kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

২৬% দুর্ঘটনার নেপথ্যে আনাড়ি ট্রাকচালক

পার্থ সারথি দাস   

২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



২৬% দুর্ঘটনার নেপথ্যে আনাড়ি ট্রাকচালক

ঢাকার লালমাটিয়ার বাসা থেকে গত ২ ফেব্রুয়ারি সকালে মাইক্রোবাসে নাটকের শুটিংয়ে অংশ নিতে মানিকগঞ্জ যাচ্ছিলেন চ্যানেল আই লাক্স সুপারস্টার তারকা অভিনেত্রী শানারৈ দেবী শানু। শানুকে বহনকারী মাইক্রোবাসটি আমিন বাজার পার হওয়ার সময় হঠাৎ পেছন থেকে জোরে ধাক্কা দেয় একটি ট্রাক (ঢাকা মেট্রো-ট-১৮-৩১০৬)। ট্রাকের ওই ধাক্কায় বুকে-পিঠে আঘাত পান শানু। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর আমি বেশ শকড ছিলাম। বেশ কিছু সময় বুঝতে পারছিলাম না আমার কী করা উচিত। ঘাড়ে ও পিঠে আঘাত পেয়েছি। আরেকটু হলে তো আমাদের গাড়িটা গুঁড়িয়ে দিত ট্রাক। আমাদের গাড়ির পাশে একটি প্রাইভেট কারে ছিল দুটি বাচ্চা। ওই প্রাইভেট কারটিও দুর্ঘটনা থেকে সামান্যর জন্য রক্ষা পায়।’

শানু আরো বলেন, ‘চালক  খুব বেপরোয়া ট্রাক চালাচ্ছিলেন। ওই সময় কুয়াশাও ছিল। অপরিপক্ব, লাইসেন্সবিহীন চালকদের অদক্ষতায় প্রতিনিয়ত এমন দুর্ঘটনা ঘটছে।’

দুর্ঘটনাস্থলে রফা হওয়ায় মামলা হয়নি বলে জানান সাভার থানার ওসি আব্দুল আউয়াল। ট্রাকচালক বেপরোয়া ট্রাক চালাচ্ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরাও জানায়।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে ট্রাকের ধাক্কার পর বাসচাপায় প্রাণ হারান দুই মোটরসাইকেল আরোহী। তাঁরা হলেন ঢাকার মুগদার হৃদয় গাজী (৩০) ও শারমীন আক্তার (১৮)। রূপগঞ্জ থানার ভুলতা পুলিশ জানায়, ওই দিন রাতে ওই দুজন নরসিংদী থেকে মোটরসাইকেলে মুগদা ফিরছিলেন। পথে আউখাবতে বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগামী ট্রাক মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দিলে তাঁরা দুজন ছিটকে পড়েন। এ সময় একটি বাস তাঁদের চাপা দিলে হৃদয় ও শারমীন ঘটনাস্থলেই মারা যান।

অপরিপক্ব, লাইসেন্সবিহীন চালকদের অদক্ষতায় প্রতিনিয়ত ঘটছে এমন দুর্ঘটনা। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সমীক্ষা অনুসারে, দেশের সড়ক ও মহাসড়কে প্রতিদিন গড়ে ২০টি দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে, এসব দুর্ঘটনার ২৬ শতাংশ ঘটাচ্ছে ট্রাক। এর মূলে রয়েছে অদক্ষ চালক। বিআরটিএ, বিভিন্ন মালিক সমিতি এবং ইউনিয়ন সূত্রে জানা গেছে, ৬০ শতাংশ ট্রাক চালানো হচ্ছে যথাযথ শ্রেণির লাইসেন্স ছাড়া। ভারী ট্রাক চালানো হচ্ছে মধ্যম শ্রেণির লাইসেন্স দিয়ে। বিআরটিএ ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেও বেশির ভাগ ট্রাকচালকের নেই যথাযথ প্রশিক্ষণ।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে গত রবিবার জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদের ২৬তম বৈঠক হয়েছে বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে। বৈঠকে সড়কে প্রাণহানি কমাতে ১৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর আগে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদের ৪৯ সদস্যের কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।  বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এ বৈঠক করছি।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য মতে, দেশে এ পর্যন্ত নিবন্ধিত বিভিন্ন ধরনের গাড়ি রয়েছে ৩৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৫১টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত ট্রাক আছে এক লাখ ৪৫ হাজার ১৬৩টি। বিআরটিএ, বিভিন্ন ট্রাক মালিক সমিতি, শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ চালকের ভারী শ্রেণির পেশাদার লাইসেন্স নেই। ট্রাক চালাতে ভারী শ্রেণির লাইসেন্স প্রয়োজন।

গত কয়েক দিন রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডে গিয়ে অনুসন্ধানে ১০ জন ট্রাকচালকের মধ্যে মাত্র চারজনের কাছে ভারী লাইসেন্স পাওয়া গেছে। মধ্যম শ্রেণির লাইসেন্স নিয়ে দেশজুড়ে পণ্য পরিবহন করেন ট্রাকচালক সুজাত আলী। তিনি জানান, আগে প্রাইভেট কার চালাতেন। বিআরটিএতে ঘুষ দিয়ে মধ্যম শ্রেণির লাইসেন্স নেন। এরপর আর লাইসেন্স উন্নীত করাননি। কারণ, তা করাতে গেলে পরীক্ষা দিতে হবে। এতে অনেক ঝামেলা।

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, হালকা লাইসেন্সধারী চালক মোটরসাইকেল বা অটোরিকশার মতো যানবাহন চালাতে পারবে। আরেকটু অভিজ্ঞ হলে মধ্যম শ্রেণির লাইসেন্স পাওয়া যায়। তাতে চালানো যায় মিনিবাস, পিকআপ, হিউম্যান হলার, প্রাইভেট কার, জিপ ও ট্রাক্টর। বাস ও ট্রাকের মতো ভারী গাড়ি চালাতে দরকার ভারী লাইসেন্স। মধ্যম শ্রেণির গাড়ি চালানো সন্তোষজনক হলে পাওয়া যায় ভারী লাইসেন্স।

পেশাদার ভারী (মোটরযানের ওজন ছয় হাজার ৫০০ কেজির বেশি) ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২৬ বছর হতে হয়। এর আগে দরকার হয় কমপক্ষে তিন বছর পেশাদার মধ্যম শ্রেণির ড্রাইভিং লাইসেন্সের ব্যবহার।

দেশে ভারী যানবাহন চালানোর জন্য প্রায় আড়াই লাখ চালকের সংকট রয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ জানান, দেশে বাস-ট্রাক ও ট্যাংক লরি সাড়ে তিন লাখ। এর মধ্যে আড়াই লাখ চালকের ভারী গাড়ি চালানোর লাইসেন্স  নেই।

ঘন ঘন ট্রাক দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর সরকার চালকদের বিশ্রামাগার তৈরির উদ্যোগ নেয়। মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ পাঁচটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে কোনো চালকের টানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালানো, দূরপাল্লার যানবাহনে বিকল্প চালক রাখার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু ওই নির্দেশনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

মন্তব্য