kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

প্রথম দিন বিএনপির ১৩২৬টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি

ভোটে গমগম নয়াপল্টন

শফিক সাফি ও রেজাউল করিম   

১৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভোটে গমগম নয়াপল্টন

বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই প্রায় অকার্যকর ছিল। ছিল না তেমন কোনো কর্মসূচি ও নেতাকর্মীদের আনাগোনা। মাঝেমধ্যে দলটির পক্ষে শুধু সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু গতকাল সোমবার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। দলটির কার্যালয় ও সামনের চত্বর উপচে পড়েছিল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপির দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ উপলক্ষে সারা দেশ থেকে আসা হাজার হাজার নেতাকর্মীর ভিড়ে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল গতকাল। দলটির কার্যালয় ঘিরে ছিল না পুলিশের কোনো তত্পরতা। সারা দেশ থেকে আসা নেতাকর্মীদের মাঝে ছিল না কোনো গ্রেপ্তার আতঙ্ক। অনায়াসে কার্যালয়ে এসেছে নিজের এলাকার মনোনয়নপ্রত্যাশীদের পক্ষে।

৩০০ আসনের জন্য প্রথম দিনে এক হাজার ৩২৬টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে। এদিকে দলীয় মনোনয়ন ফরম কেনা ও জমা দেওয়ার সময় ১৫ ও ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত আরো দুই দিন বাড়িয়েছে বিএনপি। গতকাল রাতে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রিজভী এ তথ্য দেন। দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্য কেনা হয়েছে তিন আসনের ফরম (ফেনি-১, বগুড়া-৬ ও ৭)। দলের উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু নেতার পাশাপাশি সেলিব্রিটি কিছু মুখও বিএনপির মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

খালেদা জিয়ার পক্ষে ফরম সংগ্রহ করার পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজের জন্য (ঠাকুরগাঁও-১) মনোনয়নপত্র কেনেন পকেট থেকে পাঁচ হাজার টাকা বের করে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীর হাতে দিয়ে। মনোনয়নপত্র সংগ্রহকারীদের মধ্যে আরো আছেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও তাঁর ছেলে মারুফ হোসেন (কুমিল্লা-১), আবদুল আউয়াল মিন্টু (ফেনী-৩), আবদুল্লাহ আল নোমান (চট্টগ্রাম-১০), মওদুদ আহমদ (নোয়াখালী-৫), শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি (লক্ষ্মীপুর-৩), মীর শরাফত আলী সপু (মুন্সীগঞ্জ-১), অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ (মুন্সীগঞ্জ-২),  আব্দুল লতিফ জনি (ফেনী-৩), সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেন (ঢাকা-৬), মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ (ভোলা-৩), অধ্যাপক জয়নাল আবেদিন ভিপি (ফেনী-২), সরওয়ার জামাল নিজাম (চট্টগ্রাম-১৩), গিয়াস কাদের চৌধুরী (চট্টগ্রাম-২, ৬, ৭) প্রমুখ।

শিল্পজগতের পরিচিত কিছু মুখও বিএনপির মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। তাঁরা হলেন কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন (নীলফামারী-৪), চিত্রনায়ক হেলাল খান (সিলেট-৬), চিত্রনায়িকা শায়লা (ফরিদপুর-৪),  রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা (সিরাজগঞ্জ-১) ও  কণ্ঠশিল্পী মনির খান (ঝিনাইদহ-৩)।

অবশেষে উন্মুক্ত

‘প্রায় এক যুগ ধরে আমি এখানে এই দোকান চালাই। কয়েক বছর ধরে দেখছি এই কার্যালয় পুলিশ প্রায় সময়ই ঘেরাও করে রেখেছে। পরিত্যক্ত অফিসের মতো ছিল

ভবনটি। কোনো দলের কার্যালয়, নাকি অন্য কিছু, তা বোঝার উপায় ছিল না। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। আজ সকাল ৭টায় দোকান চালু করার পর দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার টাকার পান বিক্রি করতে পেরেছি। আরো বিক্রি হবে।’ কালের কণ্ঠকে এ কথা বলেন বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের উল্টো পাশে পানের দোকানি রফিক মিয়া।

তবে দলের কার্যালয়ে এই ভিড় আর জনসমাবেশ রাজধানীর বিশাল এলাকাজুড়ে যানজট বাঁধায়। বিশেষ করে নয়াপল্টন, পুরানা পল্টন, বিজয়নগর, মতিঝিল, কাকরাইল মোড়, শাহবাগসহ আশপাশের এলাকায় গাড়ির চাকার গতি ছিল প্রায় স্থির।

