kalerkantho

নির্বাচনে জ্বালানি ‘তেল’ সরবরাহে চড়া সুদ

আরিফুর রহমান   

২১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নির্বাচনে জ্বালানি ‘তেল’ সরবরাহে চড়া সুদ

দরজায় কড়া নাড়ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী ৩০ ডিসেম্বরকে ভোটের দিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালনে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে নির্দেশের অপেক্ষায় পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী, আনসারসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বছরের অন্য সময় জ্বালানি তেলের যে চাহিদা থাকে, জাতীয় নির্বাচনের সময় সে চাহিদা বেড়ে যাবে। বাড়তি চাহিদার বিষয়টি মাথায় রেখে আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আইন-শৃঙ্খলায় নিয়োজিতদের যাতায়াতে জ্বালানি তেল সরবরাহে যাতে ঘাটতি না হয়, সে জন্য বাড়তি পাঁচ থেকে ছয় লাখ টন তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার এক দিন আগে গত ৭ নভেম্বর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত অনমনীয় ঋণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভায় বিপিসির জন্য ৮০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা। ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স কো-অপারেশন (আইটিএফসি) থেকে এই ৮০ কোটি ডলার ঋণ নেবে বিপিসি। পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলে মোট ৭৩ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে আগামী এক বছরে। সৌদি আরব, কুয়েত, আবুধাবিসহ বিশ্বের ১০টি দেশ থেকে তেল আমদানি করা হবে। এ বছর আমদানি করা হচ্ছে ৬৮ লাখ টন। সে হিসেবে আগামী বছর বাড়তি পাঁচ লাখ টন তেল আমদানি করা হবে।

বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, নির্বাচনের বছর জ্বালানি তেল বেশি লাগে। নির্বাচনের দিন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে টহল দিতে হবে কেন্দ্র থেকে কেন্দ্রে। নির্বাচনের আগে-পরে কদিন টহল দিতে হবে রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত। নির্বাচনের সময় লোডশেডিং না করতে সরকারের নির্দেশ থাকবে। এতে প্রয়োজন হবে প্রচুর ডিজেল ও ফার্নেস তেলের। বিষয়টি বিপিসির মাথায় রয়েছে। তাই আসছে বছরের জন্য বাড়তি তেল আমদানি করা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের মধ্যে রয়েছে—ডিজেল, পেট্রল, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস তেল।

তবে আইডিবির সহযোগী সংস্থা আইটিএফসি থেকে যে সুদে ঋণ নিচ্ছে বিপিসি তাতে আপত্তি জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ বেশ কজন সচিব। ৭ নভেম্বরের ওই সভায় বিপিসি থেকে জানানো হয়, আইটিএফসি থেকে যে ৮০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়া হচ্ছে তার সুদের হার ৪.৫ শতাংশ। আর ছয় মাসের মধ্যে সে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। আগেরবার যখন আইটিএফসি থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল, তখন সুদের হার ছিল ৩.৮ শতাংশ। এক বছরের কম সময়ের ব্যবধানে ঋণের সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০.৭ শতাংশ। এত বেশি সুদে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অর্থমন্ত্রীসহ বেশ কজন সচিব। সভায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, তেল আমদানি করতে ঋণের জন্য আইডিবির বাইরে অন্য দেশ কিংবা সংস্থার কাছে যেতে হবে। ওই ঋণ হতে হবে সহজ শর্তের। এত কঠিন শর্তের ঋণ নেওয়া উচিত নয় বলেও মত দেন অর্থমন্ত্রী।

সভায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলাম বলেন, ভবিষ্যতে জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে ঋণ নিতে বিকল্প দেশ কিংবা সংস্থার সন্ধান করতে হবে। এত বেশি সুদে ঋণ নেওয়া ঠিক নয়। আইটিএফসির চেয়ে সাশ্রয়ী শর্তে ঋণ পাওয়া যেতে পারে অন্য কোথাও থেকে। অর্থসচিব আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, বিপিসি প্রয়োজনে এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) আহ্বানের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক ও আরো সহনীয় শর্তে ঋণ নিতে পারে। যদিও জরুরি ভিত্তিতে তেল আমদানি এবং প্রয়োজনের তাগিদে বিপিসির প্রস্তাব সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়।

বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, অনমনীয় ঋণসংক্রান্ত কমিটিতে তেল আমদানিতে ৮০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাব পাস হলেও তেল আমদানি করতে দুই থেকে তিন মাস সময় লেগে যেতে পারে। তবে তাদের কাছে এখন ১২ লাখ টন তেল মজুদ আছে। তা চাহিদা পূরণে যথেষ্ট। নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর যাতায়াত এবং বিদ্যুতের লোডশেডিং রুখতে বাড়তি তেল খরচ হবে। ফেব্রুয়ারির মধ্যে তেল আমদানি হলে সেটি পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনের সময় যাতে বিদ্যুতে লোডশেডিং না হয়, সে জন্য বাড়তি ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল প্রয়োজন হবে। ঢাকাসহ পুরো দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে বাড়তি যতটুকু ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল ব্যবহার হবে, পরবর্তী সময়ে আমদানি করে তা পুষিয়ে দেওয়া হবে। ওই কর্মকর্তা জানান, নির্বাচন হবে শীতের সময়। ওই সময় বিদ্যুতের ততটা চাহিদা থাকবে না। তার পরও সাধারণ মানুষের মধ্যে যাতে বিদ্যুতের লোডশেডিং সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক ধারণা তৈরি না হয়, সে চেষ্টা থাকবে সরকারের।

বিপিসির চেয়ারম্যান শামসুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিপিসির কাছে এখন ১২ লাখ টন জ্বালানি তেল মজুদ আছে। এই মজুদ দিয়ে দেশের দুই মাসের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। নির্বাচনের সময় বাড়তি তেল লাগলেও আমাদের ঘাটতি হবে না। নির্বাচনের এক মাস দশ দিন বাকি। এখন থেকেও যদি এলসি খোলার কাজ শুরু হয়, তাহলে ডিসেম্বরের মধ্যে তেল এসে পৌঁছাবে না। আসতে আসতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি লেগে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে তেলের যে মজুদ আছে, তাতে কোনোভাবেই ঘাটতি হবে না। নির্বাচনের পর যাতে তেলের প্রাপ্যতায় কোনো সমস্যা না হয়, সে জন্য আমরা আমদানির প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

তেল আমদানিতে বেশি সুদে কেন ঋণ নেওয়া হচ্ছে এমন প্রশ্নে শামসুর রহমান বলেন, ‘৪.৫ শতাংশের বেশি সুদেও আমরা একসময় ঋণ নিয়েছি। ওই ঋণে সুদের হার ছিল ৭.৫ শতাংশ।’ তিনি বলেন, ‘দেশে প্রতিনিয়তই জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ছে। সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এসব দিক বিবেচনা করে জরুরিভিত্তিতে তেল আমদানি করতে হচ্ছে।’

মন্তব্য