম দিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাইনি।’

গত ২৩ জানুয়ারি রাতে মালিবাগে সেঞ্চুরি মার্কেটের কাছে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন কালের কণ্ঠ’র সহসম্পাদক মুকুল মল্লী। পেছন থেকে আসা একটি রিকশা থেকে এক ব্যক্তি এসে তাঁকে বহনকারী রিকশার গতিরোধ করে। সেখানে আরো দুজন এসে হাজির হয়। তাদের একজন মুকুলের কোমরে পিস্তল ঠেকিয়ে সাড়ে চার হাজার টাকা এবং একটি মোবাইল ফোনসেট নিয়ে যায়। এ ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় অভিযোগ করলে পুলিশের পরামর্শে তিনি একটি জিডি নথিভুক্ত করেন। ওই ছিনতাইচক্র এখনো অধরা।

গত ১ মার্চ সকালে মালিবাগ প্রথম লেনের ১৭৩ ও ১৭৪ বাড়ির মাঝামাঝি জায়গায় রিকশাযাত্রী মনির উদ্দিনের গলায় চাপাতি ঠেকিয়ে টাকা, মোবাইল ফোনসেট ও ব্যাংকের এটিএম কার্ড ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে এ ঘটনা ফেসবুকে ভাইরাল হয়। গত শুক্রবার মালিবাগের আতরবিবি লেন থেকে ইউসুফ আলী, ফরহাদ ফকির ও জসিম মাতব্বর নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পুলিশের মতিঝিল বিভাগের সহকারী কমিশনার রাশেদ হাসান বলেন, ‘এই ঘটনায় ছয়জন ছিল। অপর তিনজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তারা পেশাদার ছিনতাইকারী ও ডাকাত।’

মিরপুরের বর্ধিত পল্লবীর ১ নম্বর সড়কের বাসিন্দা নূর হোসেন বলেন, গত সোমবার সন্ধ্যায় সনি সিনেমা হলের পাশে ‘দাঁড়ান দাঁড়ান’ বলে রিকশা থামিয়ে তাঁর এক হাজার ৭০০ টাকা নিয়ে যায় সাতজন। তাদের ছিনতাইকারী মনে হয়নি নূর হোসেনের।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজিল হাসান বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ৩০০ ফুট রাস্তায় কুড়িলের ফ্লাইওভারের কাছে নিচের লেনে সাদা একটি প্রাইভেট কার এসে তাঁর রিকশা আরোহী বান্ধবীর ব্যাগ টেনে নিয়ে যায়। এ সময় ওই তরুণী রাস্তায় পড়ে আহত হন।

সম্প্রতি নীরব ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রশাসনের নজরে আসতে শুরু করেছে। গত ১ মার্চ সন্ধ্যায় উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের দিয়াবাড়ীতে ৩ নম্বর রোডে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বাপ্পী মুন্সি বাইসাইকেলে করে যাচ্ছিলেন। এ সময় ১০-১২ জনের একটি দল প্রাইভেট কার নিয়ে এসে বাপ্পীর পথরোধ করে। তাঁর মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে সঙ্গে থাকা এক লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় চক্রটি।

গত বৃহস্পতিবার মিরপুরের শাহ আলী মার্কেটের আশপাশ থেকেই ২৯ ছিনতাইকারীকে আটক করেন র‌্যাব-৪-এর সদস্যরা। এদের মধ্যে পাঁচজনের বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় তাদের কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়। তাদের কাছ থেকে নারীদের হাতব্যাগসহ ছিনতাই হওয়া বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।

 

মন্তব্য