গতকাল দুপুর ১২টা। বিএনপির কার্যালয়ের সামনে দলে দলে কর্মীদের তাদের নেতাদের পক্ষে স্লোগানে মুখরিত ছিল পুরো এলাকা। কর্মীদের নিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দলে দলে শোডাউন দিতে দেখা যায়। কার্যালয়ের সামনে নিজের কর্মীদের নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন দলটির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলু। তিনি দলীয় মনোনয়ন সংগ্রহ করতে এসেছিলেন নোয়াখালীর একটি নির্বাচনী এলাকার জন্য। তাঁর সঙ্গে থাকা কর্মীরা স্লোগান দিচ্ছিল তাঁর পক্ষে এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে। বুলুর কর্মী আফজাল হোসেনসহ কয়েক শ কর্মী এসেছে নোয়াখালী থেকে। আফজাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি বিএনপির একজন একনিষ্ঠ কর্মী। বুদ্ধির পর থেকেই এই দল করি। আমি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। গত ১০ বছরে আমি এই কার্যালয়ে ঢোকার জন্য অনেকবার চেষ্টা করেছি; কিন্তু পারিনি। দুইবার পুলিশের হামলার শিকার হয়েছি। একবার গ্রেপ্তারও করেছিল। কিন্তু আজ মনপ্রাণ খুলে এই কার্যালয়ে আসতে পেরছি। কী যে ভালো লাগছে বোঝাতে পারব না।’

বরকতউল্লা বুলু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আপনারা দেখছেন কার্যালয়ে উত্সবমুখর পরিবেশ। সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীরা এসেছে। তিলধারণের ঠাঁই নেই কার্যালয়ের আশপাশে। সাধারণ মানুষের মনে বিএনপির প্রতি যে ভালোবাসা এই জনসমাগম তারই বাস্তবতা। আগামীকালও (আজ) এ রকম উসবমুখর থাকবে কার্যালয়।’

কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন এসেছিলেন দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনতে। তাঁর সঙ্গে আসা নাজমা আক্তার নামের এক কর্মী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি আমাদের জীবন। আগামী নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। আমরা সেই লক্ষ্য নিয়েই আজ কার্যালয়ে এসেছি। গণতন্ত্র ফিরে আনার জন্য অমরা রাজপথে নেমে এসেছি।’

ময়মনসিংহ-১১ আসন (ভালুকা) থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেতে চান ব্যবসায়ী ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চু। তিনি আজ মঙ্গলবার বিএনপির দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনবেন। তাঁর কর্মী ও ভালুকা উপজেলা তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক কলেজ শিক্ষক তাজ উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এখানে এসেছি দলের মনোনয়ন ফরম কিনে জমা দিতে। এখানে পুলিশের তেমন তত্পরতা দেখা না গেলেও স্থানীয় পর্যায়ে আমাদের নেতাকর্মীদের মাঝে এখনো গ্রেপ্তার আতঙ্ক কেটে ওঠেনি। আজ দলীয় কার্যালয়ে জড়ো হওয়ার যে রকম সুযোগ পাওয়া গেছে, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের সুযোগ দিতে হবে। তাহলে বোঝা যাবে সরকারের সদিচ্ছা আছে।’

এদিকে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে নেতাকর্মীদের মাঝে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়। গতকাল সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হয়। কার্যালয়ের চতুর্থ তলায় যুবদল দক্ষিণ অফিসে বরিশাল বিভাগ, ছাত্রদলের অফিসে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগ, পঞ্চম তলায় শ্রমিক দলের অফিসে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ, স্বেচ্ছাসবেক দলের অফিসে খুলনা ও ফরিদপুর বিভাগের প্রার্থীদের জন্য মনোনয়ন ফরম বিক্রি করা হচ্ছে।

রাজধানীজুড়ে যানজট : গতকাল সকাল ৮টা থেকেই বিএনপির নেতাকর্মীরা আসা শুরু করে নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ে। ফলে সকাল থেকেই এ এলাকায় যানজট ছিল ভয়াবহ; যার প্রভাব রাজধানীজুরেই পড়ে। বিশেষ করে নয়াপল্টন, পুরানা পল্টন, বিজয়নগর, মতিঝিল, কাকরাইল মোড়, শাহবাগসহ আশপাশের এলাকায় গাড়ির চাকার গতি ছিল প্রায় স্থির। দলীয় কার্যালয়ের সামনে দলের পক্ষ থেকে রাস্তা ফাঁকা রাখার জন্য মাইকে বারবার অনুরোধ করা হয় নেতাকর্মীদের। গতকাল সব কিছু উপেক্ষা করে নেতাকর্মীরা রাস্তা বন্ধ করে শোডাউন করেছে। আর এর ফলেই মূলত যানজটের সৃষ্টি। এতে ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ।

নাইটিঙ্গেল মোড়ে ফকিরাপুলগামী একজন প্রাইভেট কার চালক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচন করবেন তাঁরা, মনোনয়ন নেবেন তাঁরা আর ভোগান্তি আমাদের। প্রায় ঘণ্টাখানেক বসে বসে তাঁদের মিছিল দেখছি।’ বাসের একজন যাত্রী বলেন, ‘পুরো রাস্তা জ্যাম করে রাখছে এই মিছিল করতে গিয়ে। বাসে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি।’ বিএনপি কার্যালয়ের সামনে পুলিশের একটি টিম দেখা গেলেও রাস্তার যান চলাচল স্বাভাবিক করতে তাদের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

মন্তব্য