kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

এগিয়ে আসছে নির্বাচন

বিনিয়োগে সাবধানতায় গতিহীন পুঁজিবাজার

রফিকুল ইসলাম   

২১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিনিয়োগে সাবধানতায় গতিহীন পুঁজিবাজার

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ‘সতর্ক’ অবস্থান নিয়েছে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা। সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম ও কর্মসূচি নিয়মিত পর্যালোচনা করছে তারা। অনেকে শেয়ার বিক্রি করে মূলধন তুলছে; স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড ভেবেচিন্তেই বিনিয়োগ করবে—এমন মন্তব্য তাদের। তারা বিনিয়োগ তুলে নিতে থাকায় মন্দাবস্থায় পড়ছে বাজার। নির্বাচনের সময় পুঁজিবাজারকে গতিশীল রাখতে কয়েকটি উদ্যোগ থাকলেও তেমন কাজে আসছে না।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছে, নির্বাচনের সময় উন্নত দেশের পুঁজিবাজারও কিছুটা স্তিমিত হয়। সরকারের পরিবর্তন কিংবা নতুন সরকারের ব্যবসা নীতি-পরিকল্পনা ভেবে দেখতে কিছুটা পিছুটান থাকে সবখানেই। বিদেশে বড় কোনো প্রভাব না পড়লেও বাংলাদেশে ঠিক উল্টো। নির্বাচনকালে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অস্থিরতা বেশি হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা সৃষ্টি হয়। দেশের বাইরে টাকা পাচার, রাজনীতির মাঠে সংঘর্ষ-হামলা ও প্রতিপক্ষকে দমন—এসব কারণে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সংবেদনশীল হওয়ায় পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা ধীরে চলো নীতি নেয়।

সূত্র জানায়, নির্বাচনের সময় নেতিবাচক প্রভাবের কথা বিবেচনা করে বাজার সাপোর্টের বিষয়ে উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। কিন্তু সে তুলনায় বাজারে গতি ফেরেনি। উল্টো স্তিমিত হয়েছে বাজার। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করছে, দেশীয় ক্ষুদ্র ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও শেয়ার বিক্রি করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

জানা যায়, নির্বাচনের সময় পুুঁজিবাজারে গতিশীলতা আনতে অন্তত চারটি দৃশ্যমান উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া নতুন নিয়মনীতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ কম্পানিকে অতালিকাভুক্ত করতে কারণ দর্শানো এবং মূল বাজারের বাইরে নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরিতেও কাজ করছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বাজারের তারল্য সংকট কাটানো, মূলধনী মুনাফায় ছাড়, ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানে করহার কমানো ও পোশাক খাতের করপোরেট করে ছাড় এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে দুই হাজার কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন দিয়েছে সরকার। নির্বাচনকালীন বাজার সাপোর্ট দিতেই সরকার এসব উদ্যোগ নিয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, গত এপ্রিলে বাণিজ্যিক ব্যাংকের তারল্য সংকট কাটাতে ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নগদ সংরক্ষণ অনুপাত (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও বা সিআরআর) ১ শতাংশ কমানো হয়েছে, এতে ব্যাংকের হাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা এসেছে। বেসরকারি ব্যাংকে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, আগে ২৫ শতাংশ পেত বেসরকারি ব্যাংক।

২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য বড় কোনো ছাড় ছিল না ঠিকই, তবে তালিকাভুক্ত-অতালিকাভুক্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর ব্যবধান একই থাকলেও করহার ২.৫ শতাংশ কমানো হয়। বস্ত্র খাতের কম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহিত করতে পোশাক খাতের করপোরেট কর কমানো হয়।

চীনা কৌশলগত অংশীদারের কাছে ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রির অর্থে মূলধনী মুনাফার ওপর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ কর ছাড় দিয়েছে সরকার। ৪ সেপ্টেম্বর চীনা জোটের মূলধন পেলেও, করছাড়সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় চলতি মাসের শুরুতে টাকা হাতে পেয়েছে ডিএসইর শেয়ারহোল্ডাররা। টাকা নেওয়ার দিন থেকে ছয় মাসের মধ্যেই বিনিয়োগ করতে হবে, এতে তিন বছর মূলধন উত্তোলন করা যাবে না, তবে লভ্যাংশ তুলতে পারবে তারা।

