kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

গড়াই খননে টাকার গড়াগড়ি, ফল শূন্য

দুর্নীতিতে জড়িয়ে কর্মকর্তা-প্রকৌশলীরা ফের বরাদ্দ ৫৯০ কোটি টাকা

তারিকুল হক তারিক, কুষ্টিয়া    

৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গড়াই খননে টাকার গড়াগড়ি, ফল শূন্য

দফায় দফায় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলে খননকাজ চালিয়েও গড়াই নদের এই দশা। ছবি : কালের কণ্ঠ

গড়াই। বিশ্বকবি তাঁর সাহিত্যে গড়াইকে ভালোবেসে লিখতেন ‘গৌরী’। আর পল্লীকবি ‘নীড়’ কবিতায় জানিয়েছেন গড়াই নদের প্রতি তাঁর চুম্বক ভালোবাসার কথা। দুই কবির ভালোবাসার সেই গড়াই এখন ভালো নেই। নদী আছে, পানি নেই। মাছ নেই, তাই জেলেরও দেখা নেই। নৌকা হয়েছে উধাও। বুকজুড়ে শুধু বালুচর। সেই বালু সরাতে বছর বছর আসে প্রকল্প। প্রকল্পের মোড়কে বরাদ্দ হয় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। ২০ বছর ধরে শুধু সেই টাকার গড়াগড়িই চলছে গড়াই নদের বুকে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ সচল রাখা, লবণাক্ততা রোধ ও নাব্যতা রক্ষায় গত ২০ বছরে এক হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কুষ্টিয়ার গড়াই নদ খনন করা হলেও এর সুফল ধরা দেয়নি কখনো। সুন্দরবনে মিঠা পানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাসহ লোনা পানির আগ্রাসন ঠেকাতে নেওয়া গড়াই খনন প্রকল্প এখন ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’। এর পরও সরকার এ বছর গড়াই খননে ফের ৫৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা শহরের বড়বাজার এলাকার ব্যবসায়ী রইচ উদ্দিন বলেন, ‘নদী খননে আমরা কোনো সুফল দেখছি না। খনন করা বালু নদীর তীরে ফেলা হয়েছে, আবার সেই বালু ফের নদীতেই আইছে।’

কুমারখালীর দুর্গাপুরের হাবিব চৌহান বলেন, ‘নদী খনন করে সাধারণ মানুষের কোনো লাভ না হলেও খননকাজে জড়িত কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে।’ খোকসার গড়াই তীরের বাসিন্দা ফিরোজ হোসেন বলেন, ‘নদী খননের নামে ২০ বছর ধরে ড্রেজার দিয়ে নদীতে বালু তুলতে দেখি; কিন্তু বর্ষা শেষ হলে নদীতে আর পানি থাকে না। তাহলে খননের নামে হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়?’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পদ্মার শাখা নদী গড়াই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিঠা পানি সরবরাহের একমাত্র উৎস। নদটি প্রথম খনন করা হয় ১৯৯৭ সালে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সে সময় ৪২০ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় কোদাল দিয়ে নদী খনন করা হলেও সে সময় খননের নামে টাকার হরিলুট করা হয়েছিল। পরে ১৯৯৯ সালে ২৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে স্থানীয়ভাবে নদী খনন করেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। এর পর সরকারের অর্থায়নে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে গড়াই নদ পুনরুদ্ধার প্রকল্পের আওতায় তৃতীয় পর্যায়ে ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়াই খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০০৯-১০ সালে চার বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়।

পরবর্তী সময়ে দরপত্রের মাধ্যমে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘দ্য চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি লিমিটেড’ নদী খননের দায়িত্ব পায়। দুই বছরের চুক্তিতে কম্পানিটি ২০১০ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে গড়াই নদের উৎস মুখ তালবাড়িয়া থেকে খোকসা জানিপুর পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার ভাটিতে খননকাজ শেষ করে। পরের দুই বছর পাউবোর নিজস্ব প্রকৌশলীরা এই খননকাজ তদারকি করেন। এর পর ফের ২০১৫-১৭ সালে তিন বছরের একটি খনন প্রকল্প নেয়। সর্বশেষ এ বছর নতুন করে ৫৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা আগামী চার বছর ধরে চলবে। এই খননের সঙ্গে সাত কিলোমিটার নদীতীরও সংরক্ষণ কাজও রয়েছে।

