kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

শুল্ক গোয়েন্দাদের তদন্ত

১০৯ কোটি টাকা পাচার করেছে ১০ গার্মেন্ট

ফারজানা লাবনী   

১৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১০৯ কোটি টাকা পাচার করেছে ১০ গার্মেন্ট

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তদন্তে তৈরি পোশাক খাতের ১০ প্রতিষ্ঠানের ১০৯ কোটি টাকা পাচারের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান অর্থপাচার করেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে গত সপ্তাহে চিঠি পাঠিয়ে এ ১০ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন।   

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠ’কে বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গত ছয় মাসে ২৬৪টি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে গরমিল পাওয়া গিয়েছে। এর মধ্যে বিস্তারিত তদন্তে ১০ প্রতিষ্ঠানের ১০৯ কোটি টাকা পাচারের বিষয় নিশ্চত হয়েছি। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।’

তদন্তে আসিয়ানা গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ৩৭ কোটি ৪৬ লাখ ১৬ হাজার ৮২৮ টাকা, সাদ ফ্যাশন ওয়্যারের ছয় কোটি ৩৪ লাখ ১২ হাজার ৯৪০ টাকা, লিলাক ফ্যাশন ওয়্যারের ৩২ কোটি ৬৭ লাখ ১৩ হাজার ৩৭ টাকা, কেপরি অ্যাপারেলসের ৭৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৮৯ টাকা, কেপরি গার্মেন্টের তিন কোটি ৮৭ লাখ ২২ হাজার ৮৮০ টাকা, মিশুওয়্যার হোসিয়ারি মিলসের ১৭ কোটি ১১ লাখ ৬৭ হাজার ৪১৩ টাকা, ফ্যাশন ক্রিয়েট এফারেন্সের এক কোটি ৪৬ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৯ টাকা, অ্যাপারেল অপশনসের ৬৭ লাখ ৭৩ হাজার ৩৬১ টাকা, ডিকে অ্যাপারেলসের দুই কোটি ৫৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৭৯ টাকা এবং নাব ফ্যাশন লিমিটেডের পাঁচ কোটি ৯৬ লাখ আট হাজার ৫৬৫ টাকা পাচারের বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

এ ব্যাপারে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠ’কে বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাত আমাদের কর্মসংস্থানের প্রধান খাত। এ খাত থেকে রপ্তানি আয়ও সবচেয়ে বেশি আসে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে এ খাতে কোনো অসৎ লোক নেই। আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে যে বা যারা অর্থপাচার করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অর্থপাচারে সহযোগিতাকারী ব্যাংক ও এনবিআরের অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর হতে হবে।’

তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদি কালের কণ্ঠ’কে বলেন, ‘বন্ড এবং এফওসি সুবিধা অপব্যবহার করে যারা অর্থপাচার করছে তাদের তৈরি পোশাক খাতের প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বয়কট করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। সরকারের উচিত অসৎ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া। তবে এ কাজ একজন ব্যবসায়ীর পক্ষে একা করা সম্ভব নয়। এ কাজে ব্যাংক ও এনবিআরের অসাধু কর্মকর্তারা জড়িত থাকে। তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন।’  

শুল্ক গোয়েন্দাদের তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ২০০২ সাল থেকে তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা এফওসি (ফ্রি অব কস্ট বা বিনা মূল্যে) সুবিধায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে কাপড় আনতে পারে। কাপড়ের সঙ্গে ডিজাইন পাঠিয়ে বিদেশি ক্রেতারা শার্ট, প্যান্টসহ বিভিন্ন পোশাক বানাতে কার্যাদেশ দেয়। এরপর তৈরি পোশাকের একটি দাম ধরে ক্রেতা সেগুলো কিনে নেয়। বিদেশি ক্রেতারা কাপড় পাঠালেও এ দেশের ব্যবসায়ীকে অর্ডারমতো পোশাক বানাতে বোতাম, শার্টের কলারসহ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত আর্ট কার্ড, ডুপ্লেক্স বোর্ড, মিডিয়াম পেপার, লাইনার পেপারসহ বিভিন্ন ধরনের কাগজ আমদানি করতে হয়। তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ কমাতে এসব কাঁচামাল বন্ড সুবিধার আওতায় শূন্য শুল্কে আমদানির সুবিধা দিয়েছে সরকার। 

নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা এক বছরে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করবে তার পরের বছর তার এক-তৃতীয়াংশ কাপড় এফওসি সুবিধায় আনার অনুমতি পাবে। এফওসি সুবিধায় কী পরিমাণ কাপড় আনছে তার ভিত্তিতে বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। এফওসি এবং কাঁচামাল আমদানির পরিমাণ ব্যবসায়ী সংগঠন নির্ধারণ করলেও সঠিক হিসাবে আনা হচ্ছে কি না বা মিথ্যা তথ্যে আনছে কি না তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব এনবিআরের। এ ক্ষেত্রে শর্ত থাকে, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কাঁচামাল আমদানি করা যাবে না, আমদানি কাঁচামালের সবটা রপ্তানীকৃত পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার করতে হবে এবং শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা কাঁচামাল বাইরে খোলাবাজারে বিক্রি করা যাবে না।  অর্থপাচারকারী ১০ প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন থেকে জাল এফওসি দেখিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কাঁচামাল আমদানির অনুমতি নিয়ে আসছে। বেশি পরিমাণ এবং বেশি দামের পণ্য আনার অনুমতি নিলেও আনছে কম দামের ও কম পরিমাণ পণ্য। অথচ কাগজে থাকা মূল্য এবং পরিমাণ অনুযায়ী তারা বিদেশে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ পাঠায়। দেখা যায়, বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানটি আদতে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানেরই একটি শাখা।

এনবিআর শুল্ক শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, লোকবলের অভাবে তাদের পক্ষে সব সময় কাগজপত্র অনুযায়ী আমদানীকৃত পণ্যের কার্টন খুলে সঠিক হিসাবে কাঁচামাল আমদানি করা হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা সম্ভব হয় না। এভাবে অর্থপাচারকারী প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর মিথ্যা তথ্যে অর্থ পাচার করে এলেও তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। তারা যে পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করেছে তার অর্ধেক পণ্যও উৎপাদনে ব্যবহার করেনি। বন্ড সুবিধায় আনা পণ্যের বড় অংশ খোলাবাজারে কম দামে বিক্রি করেছে। এতে দেশের কাগজকলগুলো লোকসানে পড়ছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠ’কে বলেন, ‘অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য যাচাইয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এফওসি ও বন্ড সুবিধায় পণ্য এনে খোলাবাজারে বিক্রি করায় দেশি শিল্প লোকসানে পড়ছে। এ ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’

 

মন্তব্য