নির্বাচনকালীন বাজার সাপোর্ট দিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) দুই হাজার কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। এই অর্থের ৭৫ শতাংশ বিনিয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হলেও পুরোটাই বিনিয়োগ হবে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়, ২০১০ সালে ধসের পর ২০১৭ সালে গতিশীল হয়ে উঠেছিল পুঁজিবাজার। নতুন বিনিয়োগকারী আসার পাশাপাশি পুরনোরা সক্রিয় হলে পুঁজিবাজারের পালে হওয়া লাগে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাজারে প্রবেশ করলে বাজার মূলধন বৃদ্ধি পায়, সূচক ঊর্ধ্বমুখী ও লেনদেন বাড়ে। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি ২০১৮ সালের শুরুতেও ঊর্ধ্বমুখী ছিল পুঁজিবাজার। কিন্তু নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবিদাওয়া আদায়ে কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয় বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু বাজেটে তেমন কোনো সুখবর না থাকলেও ব্যাংক-আর্থিক খাতের করহার কমানোয় গতিশীল হয়ে ওঠে বাজার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ব্যাংকের বিনিয়োগসীমাসংক্রান্ত জটিলতায় পেছনে ফেরে বাজার। আইনি সীমার মধ্যে আসতে ব্যাংকগুলো শেয়ার বিক্রি করতে থাকলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ওই সময় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কয়েকটি দাবি জানানো হলেও সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, যার জন্য হ্রাস-বৃদ্ধির একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে পুঁজিবাজার।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে বা প্রথম দিন পুঁজিবাজারের মূলধন ছিল চার লাখ ২৩ হাজার ৪২৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, শেয়ার হাতবদলের সংখ্যা ছিল ১১ কোটি ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৭টি আর প্রধান সূচক ছিল ৬ হাজার ২৫৪ পয়েন্ট। কিন্তু পুঁজিবাজারের এই অবস্থা এখন অনেক নিচে নেমেছে। মূলধন দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৮২ হাজার ২৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। আর সূচক দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৫৬ পয়েন্ট। সেই হিসাবে বছরের প্রথম দিন থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত হিসাবে মূলধন হ্রাস পেয়েছে ৪১ হাজার ৩৯৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। আর সূচক কমেছে ৯৯৮ পয়েন্ট।

গত তিন মাসের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, শেয়ার বিক্রির চাপ বেশি থাকায় সূচক ও লেনদেন হ্রাস পেয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে গতকাল পর্যন্ত ৫৭ কার্যদিবস লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ২৯ দিনই মূল্যসূচক হ্রাস পেয়েছে। আর অন্য ২৮ দিনই সূচক কমেছে। এই সময়ে ৩৩৪ পয়েন্ট সূচক কমেছে। আর বাজার মূলধন কমেছে ১৪ হাজার ৭১১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছে, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় অস্থিরতার শঙ্কায় পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রি বেশি। দেশীয় বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি করছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসের মধ্যে সাত মাস বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার চেয়ে বিক্রি করেছে বেশি। প্রথম আট মাসে বিদেশিরা তিন হাজার ৩৯৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকার শেয়ার কিনেছে, কিন্তু বিক্রি করেছে তিন হাজার ৬৯৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। তবে সেপ্টেম্বর মাসে বিক্রির চেয়ে বিদেশিরা শেয়ার কিনেছে বেশি। এই সময়ে বিদেশিরা ২৪৭ কোটি ৫১ লাখ টাকার শেয়ার কেনে, বিপরীতে বিক্রি করে ২১২ কোটি ৩৪ লাখ টাকার। অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ৩৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা। অক্টোবরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ২৮২ কোটি ৯০ লাখ ৯৭ হাজার ৪৫৩ টাকার শেয়ার কিনেছে, কিন্তু বিপরীতে ৪৮৪ কোটি ১৮ লাখ ৯১ হাজার ৭৭৫ টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে।

ডিএসইর ব্রোকারেজ হাউসগুলোর সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনের সময় এলেই বিনিয়োগকারী কিছুটা আতঙ্কিত হয়। কেউ কেউ শেয়ার বিক্রি করে বাজার পর্যবেক্ষণ করে। অস্থিরতার শঙ্কা থেকেই অনেকে শেয়ার বিক্রি করে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আবারও বিনিয়োগ করে। এ জন্য নির্বাচনের সময় কিছুটা স্তিমিত অবস্থার মধ্যে পড়ে পুঁজিবাজার।’

মন্তব্য