এর আগে ২০১৩ সালে কুষ্টিয়া জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় অপরিকল্পিতভাবে গড়াই নদ খনন এবং তাতে ব্যাপক অনিময় ও লুটপাট হচ্ছে বলে কমিটির সদস্যরা অভিযোগ করলে কুষ্টিয়ার সাবেক জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন খনন পরিদর্শন করে নানা অনিয়ম চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান। এর পর মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিব শেখ আলতাফ আলী তদন্ত শেষে খনন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আব্দুল বাতেনকে সাময়িক বরখাস্ত করে ওএসডি এবং প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী সাইদ আহম্মেদকে প্রত্যাহার করেছিলেন।

কুষ্টিয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী বলেন, ‘একের পর এক প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে কয়েক বছর ধরে নদী খনন হচ্ছে অথচ সাধারণ মানুষ এর কোনো সুফল পাচ্ছে না। দুর্নীতি-অনিয়ম তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আরো টাকা ঢেলেও নদীতে পানি পাওয়া যাবে না।’

নদী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ ড. অনোয়ারুল করিম বলেন, ‘সুন্দরবনকে বাঁচানো এবং এ অঞ্চলের লবণাক্ততা কমানোই ছিল গড়াই খননের প্রধান লক্ষ্য। তুলে আনা বালু নদীর পারে ফেলার কারণে খননের উদ্দেশ্য পুরোপুরি ভেস্তে গিয়ে সরকারের হাজার কোটি টাকা জলে চলে যাচ্ছে। গড়াই নদে পানিপ্রবাহ সচল রাখতে প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজ বাস্তবায়ন করতে হবে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, গড়াই নদ খননকাজে দুটি ড্রেজার কেনার জন্য ২৩৪ কোটি টাকা ব্যায়সহ নদী খননে ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৩০ কোটি টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৭৫ কোটি টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১৭ কোটি টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩৮ কোটি টাকা এবং পরের ২০১৪-১৭ অর্থবছরে আরো ২৬ কোটি টাকা এবং গড়াইয়ের উৎস মুখে দুটি ফ্লো ডিভাইডার নির্মাণের জন্য ২৭০ কোটি টাকা ও দুটি গাইড ওয়াল নির্মাণের জন্য ১২০ কোটি টাকাসহ মোট ব্যয় হয়েছে ৯১৯ কোটি টাকা। তবে সরেজমিনে দুটি ফ্লো ডিভাইডার ও দুটি গাইড ওয়াল নির্মাণের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাউবোর একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২০০৯-১০ থেকে ২০১২-১৪ মেয়াদের গড়াই খননকাজের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় খনন এলাকা পরিদর্শন করে বিভিন্ন অনিয়মের পাশাপাশি গড়াই খনন করে বালু ও মাটি নদীপারেই ফেলায় বর্ষায় এসব বালু ফের নদীতে চলে যাওয়ায় খননের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে বলে চিহ্নিত করেছিল।

এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান বলেন, ‘গড়াই খনন প্রকল্পের যে উদ্দেশ্য সেটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হলে এখানে প্রতিবছরই খনন অব্যাহত রাখতে হবে। কেননা খননের পর পরই নতুন করে বালু ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আগে কোথায় কী দুর্নীতি হয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে প্রতিবছর গড়াই খনন করা না হলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাই এবারও চার বছর মেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। জুনের পর আমরা কাজ শুরু করতে পারব।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রকল্প অনুমোদনের সময় যা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছিল বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। আর নদীতে যেখানে কোনো ফ্লোই নেই সেখানে ফ্লো ডিভাইডারও নির্মাণ করা হয়নি।’

মন্তব্য